‘প্রথম প্রথম ধ্যান তো মনের সঙ্গে যুদ্ধ। দোলায়মান মনকে ক্রমাগত টেনে এনে ইষ্টপাদপদ্মে লাগাতে হয়। এতে কিছুক্ষণ পরে একটু মাথাগরম হয়। এজন্য প্রথম প্রথম বেশী ধ্যান ধারণা করে brain (মস্তিষ্ককে) খুব exert করতে (বেশী খাটাতে) নেই, আস্তে আস্তে বাড়াতে হয়। কিছুদিন এরূপ অভ্যাসের ফলে যখন ঠিক ঠিক ধ্যান হবে, তখন এক আসনে বসে দুই চার ঘণ্টা ধ্যান ধারণা করলেও কোন কষ্ট হবে না। বরং সুষুপ্তির পর শরীর ও মন যেরূপ refreshed (স্বচ্ছন্দ) হয়, সেরূপ বোধ হবে, আর ভিতরে খুব আনন্দ অনুভব হতে থাকবে।’ ‘ধ্যান করা কি সহজ কথা? একটু বেশী খেলে তো সেদিন আর মন বসল না। এইরূপে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ প্রভৃতি রিপগুলি চেপেচুপে রাখতে পারলে তবে ধ্যান করা সম্ভব হয়। ওদের যে কোন একটি জোর করলেই ধ্যান হবে না।’ ‘ধ্যান না করলে মন স্থির হয় না, আবার মন স্থির না হলে ধ্যান হয় না। মন স্থির হলে ধ্যান করব, এইরূপ ভাবলে আর কখনও ধ্যান করা হবে না। দুই-ই একসঙ্গে করতে হবে। মনের বাসনাদি সব কিছুই নয়, ধ্যানের সময় ভাববে— ‘সব অসৎ’, এইরূপ ভাবতে ভাবতে ক্রমে মনেতে সৎভাবের impression (সংস্কার) হবে। অসৎভাব মন থেকে যেমন তাড়াবে, সৎভাবও তেমনি আসতে থাকবে। ধ্যান করতে করতে অনেক সময় জ্যোতিঃদর্শন হয়, আবার কখন কখন প্রণবধ্বনি বা ঘণ্টাধ্বনি অথবা অন্য কিছু দূরের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু ওসব কিছুই নয়। আরও এগিয়ে যেতে হবে। তবে, ওসব লক্ষণ ভাল। ঐরূপ হলে বুঝতে হবে ঠিক ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি।’
ধ্যান করবার সময় একটা আনন্দময় স্বরূপ চিন্তা করে নিতে হবে— তাতে nerves (স্নায়ুগুলো) soothed (শান্ত) হ’য়ে যাবে। ইষ্টমূর্তিকে সহাস্য আনন্দময় ভেবে চিন্তা করতে হয়, নইলে শুট্কো ধ্যান হয়ে যাবে।’ ‘জপের সঙ্গে সঙ্গে মূর্তিচিন্তা করতে হয়, নইলে জপ ভাল হয় না। পূর্ণ মূর্তির ধ্যান না হলেও যেটুকু সামনে আসে তাই নিয়ে ধ্যান আরম্ভ করবি। প্রথমে পাদপদ্ম থেকে আরম্ভ করবি। না পারলেও struggle (বারবার চেষ্টা) করবি। না এলে ছাড়বি কেন? করতেই হবে। ধ্যান কি সহজে হয়? করতে করতেই হবে। ধ্যানের next step-ই (পরের অবস্থা) সমাধি।’
‘সাধারণতঃ’ হৃদয়ে ধ্যান করাই ভাল। দেহটা যেন মন্দির, ঠাকুর তাতে প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন। ধ্যান করতে করতে মন যখন স্থির হবে তখন যেখানে ইচ্ছা ঈষ্টদর্শন হবে। পার্শ্বে, হৃদয়ে, পশ্চাতে, বাহিরে সবখানেই ধ্যান করা যায়। ধ্যান করতে করতে প্রথমে জ্যোতিঃ-দর্শন হয়, কিন্তু ঐরূপ জ্যোতিঃ-দর্শনের সঙ্গে সঙ্গে বা একটু পরেই একটা আনন্দ আসে, তাছাড়া মন এগুতে চায় না। তারপর জ্যোতিঃঘন দর্শন, তখন মন তাতে তন্ময় হয়ে যায়। কখন কখন বা দীর্ঘ প্রণবধ্বনি শুনতে শুনতেও মন তন্ময় হয়।
স্বামী ধ্যানানন্দের ‘ধ্যান’ গ্রন্থ থেকে


