এনকাউন্টার পুলিশের সাফল্য না ব্যর্থতা?
  • ১ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: গভীর রাতে অপরাধের পুনর্নির্মাণ! দিনের বেলা করলে নাকি আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে। এতই যখন শঙ্কা তখন নিশ্চয়ই মাত্র একজন পুলিশ ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়নি অভিযুক্তকে! পুরো এলাকা ঘিরে রাখা ছিল, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হয়েছে ভিডিয়োগ্রাফিও। একাধিক সিনিয়র অফিসার, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা উপস্থিত ছিলেন। 

Advertisement

বাহিনীর একের অধিক গাড়িও গিয়েছিল ঘটনাস্থলে। আগাম প্রস্তুতিও ছিল ষোলোআনা। তবু একজন পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা এবং পালটা গুলি চালানোর সাহস পেল কোথা থেকে অভিযুক্ত। গাফিলতিটা কোথায়? পুলিশ কর্তারা যতই রাগ করুন হিসাব মেলা কিন্তু বেশ কঠিন। এনকাউন্টারে নিহতরা কেউ কাশ্মীরের প্রশিক্ষিত জঙ্গি নয়। 
সীমান্ত পেরিয়েও আসেনি এদেশে। এক কথায় 
উঠতি অপরাধী এবং সেইসঙ্গে মানসিক বিকৃতির শিকার। বারুইপুরের প্রভাস মণ্ডল থেকে গাইঘাটার প্রহ্লাদ দাস কিংবা সামশেরগঞ্জের সামাউন শেখ। নিঃসন্দেহে তিনজনেই ভয়ংকর অপরাধে অভিযুক্ত ছিল। প্রথম দুজন ধর্ষণ খুনের আসামী। তৃতীয় জন নৃশংস খুনে অভিযুক্ত। নিঃসন্দেহে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তিই প্রাপ্য। সভ্যসমাজ তাই চেয়েছিল। কিন্তু আইন এড়িয়ে, বিচার ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নয়। এতে তো দেশে পুলিশরাজই প্রতিষ্ঠা হয়।অস্বীকার করা হয় আদালতের ভূমিকাকেই। আপত্তিটা এইখানেই। 
নতুন সরকারের আমলে গত সাড়ে পাঁচ মাসে এনকাউন্টারে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে। যোগীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা নিয়ে বিরোধীরা সরব। কিন্তু সমালোচনা উড়িয়ে স্কোর শীট লাফিয়ে বাড়ছে। ব্রেকফাস্টেই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে ডিনারের পর সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বিতর্ক তুঙ্গে। 
প্রশ্ন একটাই, এই পরিসংখ্যান সরকার ও পুলিশের পক্ষে গৌরবের না অদক্ষতার? সাফল্যের না ব্যর্থতার সূচক? নাকি আইন ব্যবস্থার উপর আস্থা হারাচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই? ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে এই ঝোঁক বিপজ্জনকই শুধু নয়, 
আমাদের চিরাচরিত সাংবিধানিক ব্যবস্থার পক্ষে ভয়ংকর। কিছুটা সস্তায় বাজিমাতের চেষ্টাও বলা চলে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে যেহেতু একাজে পুলিশের পাশে দাঁড়িয়েছেন, প্রশ্রয় দিয়েছেন তাই আগামী কয়েকমাসে সংখ্যাটা বাড়তে বাধ্য। কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এতে ঘুরিয়ে পুলিশের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে না তো?
উত্তরপ্রদেশ মায় বর্তমান যোগীরাজ্যে ভূরি ভূরি এনকাউন্টারে এ পর্যন্ত কয়েকশো অপরাধীর মৃত্যু হয়েছে! উত্তরপ্রদেশ সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসাবেই ধরা হয় এনকাউন্টারকে। আবার সমালোচনাও হয়, বিরোধীদের ভয় দেখাতেই নাকি এই কৌশল! এই টানাপোড়েনে অপরাধ কি কমেছে? গুন্ডা-গার্দি, রাহাজানি, ছিনতাই, খুন ধর্ষণ 
উবে গিয়েছে? তাহলে সব জেনেও বাংলার নতুন সরকার ওই পথই বেছে নিল কি সংঘের কাছে লেটার মার্কস পাওয়ার বাসনায়! নাকি নিজেকে দেশের দ্বিতীয় যোগী আদিত্যনাথ প্রমাণের তাড়নায়? মোকাম্বো খুশ!
ব্যবধান মাত্র চার মাসের। ৮ জুলাই থেকে ২৭ অক্টোবর। রাজ্যে পুলিশি এনকাউন্টারে আবার অপরাধী নিকেশ। একজন নয় মাত্র ২৪ ঘণ্টার 
মধ্যে গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে মোট দুজন অভিযুক্তের মৃত্যু। যে পুলিশ চোরবাগানে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ সেই আবার অভিযুক্তের হাতে ‘আক্রান্ত’ হয়ে এনকাউন্টারে ওস্তাদ! পুলিশ কি বেছে বেছে সক্রিয় হয় ঠিক আগের জমানার মতো!
মুখ্যমন্ত্রীকে সম্মান জানিয়ে বলি, তিনি মুখে যাই বলুন, ভারতের রাজনৈতিক পরম্পরায় মধ্যরাতে পুলিশের এনকাউন্টার ও তাতে বিচারের আগেই অভিযুক্তের মৃত্যু কিন্তু আইনের রক্ষকদের মোটেই ভালো বিজ্ঞাপন হতে পারে না। এই ঘটনা কর্তব্যরত পুলিশের দক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। পুলিশের বয়ান অনুযায়ী বারুইপুর ও গাইঘাটার ঘটনায় ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্তরা প্রথমে অস্ত্র কেড়ে নেয় সাব ইন্সপেক্টরের কাছ থেকে। নিশ্ছিদ্র পুলিশি প্রহরায় কী করে এটা সম্ভব! এই প্রশ্ন কিন্তু বার বার উঠবেই। সনাতনী মনও সেই প্রশ্ন থেকে রেহাই পাবে না। গত পাঁচ মাসে যে জিজ্ঞাসা বার বার মনকে নাড়া দিয়েছে তা  হচ্ছে, হাটে বাজারে ধর্মপ্রাণ সনাতনী চিনব কেমন করে? না চিনলে ভুল হয়ে যেতে পারে। সবাই তো আর গেরুয়া বসন, কপালে তিলক আর হাতে তাগা বেঁধে ঘোরেন না। পাছে ভুল না হয়ে যায় তাই কোনো এসওপি কিংবা লিটমাস টেস্টের সুযোগ কি দেওয়া হবে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে? তাহলে সনাতনীরাও উপযুক্ত মর্যাদা পাবেন, আমরাও নিরাপদে থাকব! চোখ মেলে আদর্শ সনাতনী বেছে নেওয়ার সুযোগ পাব, গদগদ হয়ে প্রণাম ঠুকব সকাল সন্ধ্যা!
মুখ্যমন্ত্রী নিজে মুখে বলেছেন, এখনও ব্রেকফাস্ট হয়নি, লাঞ্চ বাকি আছে। তারপর ডিনার। সবমিলিয়ে সাড়ে চারবছর। তারপর আমরা প্রবেশ করব উন্নত বাংলায়। শিল্প হোক, যুব সমাজ কাজ পাক, শাসকের আইন নয় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। দুর্নীতি করেও শুধু শাসকের ভজনা করে কেউ যেন আশ্রয় না পায়। আপাতত সেই সোনার বঙ্গের অপেক্ষা। কিন্তু দুর্ভাগা বাঙালির আশাপূরণ হবে তো!
এটা বার বার বলেছি, আবারও বলছি, শুভেন্দুবাবু প্রচণ্ড খাটছেন। শনি রবিবারও তাঁর ঠাসা কর্মসূচি জেলা থেকে কলকাতায়। হাঁপ ফেলার সময় নেই। চোরবাগানে নিহত ১৯ জনের বাড়িতে তিনি ছুটে গিয়েছেন। উৎসবে ফিরুন বলে হাত গুটিয়ে রাখেননি। দায়ও এড়িয়ে জাননি। ডিএম কিংবা এসপিদের দিয়ে স্বজনহারাদের চেক বিলি 
করেননি। বিবৃতি দিয়ে থেমে যাননি। এ জন্য নিঃসন্দেহে তাঁর ধন্যবাদ প্রাপ্য। কিন্তু সনাতনী ছাড়া কেউ প্রতিমার গায়ে হাত দিতে পারবেন না, তাঁর এই কথাটা মেনে নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। কারণ গঙ্গার ঘাটে বিসর্জনে অনেক মুসলিম কুলিও দেখা যায়। অনেকে প্যান্ডেলের বাঁশ বাঁধে। লাইট লাগায়। পুজোর জন্য পদ্ম ফুটিয়ে বহু দূর থেকে নিয়ে আসে সময়মতো। প্রতিমার উপকরণ বানায় নিষ্ঠাভরে। বহু বছর ধরে তারা এই কাজ করে আসছে। আরও কষ্ট হচ্ছে যখন পুলিশ উৎসবে ভিড় নিয়ন্ত্রণ না করে বইয়ের স্টল ভাঙাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। রাজনৈতিক আকচা আকচির টার্গেট কখনো বই হতে পারে শ্রীচৈতন্যের বাংলায়?
মুখ্যমন্ত্রী বিগত জমানার দুর্নীতি ধরতে মরিয়া। খুব ভালো কথা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপনি আরও কঠোর হোন, বিচ্যুতি দেখলেই জেলে ভরুন। মাথারা যেন রেহাই না পান। কিন্তু দয়া করে আপন পর করবেন না। তৃণমূলের যে অংশ দল ভেঙে বকলমে আজ শাসকের আশ্রয়ে তাঁরা নিরাপদে। তাঁদের বাড়িতে নাড়ু খেতে আপত্তি নেই। সে রোজভ্যালি কাণ্ডে জেলখাটা হলেও মাফ। কারণ তিনি কথা শুনছেন এবং ঘুরিয়ে গেরুয়া আশ্রয়ে। আবার চোপড়ার হামিদুল কিংবা বীরভূমের কাজল শেখ গা ঝাড়া দিলেই ফাইল খোলার হুমকি, দুরকম আচরণ কিন্তু মানুষ দেখছে। তাঁরাও কিন্তু ডিনার পর্যন্ত দেখবেন সবটাই স্রেফ কথার কথা কি না?
মহামান্য মুখ্যমন্ত্রী সংঘ এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের কাছে নম্বর বাড়ানোর জন্য যদি এই কৌশল নিয়ে থাকেন, দ্বিতীয় যোগী হওয়ার জন্য একাজ করেন তাহলে বলব সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি কিন্তু এখনও ষোলোআনা উদার ভাবধারার। তাঁরা ধর্ম কিংবা জিরাফ, পুজো এবং উৎসব, দুয়েতেই ফতোয়া এবং দ্বিচারিতা পছন্দ করেন না। আর শেষে একটা কথা, চোরবাগানের ঘটনায় দুই ঘোষক গ্রেফতার হল। চুনোপুঁটি কর্মকর্তা ধরা পড়ল, কিন্তু পুলিশ কর্তাদের একজনেরও গাফিলতি দেখা গেল না আজও। তদন্তেও বাকি রাঘববোয়ালদের ক্লিনচিট দেওয়া হবে না তো, আশঙ্কা কিন্তু তীব্র হচ্ছে!
আগের জমানার মতোই দোষীদের শাস্তি দেওয়ায় ক্ষেত্রে তারতম্য হলে, বাছবিচার শুরু হলে বিচারের বাণী কিন্তু নীরবে নিভৃতেই কাঁদবে। সনাতনী রাজধর্ম আর পালন করা হবে না। শিবির বদলালেই ফাইল খুলে শিক্ষা দেব! অপরাধের বিচারে এমন তারতম্য রাজধর্মে মানায়? বাংলার মানুষের কিন্তু বিরাট আশা। বারবার তাঁদের স্বপ্নভঙ্গ হতে দেবেন না। গত পঞ্চাশ বছরের না পাওয়ার গ্লানি আপনাকে দূর করতেই হবে। বাঙালি কি ডিনারের পর সেই পূর্ণতার সন্ধিক্ষণের সন্ধান পাবে?