এপিক ফাঁসে সামাজিক সুরক্ষা
  • ২ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মহাত্মা গান্ধী ‘গ্রাম স্বরাজ’ চেয়েছিলেন। কারণ গ্রামই ভারতবর্ষের প্রাণ। ভারতকে প্রকৃত স্বাধীন ও স্বনির্ভর করতে হলে নিশ্চিত করতে হবে গ্রামের মানুষের স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতা। বাপুর সেই অনন্য নীতিই অনুসৃত হয়ে আসছে স্বাধীন ভারতজুড়ে। পশ্চিমবঙ্গ ও ভারত সরকারের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের অধীনে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে মোট তিরিশটিরও বেশি প্রধান সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে বাস্তবায়িত হয়ে চলেছে। সামগ্রিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীনে ৬৫টিরও বেশি সামাজিক প্রকল্প থাকলেও, পঞ্চায়েত অফিস ও গ্রামসভা মারফত নির্দিষ্ট কিছু মূল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। স্বাধীন ভারতে গ্রামীণ অর্থনীতি যতটুকু পোক্ত হয়েছে, তার পিছনে রয়েছে এই উদ্যোগের বড়ো অবদান। পঞ্চায়েতি প্রকল্পগুলির সুবিধালাভ এতদিন কোনো ঝামেলার ব্যাপার ছিল না। আধার চালু হওয়ার পর আধার লিঙ্ক বা যাচাই করেই তা অনুমোদন করা হত। কিন্তু সেইদিন যে শেষ হতে চলেছে, তা পরিষ্কার করে দিয়েছে সরকার। পঞ্চায়েতি প্রকল্পের টাকা পেতে এবার থেকে বাধ্যতামূলক গণ্য হবে ভোটার কার্ড (এপিক)! কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এই আকস্মিক ঘোষণায়, বাংলার ৪১ লক্ষ মানুষ কোপে পড়তে চলেছেন বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাতিল হতে চলেছে আধার-নির্ভর পেমেন্ট ব্যবস্থা। সরকারি প্রকল্পের টাকা প্রদানে তার পরিবর্তে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে এপিক নম্বর। সেটির বায়োমেট্রিক অথেন্টিকেশন থাকাও জরুরি। পঞ্চায়েত স্তরে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা ও অর্থপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এমনই নতুন বিধি চালুর পথে হাঁটছে মোদি সরকার। এসআইআর পর্ব শেষ হওয়ার পরই এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েতিরাজ ও মৎস্যচাষ মন্ত্রী রাজীব রঞ্জন এই ঘোষণা করেছেন। তাঁর কথায়, আধার আর সরকারি প্রকল্পের বেনিফিসিয়ারি শনাক্তকরণের প্রাথমিক ভিত্তি নয়। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, আধারের জায়গায় এপিককে বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার লিস্ট সংশোধন প্রক্রিয়ার মধ্যেই এত বড়ো ঘোষণা উদ্বেগ বাড়িয়েছে আরও বেশি। বিরোধীদের দাবি, বিষয়টি আর শুধু ভোটাধিকার কাড়ার মধ্যেই সীমায়িত নয়, মূল লক্ষ্য বিজেপি-বিরোধীদের নাগরিক অধিকারহরণ!

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর পর্বে ৫৮ লক্ষাধিক নাম ছাঁটা হয়েছে। বঞ্চিতদের প্রায় ৭০ শতাংশই গ্রামের মানুষ। ঘোষিত নিয়মে, সেই হিসাবে, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৪১ লক্ষ মানুষ পঞ্চায়েতের সরকারি প্রকল্পের সুবিধা বা ডিবিটির ক্ষেত্রে ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন। এই আশঙ্কার পাশাপাশি রাজ্যের নিজস্ব অবস্থানটিও তাৎপর্যপূর্ণ। নবান্ন ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তালিকাবহির্ভূত ভোটাররা সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। তাই এবার গ্রামীণ জনজীবনে এর প্রভাব কেমন হতে পারে তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ‘প্রধানমন্ত্রী বিকশিত গ্রাম স্বরাজ যোজনা’ (পিএমভিজিএসওয়াই) অনুমোদন করেছে। ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্যে বর্তমান ‘রাষ্ট্রীয় গ্রাম স্বরাজ অভিযান’-এর পরিবর্তে এই নতুনটি প্রকল্প চালু হবে। তার আওতাতেই আধারের পরিবর্তে নতুনভাবে যাচাই করা হবে এপিক। আর সেটাই হতে চলেছে বেনিফিসিয়ারি শনাক্ত করার নয়া মাপকাঠি।
শুক্রবার দিল্লিতে বিভাগীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, প্রতিটি এলাকাতেই আধার ইস্যু করার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আধার আর উপভোক্তা শনাক্তকরণের ভিত্তি হিসাবে গ্রাহ্য হবে না। সেই জায়গা নেবে বায়োমেট্রিক অথেন্টিকেশনসহ এপিক নম্বর। এর ভিত্তিতেই সরকারি টাকা দেওয়া হবে। একইসঙ্গে পঞ্চায়েতগুলিকে নিজস্ব তহবিল গড়ে তোলারও পরামর্শ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তাঁর কথায়, পঞ্চায়েতের কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থ কমিশনের বরাদ্দের ২০ শতাংশ টাকা নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ, স্থানীয় সম্পদ ও পরিষেবার সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির দায়িত্বও পঞ্চায়েতগুলির উপর চাপানো হচ্ছে। কিন্তু তার আগে চাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটির স্পষ্ট উত্তর—ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে কি একজন গ্রামীণ নাগরিক সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হবেন? ভোটাধিকার এবং সরকারি সামাজিক সুরক্ষার অধিকার কি একই তুলাদণ্ডে মাপা সম্ভব? ভোটার তালিকাভুক্তি নাগরিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি অবশ্যই, কিন্তু সেই লিস্টে নাম না-থাকার অর্থ তো সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের উপভোক্তা হওয়ার যোগ্যতা হারানো নয়। সংশোধন প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তির আগেই এপিককে অর্থপ্রাপ্তির বাধ্যতামূলক শর্ত মানা হলে বিপুল সংখ্যক প্রকৃত বেনিফিসিয়ারির দুর্ভোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকবে। এক গলায় আর কত ফাঁস নেবেন ভারতবাসী! বেশিরভাগই পরিচয়পত্র সংক্রান্ত। এবার হাজির এপিক ফাঁস। কংসরাজার নয়া বদ ফরমাস বইকি!