গুরু। বৎস! আজ তোমায় সচ্চিদানন্দঘনজ্যোতি নাদের কথা বলিব। এই নাদতত্ত্ব সাক্ষাৎকার হইলে মানব অমৃতত্ব লাভ করে। একমাত্র নাদতত্ত্ব জানিলে সমস্ত জানা হইয়া যায়।
শিষ্য। দেব! নাদ কে এবং কি ভাবে ইঁহাকে জানিতে সমর্থ হইব বলুন।
গুরু। সচ্চিদানন্দঘনজ্যোতি ওঙ্কারের তৃতীয় মাত্রা মকার; মকার পাদটি নাদময়! সমাহিত ভগবান্ প্রজাপতির হৃদয়-আকাশে এই নাদ আবির্ভূত হন এবং তাঁহা হইতে ত্রিবিদ ওঙ্কার পরমাত্মার আবির্ভাব হইয়াছিল।
শিষ্য। ইহাই কি ইঁহার প্রথম আবির্ভাব?
গুরু। না বৎস!
সোঽকাময়ত বহু স্যাং প্রজায়েয়েতি—তৈত্তিরীয় শ্রুতি
সেই পর প্রণব পরমাত্মা কামনা করিলেন—আমি বহু হইব, উৎপন্ন হইব।
সেই শান্ত স্তব্ধ মহাপারাবারে সেই মহাকাশে প্রথম স্পন্দন এই শব্দব্রহ্ম ওঙ্কার। মহাকাশে প্রণব-স্পন্দন আকাশ ও বায়ু। তাহার পর যখন বায়ুর প্রধান কারণ-অংশ অর্থাৎ সূক্ষ্ম অংশ ঘনীভূত হইতে ইচ্ছা করিল, তখন তাহার কাৰ্য্য-অংশও ঘনীভূত হইল। প্রথম স্থূল অভিব্যক্তি তেজ, তাহা আলোকাদি আকারে বিকীর্ণ হইতে থাকিলে তাহার কার্য্যাংশ ঘনীভূত হইয়া জলরূপে পরিণত হইল। জলের সুক্ষ্মাংশ ঘনীভূত হইতে ইচ্ছা করিলে তাহার কার্য্যাংশও ঘনীভূত হইয়া পৃথিবীরূপে পরিণত হইল।
শিষ্য। ঠিক বুঝিতে পারিলাম না।
গুরু। ব্রহ্মের দুইটি রূপ,—একটি মুর্ত্ত ও একটি অমূর্ত্ত। মুর্ত্ত রূপটি অনিত্য। অমূর্ত্ত রূপটি মুত্ত রূপের কারণ। এই জগৎ অগ্নিষোমাত্মক। ইহার নামান্তর রয়ি, প্রাণ, ভোক্তা, ভোগ্য অন্ন, অন্নাদ, সূক্ষ্ম, স্থূল, প্রকৃতি, পুরুষ ইত্যাদি। মহাকাশে সঙ্কল্প উঠিল—বহু হইব। তখন তাঁহার অভিন্না চেতনাশক্তি মণির ঝলকের মত স্পন্দিতা হইলেন। শব্দ না হইলে স্পন্দন হইতে পারে না। সেই আদি শব্দই ওঙ্কার, অপর প্রণব। যে স্থানে শব্দ সেই স্থানেই স্পন্দন অবশ্যই হইবে। সৃষ্টিপ্রারম্ভে এই প্রথম স্পন্দন অপর প্রণবই ‘প্রাণ’ নামে উপনিষদাদিতে কথিত হইয়াছেন। সেই আদি মহাপ্রাণ শক্তি অমূর্ত্ত অব্যক্ত অবস্থা হইতে ব্যক্ত মূর্ত্ত অবস্থায় আসিতে লাগিলেন; তখন তেজ, জল, পৃথিবীরূপে পরিণত হইলেন। যে মহাপ্রাণ-স্পন্দন সূক্ষ্ম অবস্থায় ব্যাপকরূপে আকাশে ছিলেন তাহা যত স্থূল অবস্থায় আসিতে লাগিলেন, তত তেজাদি আকারে বিকীর্ণ হইতে লাগিলেন। উহার জড়াংশ অর্থাৎ কাৰ্য্যাংশ ঘনীভূত হইয়া জলরূপে পরিণত হইল। জলের সূক্ষ্মাংশ ঘনীভূত হইতে থাকিলে উহার কাৰ্য্যাংশও ঘনীভূত হইয়া পৃথিবীরূপে পরিণত হইল। প্রথম মহাকাশে প্রণব-স্পন্দনই কার্য্য ও কারণরূপে পঞ্চভূত আকারে পরিণত হইয়াছে। সকল স্থূল পদার্থই পঞ্চভূতের বিকার। পঞ্চভূতের সংমিশ্রণের তারতম্য অনুসারে পদার্থ মাত্রই উৎপন্ন হইয়াছে।
শ্রীগুরুপ্রকাশন থেকে প্রকাশিত শ্রী ওঙ্কারনাথ-রচনাবলী থেকে


