বেচারাম
  • ৩ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

‘পাখির চোখ’ বেসরকারিকরণ। সেই লক্ষ্যপূরণে মোদি সরকার গত বারো বছরে একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে পুরোপুরি বেসরকারি হাতে তুলে দিয়েছে। তালিকায় রয়েছে এয়ার ইন্ডিয়া, নীলাচল ইস্পাত নিগম, ফেরো স্ক্রাপ নিগম, ইন্ডিয়ান মেডিসিনস ফার্মা কর্পোরেশনের মতো সংস্থা। অন্যদিকে মালিকানা হাতে রেখেও ব্যাংক, বিমা, গ্যাস, তেল, বন্দর, বিমানবন্দরের মতো একাধিক সংস্থার আংশিক শেয়ার বেসরকারি হাতে তুলে দিয়েছে ১৭৯ বার। পুরোপুরি বেসরকারিকরণের তালিকায় সাম্প্রতিকতম সংযোজন রাষ্ট্রায়ত্ত আইডিবিআই ব্যাংক, যার বিক্রির প্রস্তাবে বড়োসড়ো বেনিয়মের অভিযোগে তোলপাড় দেশ। এমন নয় যে লোকসানের চাপে ধুঁকতে থাকার কারণেই রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রগুলির বিপুল সম্পদের আংশিক অথবা পুরোপুরি বিক্রি করে দিচ্ছে মোদি সরকার। বরং ঘটনা হল, একাধিক সংস্থা দীর্ঘদিন লাভের মুখ দেখা সত্ত্বেও তাদের বেচে দেওয়া হচ্ছে নির্মমভাবে। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রতিশ্রুতির উলটোপথে গিয়ে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় বহু সম্পদই বিক্রি করে দিচ্ছে মোদি সরকার। এর শেষ কোথায় কেউ জানে না। 

Advertisement

এই মুহূর্তে আইডিবিআই-এর বেসরকারিকরণ নিয়ে গুরুতর অভিযোগে কাঠগড়ায় কেন্দ্রীয় সরকার। খবরে প্রকাশ, রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটি শুধু ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে লাভ করেছে ৯৫০০ কোটি টাকা। গত দু’বছরে ব্যাংকটির নিট মুনাফার পরিমাণ ৩০ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। এমন এক লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৬০.৭২ শতাংশ শেয়ার কানাডার ফেয়ারফ্যাক্স ফিনানশিয়াল নামে একটি সংস্থাকে বিক্রি করে দিতে সম্মত হয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অর্থনৈতিক বিষয়ক কমিটি। এর মধ্যে কেন্দ্রের হাতে ৩০.৪৮ শতাংশ এবং এলআইসির হাতে ৩০.২৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এর অর্থ, এই ব্যাংকের মালিকানা চলে যাবে ফেয়ারফ্যাক্সের হাতে। কাহিনির এটা শুরু। পরের অংশটি আরও রোমহর্ষক! তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংক-বিক্রির ‘টেন্ডার’ ডাকার সময় প্রথমে একটি শেয়ারের দাম ধার্য ছিল ৯৪.৪২ টাকা। অর্থাৎ শেয়ার কিনতে গেলে ন্যূনতম এই দাম দিতে হবে ক্রেতাকে। এটা জেনেও টেন্ডারের অংশ নিয়ে বেসরকারি সংস্থা ফেয়ারফ্যাক্স দর দেয় শেয়ার পিছু ৭৫ টাকা। কেন্দ্র এবার শেয়ারের ন্যূনতম দাম (বেস প্রাইস) এক ধাক্কায় ৭৫.৯৯ টাকায় নামিয়ে এনে ফেয়ারফ্যাক্সকে নতুন করে দরপত্র জমা দিতে বলে। এবার এই সংস্থা শেয়ার পিছু ৮১ টাকা দর দিয়ে কাজ হাসিল করে নেয়। মোট ৬০.৭২ শতাংশ শেয়ারের দাম ধার্য হয় ৫২ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। এই হিসাবে পরিষ্কার, সরকার শেয়ারের ন্যূনতম দাম কমানোয় লোকসানের অঙ্ক ৮ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। খবরে প্রকাশ, গোটা দেশে আইডিবিআই ব্যাংকের মোট ১২০টি সম্পত্তি রয়েছে। এর মধ্যে হায়দরাবাদে ৫০ একর জমির উপর ব্যাংকের যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি রয়েছে, তারই বাজার মূল্য বর্তমানে ১৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অতএব ১২০টি সম্পত্তির দাম কত হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। ফলে লাভজনক ও বিপুল সম্পত্তির অধিকারী এই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির মালিকানা কার্যত জলের দরে একটি বিদেশি সংস্থার হাতে রীতিমতো নিয়ম লঙ্ঘন করে তুলে দেওয়ায় অভিযোগ উঠেছে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। এভাবে সস্তায় ব্যাংক বিক্রির অভিযোগ সরকার উড়িয়ে দিলেও সন্দেহ আর বিতর্ক উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। 
সাধারণ যুক্তিতে বলে, কোনো সরকারি সংস্থা রুগ্ন হলে সরকারের তার পাশে দাঁড়ানো উচিত। সাধারণ ধারণাও বলে, চাকরির স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা, অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তার কারণে বেশিরভাগ মানুষই সরকারি সংস্থায় কাজ করার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু গত বারো বছরের অভিজ্ঞতা হল, সরকারি সংস্থাগুলিতে নিয়োগ কার্যত বন্ধ। শূন্যপদের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। পাশাপাশি চলছে নির্বিচারে কর্মী সংকোচন। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তথ্যই বলছে, সেখানে ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৯.২০ লক্ষ। ২০২৩-২৪ সালে ১.৮ লক্ষ কমে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৮.১২ লক্ষে। সরকারি ক্ষেত্রে নিজেদের এই পাহাড়প্রমাণ ব্যর্থতা ঢাকতে এবং বেসরকারি হাতে সরকারি সম্পদ তুলে দিয়ে দলীয় তহবিল স্ফীত করতে কর্পোরেটই এখন মোদি সরকারের সবচেয়ে বড়ো বন্ধু। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু আইডিবিআই-ই নয়, ২০২৫ সালে দেশের মোট ১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের লাভের পরিমাণ ছিল ১.৭৮ লক্ষ কোটি টাকা। সব ধরনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে ধরলে লাভের অঙ্কটা আকাশছোঁয়া। তবু সরকারি ক্ষেত্রগুলিকে তিলে তিলে মেরে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে এই জমানায়। আইডিবিআই এর একটা উদাহরণ মাত্র। আসলে এই সরকার দেশের মানুষের স্বার্থের কথা আদৌ ভাবে না। দলীয় স্বার্থরক্ষাই তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায়। তাই দেশের গর্বের একাধিক সম্পদ বেচে দিতেও তাদের এতটুকু দ্বিধা নেই! নেই নীতিনৈতিকতার বালাই!