পরীক্ষা পিছোবে কেন?
  • ৫ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মিড ডে মিলের চাল-ডালের হিসাব রাখা, এসআইআরে ভোটার তালিকা ঠিক করা, ভোটের ডিউটির পর এবার জনগণনার তথ্য সংগ্রহ ও আপলোড। সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলের শিক্ষকদের সরকারি কাজের তালিকা ক্রমশ লম্বা হচ্ছে। স্কুলের ক্লাস বন্ধ রেখে একের পর এক প্রশাসনিক দায়িত্ব চাপানো হচ্ছে তাঁদের ঘাড়ে। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে আসল কাজ, অর্থাৎ শিক্ষাদানের সময়। ফল? পড়ুয়াদের ভোগান্তি। জনগণনার কাজে শিক্ষকদের নিয়োগের জেরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হল। এতে সবথেকে বেশি সমস্যায় পড়বে সরকারি স্কুলে পড়া ছাত্রছাত্রীরাই। কারণ, পরীক্ষার সূচি পিছোলে শুধু কয়েকটি তারিখ বদলায় না। মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থীদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ও রিভিশন ব্যাহত হয়। উচ্চ মাধ্যমিকের পড়ুয়াদের কলেজে ভরতি এবং প্রবেশিকা পরীক্ষার পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একাদশ-দ্বাদশের ক্লাসের ছন্দ ভাঙে। যাদের সামনে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, তাদেরও সময়ের হিসাব ওলটপালট হয়। দেরি হয় পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ শুরু করতে। ফলে সিলেবাস শেষ করার জন্য হাতে থাকে কম সময়। এতে আরও চাপ বাড়ে শিক্ষকদের উপর। স্কুলে ক্লাস না হলে পিছিয়ে পড়া পড়ুয়ারা আরও পিছিয়ে যায়। এই ক্ষতি শুধু পরীক্ষার রেজাল্টে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষার ভিতটাই দুর্বল হয়। এভাবে শিক্ষার সর্বনাশ করে কোন প্রশাসনিক দক্ষতার প্রমাণ দিতে চাইছে সরকার? এ কেমন ব্যবস্থা?

Advertisement

সেই কবে ‘হীরক রাজা’ বলে গিয়েছেন—‘ওরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।’ তার উপর ছিল হীরক রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী মন্ত্রগুপ্তি, ‘লেখাপড়া করে যে, অনাহারে মরে সে।’ সেই শঙ্কা থেকেই হীরক রাজার দেশে উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা তুলে দেওয়া হয়। কল্পনার সেই হীরক রাজ্যের সঙ্গে বর্তমান ভারতের বড়ো মিল। এখানেও খোদ শিক্ষামন্ত্রকের পরিসংখ্যানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মোদি জমানার ১২ বছরে গোটা দেশে ঝাঁপ বন্ধ হয়েছে এক লক্ষেরও বেশি সরকারি বা সরকার পোষিত স্কুলের। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০-২৫টি বিদ্যালয় উঠে গিয়েছে। জ্বলন্ত সেই সমস্যার দিকে সরকারের নজর সেভাবে নেই। স্কুলে শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে। পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে। পড়ুয়াদের পঠনপাঠনের সমস্যা মেটানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অথচ সেই সব ঘাটতি পূরণ, পরিকাঠামো উন্নয়ন না করে সরকার খালি শিক্ষকদের উপর চাপ বাড়াচ্ছে। শিক্ষকদের দায়িত্ব কি শুধু সরকারি প্রকল্পের হিসাব রাখা? না, তাঁদের মূল দায়িত্ব শিক্ষাদান, পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়ানো, পরীক্ষার প্রস্তুতি, নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলা। এসবের জন্য সময় লাগে। মনোযোগ লাগে। নিয়মিত উপস্থিতি লাগে। সেই সময়টাই যদি প্রশাসনিক কাজে চলে যায়, তাহলে পড়ুয়াদের কী হবে? তবে কি সরকারের চোখে শিক্ষকদের আসল কাজ পড়ানো নয়? প্রশ্ন উঠছে।
এর মানে কিন্তু এই নয় যে সরকারি কাজের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। জনগণনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এটা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তার জন্য পরীক্ষা পিছোবে কেন? কই লোকসভা-বিধানসভা ভোট তো পিছোয় না? যে কোনো কাজের দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার থাকা দরকার। যে কর্মী যে কাজের জন্য নিযুক্ত, তাঁকে সেই কাজ থেকে সরিয়ে অন্য দায়িত্বে লাগানোর আগে তার পরিণতি ভাবতে হবে। শিক্ষকদের দিয়ে সব কাজ করানো মানেই দক্ষ প্রশাসন নয়। বরং তা কর্মী নিয়োগের ঘাটতি এবং পরিকল্পনার দুর্বলতাকেই সামনে আনে। কেন জনগণনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করা যায় না? অ্যাপে তথ্য আপলোডের কাজ তো প্রশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের দিয়ে আরও ভালোভাবে করানো সম্ভব। প্রশিক্ষিত অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করলে কাজও দ্রুত এগবে, তরুণদের কর্মসংস্থানও হবে। শিক্ষকরা ফিরবেন শ্রেণিকক্ষে। সরকার কি এই সহজ সমাধান ভেবে দেখেছে? নাকি স্থায়ী কর্মীদের দিয়ে সব কাজ করিয়ে নেওয়াই সস্তা ও সুবিধাজনক? জনগণনার থেকে পড়াশোনা কিন্তু কম জরুরি নয়। শিক্ষকরা পড়ুয়াদের প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখান। তাঁদের সেই কাজের সময় কেড়ে নেওয়া কি তবে শাসকের কাছে নিছক প্রশাসনিক সুবিধা? নাকি শিক্ষার স্বাধীন ও যুক্তিবাদী চর্চার গুরুত্ব কমানোই টার্গেট? জনগণনা হোক, সরকারি কাজও চলুক। তার জন্য ক্লাস বন্ধ থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। পরীক্ষাও সময়ে হওয়া দরকার। প্রশাসনের কর্মী নিয়োগের ব্যর্থতা ঢাকতে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তোলার কোনো অধিকার সরকারের নেই।