তন্ময় মল্লিক: সঙ্গিকতা ফিরে পাওয়া নাকি গণতন্ত্র রক্ষা? বিরোধীরা এর কোনটিকে প্রাধান্য দেবে, তার উপরেই নির্ভর করছে জ্ঞানেশ হটাও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ। রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাওয়া যদি বিরোধী দলগুলির উদ্দেশ্য হয়, তাহলে লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগেই মুখ থুবড়ে পড়বে আন্দোলন। আর বিরোধিতায় খাদ না থাকলে বিজেপিও বুঝতে পারবে, রামলীলা ময়দানের সভা কোনো ‘ফ্লপ শো’ ছিল না। এই মঞ্চেই পাকানো হয়েছিল মোদি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সলতে।
বিরোধীদের আন্দোলন থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, উপলক্ষ্য জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, লক্ষ্য মোদি সরকারের পতন। তাই জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচাতে ‘ঢাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপি। সামনের বছর উত্তরপ্রদেশে ভোট। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, দেশের রাজনীতির জল কোন দিকে গড়াবে, তার ইঙ্গিত উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন থেকে কিছুটা পাওয়া যায়। যোগী রাজ্যে বিজেপির শক্তি বাড়লে বিরোধী জোট দুর্বল হবে। আর বিজেপি ধাক্কা খেলে শরিকরা তো বটেই, দলের নেতারাও বেসুরো গাইবেন। তাতে ২০২৯ সালের লড়াইয়ে বিজেপি শুধু পিছিয়েই পড়বে না, ছিটকে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাতে বিরোধীরা চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা মনে করছে, জ্ঞানেশ কুমারকে রেখে নিরপেক্ষ এবং অবাধ ভোট সম্ভব নয়। তবে, এই ইস্যুতেও বিরোধীরা এককাট্টা, এমনটা বলা যাচ্ছে না। এখনও কিছু দল নিজেদের বিজেপি বিরোধী বলে দাবি করলেও পাঁচিলে উঠে বসে আছে। পরিস্থিতি দেখে ঝাঁপ দেবে। তবে, ‘আরশোলার দল’ যেভাবে মোদি বিরোধিতা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে খুব বেশি দিন পাঁচিলে বসে থাকা সম্ভব হবে না। সরকার যে আর্থিক নীতি নিয়েছে তাতে দু’টি শ্রেণি থাকবে। ধনী ও দরিদ্র। মধ্যবিত্ত বলে কিছু থাকবে না। একইভাবে ককরোচদের আন্দোলনের চাপে দেশের রাজনীতিতেও দু’টি পক্ষ থাকবে। একটি বিজেপি, অন্যটি বিজেপি-বিরোধী। এর বাইরে তৃতীয়পক্ষ থাকবে না। যারা পাঁচিলে বসে জল মাপবে তাদের মানুষ ‘ধান্দাবাজ’ বলবে। দিন দিন রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে।
ডেঙ্গু বাড়লে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর, প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে শিক্ষামন্ত্রীর, ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটলে রেলমন্ত্রীর, জঙ্গি হামলা হলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি ওঠে। এমনকি সার্বিক ব্যর্থতার জন্য মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে অনেক আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু, একজন আইএএস অফিসার তথা স্বশাসিত সংস্থার প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও আন্দোলনের ঘটনা শুধু বিরলই নয়, নজিরবিহীন। আন্দোলনকারীরা দাবি আদায়ের জন্য নকল পার্লামেন্ট বসিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিচার করেছে। রামলীলা ময়দানে সভা করে সরকারকে বার্তা দিয়েছে। লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে, বিরোধিতা যতই তীব্র হোক, বিজেপি জ্ঞানেশ কুমারকে সরাবে না। এমনকি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিজে ইস্তফা দিতে চাইলেও বিজেপি রাজি হবে না। কারণ উত্তরপ্রদেশে জিততে গেলে জ্ঞানেশ কুমারকে বিজেপির দরকার।
মাত্র কয়েক মাস আগেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিন্তু এমনটা ছিল না। মোদি-অমিত শাহদের বিরোধিতা করার আগে বিরোধীরা পাঁচবার ঢোঁক গিলত। আর এখন? দেশের বিরোধীনেতা রাহুল গান্ধী কথায় কথায় নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করছেন। তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে বিদ্রুপ করছেন। অর্থনীতি থেকে এপস্টাইন, যে কোনো ইস্যুতে ‘অন ক্যামেরা’ বিতর্কে বসার চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী নীরব। তিনি রাহুল গান্ধীর চ্যালেঞ্জ নেবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, রাহুল গান্ধী কথাগুলি বলছেন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে। রাহুলের বক্তব্য যাঁরা শুনছেন তাঁদের ৭৫ ভাগই তাঁকে সমর্থন করছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নীরব থাকায় যাঁরা কথায় কথায় ৫৬ ইঞ্চি ছাতির আস্ফালন করতেন তাঁরাও পড়েছেন ধন্দে। একটা ন্যারেটিভ তৈরি হচ্ছে, ‘মোদিজি ভয় পেয়েছেন।’
একুশের নির্বাচনে বাংলায় মোদি-অমিত শাহ জুটি সর্বশক্তি নিয়োগ করেও জয় পায়নি। তাই ‘আম্পায়ার’কেই বগলদাবা করার ফন্দি এঁটেছিল। সংশোধন করা হয়েছিল নির্বাচনি আইন। নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল নজিরবিহীন রক্ষাকবচ। বিজেপি নেতৃত্ব বুঝেছিল, সোজা পথে বাংলা দখল অসম্ভব। তাই ঘি খাওয়ার লোভে আঙুল বেঁকিয়েছে। কিন্তু, ঘি এতটাই গরম যে তাতে শুধু আঙুল নয়, মুখও পুড়েছে। গোটা দেশ বলছে, এসআইআর এর নামে যা হয়েছে তা ‘প্রাতিষ্ঠানিক রিগিং’। রাজ্যে রাজ্যে বিজেপির পছন্দমতো ভোটার তালিকা তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে। তা আটকাতে মরিয়া বিরোধীরা। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টও নড়েচড়ে বসেছে। জানতে চেয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য।
সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে এক বাঁকের মুখে। এই পরিস্থিতিতে বাংলায় বিরোধীরা এককাট্টা হলে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারত। সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার ‘সাদা পতাকা’ নিয়ে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন। তাঁর পরামর্শ, ‘বিজেপিকে হটাতে গেলে রং ভুলে সবাইকে এক হতে হবে।’ তবে, বঙ্গ সিপিএম যেভাবে তৃণমূলকে আক্রমণ করছে, তাতে এ রাজ্যে বিরোধী জোটের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
অনেকে বলছেন, গণতন্ত্র রক্ষার চেয়ে রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকাই সিপিএমের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কমতে কমতে বামেরা এখন পাঁচ শতাংশ। নেতৃত্ব বুঝেছে, রামে যাওয়া ভোট আর বামে ফিরবে না। বাড়তে গেলে ভাঙতে হবে তৃণমূলকে। তাই বামেরা যত না বিজেপির সরকারের এনকাউন্টারের প্রতিবাদ করছে, তারচেয়েও তৃণমূলের করা ভুলগুলি নিয়ে অনেক বেশি ‘জাবর’ কাটছে। কিছু নেতার বক্তব্য শুনলে মনে হয়, রাজ্যে বিজেপি নয়, এখনও ক্ষমতায় আছে তৃণমূল। এই ট্র্যাডিশন বজায় থাকলে ভাগাভাগি হবে বিরোধী ভোট। তাতে লাভ কার? বিজেপির। ফলে সিপিএম নেতৃত্ব মুখে বিজেপির বিরোধিতা করলেও তাদের কাজে লাভ হচ্ছে পদ্মপার্টির।
কংগ্রেস ভেঙে হয়েছে তৃণমূল। ফলে উভয় দলের মধ্যে সুসম্পর্ক না থাকাই স্বাভাবিক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় থাকার সময় কংগ্রেসকে পাত্তা দেননি। রাহুল গান্ধীকে ‘পরিযায়ী নেতা’ বলে কটাক্ষ করেছেন। মমতা মনে করেছিলেন, তিনি একাই বিজেপিকে রুখে দিতে পারবেন। কিন্তু, ছাব্বিশের নির্বাচনে বুঝেছেন, এককভাবে লড়াই করে ‘প্রাতিষ্ঠানিক রিগিং’ রুখে দিয়ে জেতা সম্ভব নয়। তারজন্য বিরোধী জোটকে শক্তিশালী করতে হবে। সেটা উপলব্ধি করেই তিনি সোনিয়া গান্ধীকে ‘আমার নেত্রী’ বলে সম্বোধন করেছেন। তাতে হয়তো অনেকে ‘ঠেলায় না পড়লে বেড়াল গাছে ওঠে না’ বলে তাঁকে কটাক্ষ করছেন। কিন্তু, মমতা বাস্তবটা বুঝেছেন। অথচ যারা মার্কসবাদকে বিজ্ঞান এবং বাস্তব ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত বলে দাবি করে সেই সিপিএম নেতৃত্ব সেটা বুঝছে না।
ফলে বিরোধীরা শেষপর্যন্ত এককাট্টা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। দিল্লিতে কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব সহ প্রায় সমস্ত বিজেপি বিরোধী দলের প্রতিনিধি মঞ্চে ছিলেন। জাতীয় স্তরে যাঁরা একে অপরের বন্ধু, রাজ্যে তাঁরাই পরস্পরের বিরোধী। তাতে জোটের সুর কাটছে। ঘুরে ফিরে আসছে সেই পুরানো প্রচার, ‘দিল্লিতে দোস্তি, বাংলায় কুস্তি।’
এটাই বঙ্গ বিজেপির সবচেয়ে স্বস্তির জায়গা। বাংলায় বিরোধী জোট যে দানা বাঁধবে না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাই তাঁর বিদ্রুপ, এখানে বিরোধী বলে কিছু নেই। আমরা চাই তৃণমূল-সিপিএম-কংগ্রেস একসঙ্গে রাস্তায় হাঁটুক।
বিরোধীরা ভাগ হলে শাসকের লাভ। এটা রাজনৈতিকভাবে সত্য। কিন্তু, তার উপরেও একটা কথা আছে, জনবিক্ষোভ। সেখানে কোনো জারিজুরি খাটে না। জ্ঞানেশ কুমারের একের পর এক সিদ্ধান্তে গোটা দেশে অসন্তোষ ছড়িয়েছে। কোথাও তা বিক্ষোভের আকার নিয়েছে, কোথাও তুষের আগুনের মতো ধিকি ধিকি জ্বলছে। বিরোধী জোট এককাট্টা হলেই তা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে। তাই আন্দোলন প্রথম থেকেই দমন করতে মরিয়া বিজেপি। এতদিন যে বিরোধীদের ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিত এখন তাদের মোকাবিলার জন্য রাস্তায় নামতে হচ্ছে।
রাষ্ট্রশক্তির ক্ষমতা অসীম। বিরোধীদের শায়েস্তা করার জন্য রয়েছে নানান এজেন্সি। প্রতিবাদীদের দমনের জন্য সদা পূর্ণ থাকে অস্ত্রভাণ্ডার। সে যুদ্ধ লাগাতে জানে, থামাতেও পারে। তারপরেও শাসক হারে। ক্ষমতার অহঙ্কার মাথায় চড়ে বসলে তা মাটিতে নামিয়ে আনার দায়িত্ব নেয় জনগণ। ‘মিড টার্ম ইলেকশনে’ সেটা ট্রাম্প বুঝলেন। ট্রাম্পের ‘বন্ধু’রা বুঝবেন কি?


