বণিকমহল স্বাগত জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নতুন শিল্পনীতিকে। এটি প্রথামাফিকই বলা যায়। সিঙ্গল উইন্ডো সিস্টেমে ডিজিটাল ছাড়পত্র, দীর্ঘমেয়াদি এসজিএসটি সহায়তা, স্থায়ী মূলধন বিনিয়োগে বিপুল ইনসেনটিভ, বিদ্যুৎ মাশুল ও স্ট্যাম্প ডিউটিতে উল্লেখযোগ্য ছাড় প্রভৃতি বিনিয়োগকারীদের সামনে অবশ্যই আকর্ষণীয়। রাজ্য সরকারের তরফে এমন অভূতপূর্ব প্রতিশ্রুতির ঝুলি খুলে দেওয়ার সঙ্গে আইটি, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, ইলেক্ট্রিক গাড়ি, ব্যাটারি, প্রতিরক্ষা, জাহাজ নির্মাণ থেকে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রভৃতি নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ টানার লক্ষ্যও ঘোষিত হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হল—মহিলা ও রূপান্তরকামী কর্মীদের জন্য বিশেষ আর্থিক সুবিধা, কর্মসংস্থানভিত্তিক ইনসেনটিভ এবং পশ্চাৎপদ জেলাগুলিতে শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও শুভেন্দু সরকারের নয়া নীতির উল্লেখযোগ্য দিক। শিল্পমহলের প্রতিনিধিরা এই উদ্যোগে স্বভাবতই আস্থা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু শিল্পনীতির সাফল্য নির্ভর করে যথাসময়ে পরিকল্পনার সুষ্ঠু রূপায়ণে, ঘোষণার ঢক্কানিনাদে নয়। অতীতে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের নামে বহু প্রতিশ্রুতি শোনা গিয়েছে। বিনিয়োগ সম্মেলন, শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠক, বিপুল অঙ্কের প্রস্তাব মিলিয়ে ঝলমলে আয়োজনে কোনো ঘাটতি ছিল না কখনোই। কিন্তু প্রস্তাবিত বিনিয়োগের কতটা সূর্যের আলো দেখেছে? বাস্তবের কারখানায় চিমনি জ্বলেছে খুবই কম ক্ষেত্রে। স্থায়ী কর্মসংস্থানের খতিয়ানটি স্বভাবতই উজ্জ্বল হতে পারেনি আজও। তাই নতুন শিল্পনীতিকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি শিল্প-বাণিজ্য মহলকে ওয়াচ ডগের ভূমিকাও নিতে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপের বাস্তব অগ্রগতির যথার্থ শরিক হতে হবে তাদের। তবেই সরকার এবং শিল্পমহলের যৌথ আন্তরিক ভূমিকা বাংলার জন্য আগামী দিনে সুসংবাদ বয়ে আনতে সক্ষম হবে।
শিল্পায়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল জমি। কারণ শিল্প আকাশে নয় গড়ে ওঠে মাটিরই বুকে। আবার এই জমি কতটা স্পর্শকাতর বিষয় তা আমরা দেখেছি সাম্প্রতি অতীতে—সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে। সেই তিক্ত ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। তা থেকে শিক্ষা নিয়েই জমি অধিগ্রহণ, জমির মালিকানা এবং কৃষকস্বার্থের প্রশ্নে সরকারকে সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। শিল্পের জন্য জমি দিলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার প্রদানের প্রস্তাব, উন্নয়নের পর ২৫-৩০ শতাংশ জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়া, জমি পুলিং এবং ল্যান্ড ব্যাংক তৈরির পরিকল্পনা—সবই প্রশংসনীয় ভাবনা বইকি। একইসঙ্গে প্রশ্ন হল, এই ব্যবস্থায় কৃষকের প্রকৃত সম্মতি কীভাবে নিশ্চিত হবে? জমি খোয়ানো কৃষক ও খেতমজুরের জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষার বিষয়টিও যুক্ত এতে। এই জরুরি বিষয়ের নিশ্চয়তা তখনই সম্ভব যখন কোম্পানির শেয়ার সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবরূপ পাবে। এসব জটিল বিষয় কার্যকর করার জন্য সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোও গড়তে হবে। ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকদের আর্থিক স্বার্থও উপেক্ষার বিষয় নয়। নতুন শিল্পে তাঁদের চাকরির দিকটি নিশ্চিত করতে হবে। বন্ধ শিল্পের জমির পুনর্ব্যবহার এবং পোড়ো সরকারি জমির সদ্ব্যবহারও শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। উন্নয়নের নামে যেন কৃষিজমি এবং কৃষিজীবীদের যাপনের উপর নতুন কোনো চাপ তৈরি না-হয়। তাতে শিল্পায়নের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় রয়ে যাবে।
রাজ্যের সামনে এখন আসল চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। সোজা কথায়, বিকেন্দ্রীকরণের নীতিতে রাজ্যজুড়ে সময় ধরে ধরে বেশি সংখ্যায় শ্রমনিবিড় শিল্পস্থাপন। অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে সিঙ্গুরে শিল্পস্থাপনের আলোচনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আলোচনা আর কারখানা চালু হওয়া যে এক বিষয় নয়, এই চরম সত্য বাংলার প্রতিটি মানুষ সবচেয়ে ভালো জানেন। জমি, পরিকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহণ, দক্ষ শ্রমিক, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনই শিল্প-পরিস্থিতিকে নির্ভরযোগ্য করে তোলে। তোলাবাজি, গুন্ডামির চেনা সংস্কৃতিতে পূর্ণচ্ছেদ টানতে না-পারলে বহু বড়ো সম্ভাবনাও বিনষ্ট হতে পারে অঙ্কুরেই। তাই সাধু সাবধান! পরিবেশ বিধি এবং শ্রমিকের অধিকার যেন বজায় থাকে। অন্যথায় গলদ রয়ে যাবে গোড়াতেই। এমএসএমই শিল্পের বিকাশ, স্থানীয় উদ্যোগের প্রসার এবং উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থানকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্পগুলি রূপায়ণের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে বিনিয়োগের প্রকৃত পরিমাণ, কর্মসংস্থানের সংখ্যা এবং কৃষক-শ্রমিকের পুনর্বাসনের হিসাব প্রভৃতি প্রকাশ করতে হবে নবান্নকে। তবেই সুদৃঢ় হতে পারবে পারস্পরিক আস্থা। ঠিক তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘ইনভেস্ট ইন বেঙ্গল, গ্রো উইথ বেঙ্গল’ স্লোগান। বাংলার মানুষ ভিতর থেকেই ভাবতে পারবেন যে এক অভূতপূর্ব বৃদ্ধির অংশীদার তাঁরাও।


