Bartaman Logo
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এরা বিজেপির কেউ নয়

আপনি কি খোঁজ রাখেন, আম জনতা তো বটেই, দলের অন্দরেও আপনাকে নিয়ে রীতিমতো রসিকতা চলছে? না রাখলে দয়া করে চোখ-কান খুলুন। আপনি শিক্ষিত মানুষ।

এরা বিজেপির কেউ নয়
  • ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: শ্রদ্ধেয় শমীকবাবু,

Advertisement

আপনি কি খোঁজ রাখেন, আম জনতা তো বটেই, দলের অন্দরেও আপনাকে নিয়ে রীতিমতো রসিকতা চলছে? না রাখলে দয়া করে চোখ-কান খুলুন। আপনি শিক্ষিত মানুষ। রবি ঠাকুর থেকে শক্তি-সুনীল, প্রত্যেকেই আপনার ঠোঁটস্থ। রাজনীতির পাঁকে নেমেও যে সৌজন্য বিসর্জন দিতে নেই, সেই প্রমাণও আপনি দিয়েছেন বারবার। কিন্তু পালাবদলের পর হলটা কী? আপনার বোধহয় খেয়াল নেই, বিরোধী থেকে শাসকের শিবিরে আসন বদলের পর শীর্ষ নেতৃত্ব হিসাবে ভূমিকাও বদলে যায়। রাজ্যে দলের প্রধান হিসাবে একটা বাড়তি দায়িত্ব বর্তায়। অথচ, আপনার ভূমিকা হয়েছে তরকারিতে ধনেপাতার মতো। গন্ধটাই আছে। না থাকলেও ক্ষতি হত না। স্রেফ মন্তব্য পাস করছেন! আর মন্তব্যও সেই এক—‘এরা বিজেপির কেউ না’। মে মাসে শুরু হয়েছিল এই সাফাইনামা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ডিম-ইট পড়ল, আপনি বললেন ‘এরা বিজেপির কেউ না। এটা বিজেপির সংস্কৃতি নয়।’ ডিম থেরাপি রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। আপনি আবার বললেন, ‘এরা বিজেপির কেউ না। তৃণমূলের লোকজনই ছুড়ছে।’ বিজেপির ফ্ল্যাগ দেখা যাচ্ছে যে! উঁহু, তাতে কী? জয় শ্রীরাম স্লোগান দিচ্ছে তো! সে তো যে কেউ দিতে পারে। যাদবপুরে কারা যেন তাণ্ডব চালাল। এবিভিপি, বিজেপির নামে। তাদের পতাকায়। স্লোগানে। তারপরও আপনি মাথা নাড়লেন, ‘এরা বিজেপির কেউ নয়। এবিভিপির সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক নেই।’ বাগেশ্বর বাবা এলেন, বাঙালিকে পাখন্ডি বললেন। আমিষ-ফতোয়া চাপালেন। সবটাই সরকারি ‘ছত্রচ্ছায়া’য়। আর আপনি বললেন, ‘বিজেপির সঙ্গে বাগেশ্বর বাবার কোনো সম্পর্ক নেই।’ তাজ্জব কাণ্ড বটে। এখন রাত নামতেই জেলায় জেলায় ভাঙচুর শুরু হয়েছে। সিপিএমের পার্টি অফিস, মমতা তৃণমূলের নেতানেত্রীদের বাড়ি (ভালো তৃণমূলীদের ছাড়)। যাদবপুরে তাণ্ডব চলছে। তখনও আপনি বললেন, ‘এরা বিজেপির কেউ নয়।’ এলাকার লোক দেখল, ক্ষোভে ফুঁসে উঠল, কোথাও কোথাও রুখেও দাঁড়াল। তারপরও আপনার কথা অনুযায়ী মনে পড়ে গেল, তাণ্ডব চালানেওয়ালারা বিজেপির কেউ ছিল না। আপনার কাছে ওরা সব চার ঘণ্টার বিজেপি। আর কিচ্ছু না। করজোড়ে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই—চার ঘণ্টার বিজেপি দিয়ে আর কতদিন চালাবেন? চার মাস তো হয়ে গেল! তারপরও দলের উপর এতটুকু নিয়ন্ত্রণ নেই? এলাকায় চারটে-ছ’টা করে গোষ্ঠী। দেদার তোলাবাজির অভিযোগ। যে যেমন পারছে লুটেপুটে খাচ্ছে। আদি বিজেপিদের একাংশ ক্ষুব্ধ, বিরক্ত। তাঁরা ভেবেছিলেন, প্রথমবার সরকারে এসেছে বিজেপি। আমরা দেখিয়ে দেব, বাকিদের সঙ্গে ফারাকটা। কিন্তু সত্যি বলুন তো... কী ফারাক চোখে পড়ছে? যাহাই তৃণমূল করত, তাহাই বিজেপি করছে। পাবলিক বলছে, দলের নামটা শুধু বদলেছে। কাজকর্ম, মায় লোকগুলো পর্যন্ত এক। আগে তৃণমূলের হয়ে আম জনতার শোষণ করত, এখন বিজেপির ব্যানারে করছে। আগে যারা তৃণমূলের হয়ে বেশি খেতে পারেনি, এখন বিজেপিতে তারাই সামনের সারিতে। একটু যাঁরা ‘বুদ্ধিমান’, তাঁরা আবার তৃণমূলের ‘পরীক্ষিত’ দাদাদের সামনে এগিয়ে রেখেছেন। আমদানি-রপ্তানি তাদের সামনে রেখেই চলছে। ধরা পড়লে তাদের দোষ। ‘বুদ্ধিমান’রা আপনাকে অনুসরণ করেই বলে দেবেন, ‘তোলাবাজরা বিজেপির কেউ নয়।’ এটা দলের জন্য, আপনার জন্য খুব ভালো বিজ্ঞাপন তো?
মজার চিত্রনাট্য চলছে বটে। আম জনতা জানে, কিন্তু দল জানে না! দল জানলেও, আপনি জানেন না। জানলেও আপনিই বা কী করবেন? দলকে তো বাঁচাতে হবে! দলের কর্মীদের মোটিভেট করতে হবে। পদের ‘মর্যাদা’ও বজায় রাখতে হবে। কিন্তু পালাবদলের চারমাসে এভাবে কোনো দলকে পাবলিকের গালি খেতে দেখেছেন? আপনি প্রবীণ, অভিজ্ঞ। বাজি রাখতে পারি, আপনারও মনে পড়বে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় খিল্লির ঝড় চলছে। শালীনতার সীমার মধ্যে থেকে কেউ আপনার নামে বলছেন, ‘এবার বলে না বসে ভবানীপুরের বিধায়ক বিজেপির কেউ না।’ কারও কটাক্ষ, ‘প্রতিটি বক্তব্যই পালটে পালটে যাচ্ছে। এই করেই চার বছর কাটিয়ে দেবে।’ আবার বাংলার আর এক নাগরিক লিখছেন, ‘এবার উনি বলবেন শমীক বিজেপির কেউ নয়।’ এই প্রত্যেকটি মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাভেলেবল আছে। চাইলে খুঁজে নিতে পারেন। আরও চান? একজন মন্তব্য করেছেন, ‘বিজেপি বাড়ির বিধবা বড় বৌদি।’ তার রেশ টেনেই আর একজন লিখেছেন, ‘বিজেপির সন্ধ্যা রায়, যাঁকে বড় বউ মেজ বউ সিনেমায় দেখা যেত।’ আর এক সাধারণ মানুষের খিল্লি, ‘সংস্কৃতি শব্দটাকে অন্য মাত্রা দেওয়ার জন্য শমীক ভট্টাচার্যকে ধন্যবাদ।’ এর থেকেও ‘মন্দ’ কথাবার্তা রয়েছে। সেগুলো এড়িয়ে যাওয়াটাই ভদ্রতা। আপনার নিজেরও পড়তে ভালো লাগবে না। আর রাস্তাঘাটে মানুষ কী বলছেন? বিশ্বস্ত কাউকে জিজ্ঞেস করুন। যা খুশি বলতে পারেন এঁদের, বাম-ভাম-তোলামূল... আপনি নিজেও জানেন, প্রত্যেকের পরিচয় এটা নয়। এঁরাও এই সমাজেরই অংশ। এই তালিকায় কেউ কেউ বিজেপির সমর্থকও আছেন। চার মাস আগে আপনাদেরই ভোট দিয়েছিলেন। তাঁরা কোনো তাঁবেদার বা বিজেপির সুবিধাপ্রার্থী নন। দয়া করে একটু শুনুন। আর যদি শোনেন, তাহলে দলের ভালো হবে। ভোটে জেতা মানে মাটি থেকে রথ একফুট উপরে উঠে যাওয়াটা আজকের দুনিয়ায় খুব কার্যকরী পদক্ষেপ নয়। গণতন্ত্রের প্রশ্নে নয়, শুধুমাত্র কাজের নিরিখে, বক্তব্যের নিরিখে। আজকের সমাজে সমাজমাধ্যমের সৌজন্যে সবাই সব জানে। টিভিতে না দেখালেও, গোদি মিডিয়া খবর না করলেও। পাড়ায় পাড়ায় ছোটোখাটো ইউটিউব চ্যানেল চলছে। পাবলিক নিজেও দেখছে, ভিডিয়ো করছে, আপলোড করছে। কোনোকিছুই লুকিয়ে রাখার জো নেই। আজ একটা কথা বললেন, কিন্তু চার মাস আগে হয়তো তার উলটো কিছু বলেছিলেন। দুটো মন্তব্য একসঙ্গে ট্যাগ করে কেউ চালিয়ে দিল। লাইক পড়ে গেল হাজার দেড়েক। কমেন্ট কয়েকশো। সেখানকার খুব কম মন্তব্যে যে আপনার আত্মশ্লাঘা হবে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। 
ক্ষমতায় এসেই আপনি বলেছিলেন, সরকারের উপর দল কিছু চাপিয়ে দেবে না। অর্থাৎ, দুটো এন্টিটি আলাদা। কিন্তু অবাক করা দৃশ্য, সব বণিকসভা আপনাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। আপনি সরকারের জমি নীতি নিয়ে কথা বলছেন। কোন কোন বিনিয়োগকারী রাজ্যে আসবেন, সেই ঘোষণা করছেন। উদ্যোগপতিদের সঙ্গে দেখা করছেন, ছবি তুলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টও করছেন। আম জনতা মনে করছে, শমীকবাবুই তার মানে রাজ্যে শিল্প ধরে নিয়ে আসছেন। কিন্তু তিনি যে বলেছিলেন, সরকারের কাজ সরকার করবে! আর তিনি দলের, সংগঠনের কাজ করবেন? এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলার মানুষ খুঁজছে। আপনাদের ভাষায়, ভাম বা তোলামূল নয়। কত সহজে এভাবে এখন বিরোধীদের ন্যূনতম সম্মানটুকু নিয়ে ছেলেখেলা করছে আপনারই দলের লোকজন। আপনি হয়তো এখনও বলবেন, ‘এরা বিজেপির কেউ নয়।’ ভয়ে হোক, ভালোবাসায় বা পিঠ বাঁচানোর স্বার্থে... বিরোধী দল ভেঙে যাবে। বিরোধী প্রার্থী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে ‘উধাও’ হয়ে যাবেন। সরকার নির্ধারিত বিরোধীরা আগের জমানার অভিযোগের ঝুলি নিয়েও বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াবেন। ডিম তাঁদের স্পর্শ করবে না। বিধায়ক খুল্লামখুল্লা বলবেন, ‘ওদের ডিম মারা যাবে না। ওরা ভালো তৃণমূল।’ তার ভিডিয়ো ভাইরাল হবে। পুলিশ নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। দেখবে, শুনবে... কিন্তু কিছু করবে না। ঘনিষ্ঠ মহলে বলবে, ‘আপনারা জানেন না, আমাদের উপর কী প্রেশার!’ তারপরও আপনি বলবেন, ‘পুলিশ কি পকেটে হাত ঢুকিয়ে ডিম খুঁজবে?’ কী বলেন, এগুলো স্ক্রিপ্টেড নয়? এর নেপথ্যে বিজেপির কোনো ভূমিকা নেই? কী ভাগ্যি, আপনি স্বীকার করেছেন, বিরোধীশূন্য অবস্থা গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়। শুনেও স্বস্তি হল। আবার ধন্দও। কারণ, গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটাই তো দেশে বদলে গিয়েছে। এখন গণতন্ত্র মানে প্রদীপ জ্বালানো। গণতন্ত্র মানে প্রচার, বিশ্বগুরুর নাম তিনবার জপ করলেই বানভাসি এলাকায় জল নেমে যাবে। গণতন্ত্র মানে বিরোধী দলনেতাকে প্রকাশ্যে পাপ্পু বলা। কিন্তু বিশ্বগুরুর সমালোচনা করলেই দেশদ্রোহী। তার জেল হবে। বিচারের তারিখ পিছিয়ে যাবে। পরিবারের বেঁচে থাকাটাও দুষ্কর হয়ে উঠবে। আপনি এই সবই কি সমর্থন করেন? দেখে বা আপনার কথা শুনে তেমনটা তো মনে হত না। ভাবতাম, কোথাও কিছু তো আলাদা! সেই পৃথক বিষয়টা কোথায়? শুধু মন্তব্যে? ‘এরা বিজেপির কেউ নয়!’ শমীকবাবু, বাংলায় দলটা আপনার। সংগঠনটা আপনার। মানুষের বিশ্বাস পাওয়া সহজ। কিন্তু ধরে রাখা কঠিন। সেই আশাতেই কিন্তু আপনার দলকে জিতিয়ে ক্ষমতায় এনেছে বাংলার মানুষ। আশা রেখেছে আপনার উপর। আর সেই আশাতেই লেখা এই খোলা চিঠি। কোনো দলেরই কেউ নয়... এমন এক সাধারণ মানুষের।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ