কথা ছিল বদলে যাবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। নেতাদের মদতে তোলাবাজি বন্ধ হবে। শাসকের আইন নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে সর্বত্র। পুলিশ দলদাস না হয়ে নিরপেক্ষভাবে অপরাধের মীমাংসা করবে। নিন্দা, সমালোচনা উড়িয়ে উপনির্বাচনে সব দল সমানভাবে লড়তে পারবে। কোথাও ভোট লুট হবে না। প্রার্থীকে কেউ ভয় দেখাবে না। বিরোধীদের পার্টি অফিস আক্রান্ত হবে না। প্রতিবাদ করলেই পুলিশ লাগিয়ে তাঁকে উত্ত্যক্ত করা হবে না ভরসার বঙ্গ মৃগয়ায়। কিন্তু এই ক’মাসেই সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখছি সামান্য নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে। বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ঐতিহাসিক পালাবদলের পর পাঁচ মাস অতিবাহিত। এখনও শুধু আগের জমানার কাদা ঘেঁটে পার পাওয়া কি সম্ভব? মানুষ দেখছে, গদিতে বসলে শাসকের চরিত্রে খুব ইতরবিশেষ হয় না। সব একই থাকে। স্থান বদল করে মানুষগুলো। উপনির্বাচনেও তাই। প্রচার দূরে থাক মাঝপথে প্রার্থী চাপে পড়ে রণে ভঙ্গ দেন। কোথাও দু’দশক আগের মামলায় পুলিশ তুলে নিয়ে যায় কিংবা প্রতীকটাই বাতিল হয়ে যায় নির্বাচন কমিশনের সৌজন্যে। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরেও পরতে পরতে নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। যদিও শাসক বিরোধী দু’পক্ষই জানে এই দুই কেন্দ্রের ফলে বিধানসভার ক্ষমতার বিন্যাস ও সমীকরণে বিশেষ বদল হবে না। তবু শাসকের জেদ। ওটুকুই বা ছাড়ব কেন? একটা আসন, একটা ওয়ার্ড কিংবা একটা পঞ্চায়েত সব আমার। একটাও ছাড়ব না!
মমতা সমর্থন জানাতেই নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের গ্রেফতারি নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে পুলিশ। চণ্ডীপুর থানার পুলিশ মিলন প্রধানকে গ্রেফতার করে বামফ্রন্ট আমলের মামলায়। এতদিন তিনি পুলিশের খাতায় ছিলেন পলাতক, ফেরার। বলি, পুলিশ সত্যি এতদিন তাঁকে খুঁজেছিল? না শাসক চায়নি বলে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়েও দেখতে পায়নি উর্দি পরা বাহিনী! মমতা সমর্থন জানাতেই শাসকের নির্দেশ ও ইচ্ছায় সোজা গারদে। কে যেন বলেছিল ভোট ঘোষণা হলে প্রশাসন চলে যায় নির্বাচন কমিশনের হাতে। বলি, বিধানসভা ভোটের আগে নন বেলেবল ওয়ারেন্ট কার্যকর হয়নি কেন মিলনের বিরুদ্ধে। তখন মমতা সমর্থন করেননি বলে? আর এবার তিনি ভোটে দাঁড়াতেই খোঁজ মিলল মিলনের, তাও মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নন্দীগ্রামে প্রার্থী করেছিলেন চাকরি হারানো সঞ্চিতা প্রধান দে-কে। তিনি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করার পরে মমতা ঘোষণা করেন যে, তাঁরা নন্দীগ্রামে কংগ্রেসকে সমর্থন করবেন। এরপরই নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার হন নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনের প্রার্থী কংগ্রেস নেতা মিলন প্রধান। পুলিশ জানিয়েছে, নন্দীগ্রাম থানায় ৪টি জামিন অযোগ্য ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি থাকায় গ্রেফতার করা হয়েছে এই কংগ্রেস নেতাকে। ধৃতের বিরুদ্ধে খুন, খুনের চেষ্টা, অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে প্রায় ১৯ বছর ফেরার ছিলেন ধৃত মিলন প্রধান। মামলাগুলির চার্জশিটেও তাঁকে ফেরার হিসাবে দেখানো হয়েছে। অতীতে একাধিকবার ওয়ারেন্ট কার্যকর করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ। এবার আর ব্যর্থ হয়নি পুলিশ। নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী হওয়া মিলন প্রধানকে গ্রেফতার প্রসঙ্গে পুলিশ বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ভোটের সময় পুরানো ওয়ারেন্ট কার্যকর করার নির্দেশ থাকে নির্বাচন কমিশনের। আর নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ীই গ্রেফতার করা হয়েছে কংগ্রেস নেতা মিলন প্রধানকে।
এই পর্যন্ত সবই ঠিক আছে। অপরাধ করলে এবং সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকলে পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নেবে এতে আশ্চর্যের কিছু থাকতে পারে না। গোল বাঁধে যখন দেখি ১৯ বছর ধরে এতগুলো ভোট পেরিয়ে আচমকাই যখন অভিযুক্তের সন্ধান পায় পুলিশ! অব্যর্থভাবে। যদি মিলন নন্দীগ্রামে না দাঁড়াত! যদি রাতারাতি শাসকের কাছের কেউ হয়ে উঠত! কিংবা পবিত্র পদ্মের গন্ধে বিভোর হয়ে উঠত তাহলে পুলিশ ১৯ বছর পরও তাঁকে ফেরার দেখিয়েই কর্তব্য নির্বাহ করত অবলীলায়! কিন্তু যেহেতু শাসকের বদল হয়েছে এবং তাঁর হুকুম তামিল করাই পুলিশ ও প্রশাসনের একমাত্র অগ্রাধিকার, তাই ভোটের আগের দিন পর্যন্ত হাজতবাস অবধারিত। তাহলে লড়াই করবে কে? শাসকের একতরফা প্রচার চলবে নন্দীগ্রাম জুড়ে! আর ভোটের দিন? ৬ অক্টোবর। মুখ্যমন্ত্রী বার বার বলছেন জয়ের মার্জিন এমন হবে সবাই চমকে যাবে! ওটাই শাসকের ইচ্ছা। তাকে সম্মান দেওয়াই তো নন্দীগ্রামবাসীর কর্তব্য। তিনি চমক দিন আর আমরা মানে গড় অকিঞ্চিৎকর ভোটারকুল দেখতে থাকি অবাক বিস্ময়ে। এই আমাদের ভবিতব্য হোক ভয়হীন ভরসার বঙ্গে!