Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গণআন্দোলনের চরিত্র বোঝা রাজনৈতিক মুন্সিয়ানা

গণআন্দোলনের চরিত্র বোঝা রাজনৈতিক মুন্সিয়ানার পরিচয়। যুবসমাজের ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। কেন এই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ? বিস্তারিত পড়ুন।

গণআন্দোলনের চরিত্র বোঝা রাজনৈতিক মুন্সিয়ানা
  • ২৪ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: এই আন্দোলন যে শুধুই নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্রকে কেন্দ্র করে নয়, এটা বোঝার জন্য  খুব বেশি বুদ্ধিমান হতে হয় না। ভারত সরকার কিংবা শাসক জোট নিশ্চয়ই এটা জানে। এই আন্দোলন ক্রমেই গণআন্দোলনে পর্যবসিত হওয়ার কারণ হল, নানাবিধ ক্ষোভ, ক্রোধের বহিঃপ্রকাশের একটি মঞ্চ পাওয়া গিয়েছে। যে লক্ষ লক্ষ যুবসমাজ দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, তাদের কতজন নিট পরীক্ষা দিয়েছে কিংবা দেবে? কী এসে যায় তাদের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে? তাহলে তারা আসছে কেন? ভিড় বাড়ছে কেন? কারণ, এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তারা সরকারের বিরুদ্ধে যে পুঞ্জীভূত রাগ সেটির প্রকাশ করতে চাইছে। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, ছাঁটাই হয়ে যাওয়া, লোন না পাওয়া, সংসার চালাতে না পারা, অপমানিত হওয়া ইত্যাদি হাজার রকম কারণের সম্মিলিত বিস্ফোরণ। যতরকম সরকার বিরোধী ক্ষোভ রয়েছে, সেগুলি অবশেষে একটি কোনো সম্মিলিত সমাবেশে প্রকাশ করে ফেলার সুযোগ পাচ্ছে জনতা, সেই কারণেই দলে দলে ভিড় করছে তারা। 

Advertisement

এই সহজ কথাটি ভারত সরকার যদি স্বীকার করে নিয়ে এখন থেকেই ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে সরকার অথবা শাসক দলের পক্ষেই সেটি স্বস্তিকর হবে। বিরোধীরা এখনও ছত্রভঙ্গ। একজোট হতে পারছে না। বিজেপি বিরোধী কোনো দলের একক গ্রহণযোগ্যতা এখনও নেই। ইন্ডিয়া জোটের শরিকরা ছিন্নভিন্ন। কিন্তু সেই সুযোগটি সরকার না নিয়ে যদি নিজেদের বিরুদ্ধে ইস্যু বিরোধীদের হাতে তুলে দেয়, তাহলে শাসকের  নির্বুদ্ধিতাই প্রকট হবে। 
শাসকের বড়ো সংকট হল ইগো ও জেদ। প্রথম থেকে সেই জেদ ও ইগো ধরে রেখেই এই আন্দোলনকে বাড়তে দেওয়া হয়েছে। এই যে এখন সরকারকে অনেক নরম দেখাচ্ছে, তারা আলোচনায় আগ্রহী, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহী ইত্যাদি এই প্রবল গণআন্দোলনের জেরে। এসব আগেই করা যেত। কিন্তু এখন যেটা ভাবা দরকার, সেটি হল, এই তীব্র ক্ষোভের জন্ম কীভাবে হল? এটা সর্বাগ্রে সরকারকেই বুঝতে হবে। গণআন্দোলনের চরিত্রকে বুঝতে পারাই হল রাজনৈতিক মুন্সিয়ানার পরিচয়। 
যেকোনো শাসকের একটিই প্রবণতা। আন্দোলনকে তারা প্রথমেই ভেবে নেয় আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত। এবং আন্দোলনটি ভুল, আমরাই ঠিক। যে কোনো গণআন্দোলন যখন শুরু হয়, তখন দুরকম মনোভাব শাসককে কিছুটা দ্বিধান্বিত করে দেয়। একটি মনোভাব হল, আমি অপরাজেয়। আমাকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না। আবার অন্য মনোভাবও সৃষ্টি হয়, আমি গদিচ্যুত হব না তো? ক্রমেই আন্দোলনের ডালপালা যদি বেড়ে যায়, যদি দেখা যায় ক্রমশ ক্ষুদ্র পরিসর ছাড়িয়ে সেই আন্দোলন বৃহৎ আকার ধারণ করছে এবং জনমানসে আন্দোলন ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, বহু মানুষ প্রকাশ্যে সেই আন্দোলনকে সমর্থন করছে, তখন সর্বাগ্রে একটি ভীতির সৃষ্টি হয় যে, তাহলে কি আমাকে এই আন্দোলনের জেরে পরবর্তীকালে নির্বাচনে পরাজিত হতে হবে? আমার সরকার চলে যাবে? 
সাধারণত শাসকের সবথেকে ঘনিষ্ঠ বৃত্তে সর্বদাই সবদেশে সবকালে থাকে পারিষদবর্গ, তাই সমাজের প্রকৃত মনোভাব থেকে ক্রমেই শাসক সরে যায়। যে নেতানেত্রী সরকারে আসার আগে মানুষের মাঝে থেকেছেন এবং প্রত্যক্ষভাবে মানুষের প্রতিক্রিয়া নিজের ঘাম, রক্ত, পরিশ্রম দিয়ে অনুভব করেছেন, সেই শাসকই ক্ষমতাসীন হয়ে গেলে সর্বাগ্রে সুবিধাবাদী, চাটুকার এবং বশংবদদের মধ্যে বন্দি হয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীরা সর্বদাই ক্ষমতার শীর্ষ স্তরেই সবথেকে বেশি সময় কাটান। তাই তাঁদের কাছে মাটির কথা সর্বদা উঠে আসে না। তাঁরা তখন শুধুমাত্র বহংবদদের কথা শোনেন কানে। তাঁদের কানের কাছে অবিরত বলা হয় সব ঠিক আছে। অল ইজ ওয়েল। আপনি মহান। শাসক সেটাই বিশ্বাস করেন। 
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে বারংবার গণআন্দোলন পরিবর্তন ঘটিয়েছে। সমাজিক পরিবর্তন, সরকারের পরিবর্তন, রাজনৈতিক পরিবর্তন। তবে সব আন্দোলন গণআন্দোলন হয়ে উঠতে পারে না। রাজনৈতিক দলগুলি বিগত প্রায় ৮০ বছরে বহু আন্দোলন করেছে সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু সব আন্দোলন মানুষকে সঙ্গে পেয়েছে এমন নয়। ওই দলের আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ হয়ে থেকেছে। তাই বিরাট বড়ো কোনো প্রভাব পড়েনি। আবার কিছু আন্দোলন হয়েছে গণআন্দোলন। 
১৯৬০ সালের দশকে রাজনৈতিক ও সামাজিক বদলের সবথেকে বড়ো সাক্ষী হয়েছিল তামিলনাড়ুর ভাষা আন্দোলন। জোর করে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এরকম একটি আশঙ্কা থেকে 
১৯৬৫ সালে ওই আন্দোলনের সূত্রপাত। সংবিধানের ৩৪৩ নং ধারা অনুযায়ী স্থির হয়েছিল ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ভারতের সরকারি ভাষা থাকবে ইংরাজি ও হিন্দি। তারপর হিন্দিই হবে  সরকারি ভাষা। পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রভাষা। 
এই ইস্যুতেই তামিলনাড়ুর ডিএমকে রাজনীতির উত্থানের একটি স্বর্ণালি পথ পেয়ে যায়। রাজ্যজুড়ে কেন্দ্র বিরোধী আন্দোলন শুরু করে ডিএমকে। ইস্যু যেহেতু তামিল অস্মিতা এবং মাতৃভাষা, গোটা তামিল সমাজই ডিএমকের আন্দোলনে শামিল হয়ে যায়। আর ওই আন্দোলনে আত্মহত্যা থেকে সরকারকে স্তব্ধ করে দেওয়া, সব হয়েছে। পর্যবসিত হয় গণআন্দোলনে। সরকার পিছু হটে। ১৯৬৭ সালে অফিসিয়াল ল্যাংগুয়েজ আইনের সংশোধন হয়। সেখানে বলা হয়, অনির্দিষ্টকালের জন্য ইংরাজি ও হিন্দি দুইই হবে সরকারি ভাষা। ডিএমকে শুধু যে আন্দোলনের জয় পেল তাই নয়। ১৯৬৭ সালের বিধানসভা ভোটে ডিএমকে সেই যে কংগ্রেসকে সরিয়ে তামিলনাড়ুতে প্রধান রাজনৈতিক দল হয়ে গেল, তারপর থেকে আজও কংগ্রেস ওই রাজ্যে আর ফিরে আসেনি। 
১৯৭৪ সালে গুজরাতের ছাত্রদের নবনির্মাণ সেনার আন্দোলন, বিহারের ছাত্র সংঘর্ষ সমিতির আন্দোলন মিলেমিশে বৃহত্তর এক গণআন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। যাকে বলা হয় জয়প্রকাশ নারয়ণ আন্দোলন। জেপি মুভমেন্ট। ইন্দিরা গান্ধী সেই আন্দোলনের জেরে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। দমনপীড়ন থেকে জরুরি অবস্থা। পরিণতি কী? ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পতন। 
১৯৯০ সালের ভি পি সিং সরকার ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা করেছিল ওবিসিদের জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ। আন্দোলন শুরু হয় দেশজুড়ে।  ছাত্রসমাজের মধ্যে যারা জেনারেল ক্যাটাগরির মধ্যে পড়ে, তারাই এই নয়া সংরক্ষণের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন শুরু করে। এবং বিজেপিও পরিস্থিতি বুঝে ওই বছরের নভেম্বর মাসে ভি পি সিং-এর সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। ভি পি সিং সরকারের পতন ঘটে। 
২০১১ সালে আন্না হাজারে ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশন এবং পরের বছরেই নির্ভয়া আন্দোলন। দুই আন্দোলনের জেরে ইউপিএ সরকার তো বটেই, এমনকি দক্ষতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত পর্যন্ত পরাস্ত হন। আন্দোলনের জোর এবং প্রভাব এতটাই ছিল। ২০২৪ সালের আর জি কর আন্দোলনের জেরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত সম্পূর্ণভাবে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধ অবস্থানে চলে যায়। ২০২৬ সালের ভোটে ওই বীতশ্রদ্ধা অনেকটাই প্রভাব ফেলেছে সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই। 
এই প্রত্যেকটি গণআন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে যেকোনো শাসকের সবথেকে বড়ো পরীক্ষা হল, কোনো অরাজনৈতিক আন্দোলনকে সূচনা থেকে সে কোন চোখে দেখছে। এই প্রতিটি আন্দোলনেই কিন্তু শাসক শ্রেণি ভুল সিদ্ধান্ত ও অবস্থান নিয়েছিল। অর্থাৎ সঠিক সময় সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ওইসব আন্দোলনের রূপরেখা অনেকটাই স্তিমিত হতে পারত। কিন্তু শাসক তখনই নড়েচড়ে বসে, যখন ক্ষোভ বিক্ষোভ ক্রোধ প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইর চলে গিয়েছে। শাসক কথা বলছে না। পুলিশ দিয়ে দমনপীড়ন করছে। আন্দোলনকারীদের উপর নানাবিধ রাষ্ট্রীয় অত্যাচার ও অপবাদ চলছে। এইসবই হল ভুল পদক্ষেপ। দম্ভ ও ক্ষমতা প্রদর্শনকে সাধারণত ভালো চোখে দেখা হয় না। তাই কৌশলী অবস্থান নিতে হয়। 
একটি বিখ্যাত গ্রন্থ আছে। ‘উইশডম অফ ক্রাউডস’। লেখক জেমস সুরোউইকি। অর্থাৎ জনতার প্রজ্ঞা। সাধারণত একটি ধারণা হয় যে, বুদ্ধিজীবী, উচ্চশিক্ষিত, জ্ঞানচর্চাকারীরা নিশ্চয়ই আম জনতার তুলনায় অনেক বেশি জানেন, বোঝেন এবং জ্ঞান আহরণ করেন। কিন্তু এই গ্রন্থে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, জনতা সম্মিলিতভাবে যখন কোনো একটি সিদ্ধান্ত, অবস্থান, পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তখন সেটি সিংহভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের দর্পণ ও সঠিক হিসাবে পরিগণিত হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা হয়েছে, কৌন বনেগা ক্রোড়পতি জাতীয় গেম শো-তে দেখা যায়, অডিয়েন্স পোল প্রায় সর্বদাই একক কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির ‘ফোনো ফ্রেন্ডের’ মতামতের থেকেও বেশি সঠিক প্রমাণিত হচ্ছে! 
গণআন্দোলন কোনদিকে যাচ্ছে, জনতা কেন কোনো একটি ঘটনায় সমর্থন করছে সম্মিলিতভাবে, সেটা নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে হয়। সেটি শাসকের পক্ষে থাকুক আর নাই থাকুক। সেইমতো নেওয়া দরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পদক্ষেপ। একেই বলে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ