Bartaman Logo
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ডবল ইঞ্জিন না ডবল বেকারি?

স্বাধীনতা-পরবর্তী একাধিক দশক ভারত শাসন করেছে মূলত কংগ্রেস। কেন্দ্রে তো বটেই, বেশিরভাগ রাজ্যেও কংগ্রেস ছিল শাসক দল। দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্যে কমিউনিস্ট এবং কয়েকটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের উত্থান শুরু হয়েছিল।

ডবল ইঞ্জিন না ডবল বেকারি?
  • ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বাধীনতা-পরবর্তী একাধিক দশক ভারত শাসন করেছে মূলত কংগ্রেস। কেন্দ্রে তো বটেই, বেশিরভাগ রাজ্যেও কংগ্রেস ছিল শাসক দল। দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্যে কমিউনিস্ট এবং কয়েকটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের উত্থান শুরু হয়েছিল। ইন্দিরা জমানার শেষদিকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল কংগ্রেস-বিরোধী জোট রাজনীতি। কংগ্রেস দীর্ঘদিন একক শক্তিতে ক্ষমতা দখলের ভ্রান্ত খেলায় মত্ত ছিল। তাদের তৈরি ছিদ্রপথেই সুচতুর প্রবেশ ঘটে বিজেপির। হাতিয়ার জোট রাজনীতি—এনডিএ। অটলবিহারী বাজপেয়ীর দল একসময় কেন্দ্রে এনডিএ সরকারও গড়ে ফেলে। সেই দলই এখন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতের দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক। বেশিরভাগ রাজ্যেও ক্ষমতাসীন তাদের এনডিএ। হাতে গোনা সামান্য কয়েকটি রাজ্যই এখনো বিজেপির দখলে আসা বাকি। রাজ্যদখলের রাজনীতিতে তাদের সেরা সাফল্য নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন। এই খেলার প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে ‘ডবল ইঞ্জিন’ তত্ত্ব।  শব্দবন্ধটি নিছক রাজনৈতিক স্লোগান নয়, গেরুয়া উন্নয়ন প্রচারের সেরা বাজি। তারা এই দাবি করে যে, কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় স্তরেই একই দলের সরকার থাকলে প্রশাসনিক কাজে সুসমন্বয় ঘটবে, গতি পাবে সরকারি প্রকল্পের রূপায়ণ, বাড়বে বিনিয়োগ নিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থানেরও দরজা খুলবে। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানের জেলাভিত্তিক ছবিতে সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবের মিল কোথায়? কেন্দ্রের পরিসংখ্যান মন্ত্রকের সদ্য প্রকাশিত রিপোর্ট কী বলছে?  দেশের সর্বাধিক বেকারত্বের দশ জেলার মধ্যে ছয়টিই বিজেপি (এনডিএ) শাসিত রাজ্যে। শীর্ষে অরুণাচল প্রদেশ। পাপুম পারে জেলায় বেকারত্ব ১৬.১ শতাংশ। নাগাল্যান্ডের কোহিমায় ১৪.৯ শতাংশ। বিজেপি-শাসিত রাজস্থানের জয়পুর, বিহারের পাটনা, গোয়ার দক্ষিণ গোয়া এবং উত্তরাখণ্ডের নৈনিতালও এই লজ্জার লিস্টের পার্ট। অর্থাৎ ‘ডবল ইঞ্জিন যেখানে উন্নয়ন সেখানে’ বুলি মোটেই খাটছে না। অন্তত কর্মসংস্থানের ছবি সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। এও মনে রাখা দরকার, জেলা-ভিত্তিক বেকারত্বের হারকে রাজ্য সরকারের সামগ্রিক কর্মদক্ষতার একমাত্র মাপকাঠি বানানো যায় না। স্থানীয় শিল্পের হাল, শ্রমের বাজারে অংশগ্রহণ, শিক্ষার ধরন, ভৌগোলিক অবস্থান, শ্রমের চাহিদা প্রভৃতিও এর উপর প্রভাব ফেলে।

Advertisement

আর এখানেই ডবল ইঞ্জিনের রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনকে নীতির অগ্নিপরীক্ষার সামনে দাঁড় করানো জরুরি। দ্রুত উন্নয়ন এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি—একই দলের সরকার লাভ হলে এমন জেলাগুলিতে কর্মসংস্থানের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে কেন? উত্তর-পূর্ব ভারতের ছবিটি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। পাপুম পারে ও কোহিম—প্রথম দশটি ‘রুগ্‌ণ’ জেলার দুটি বলে নয়, এই সমস্যা সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য গৃহীত কেন্দ্রীয় নীতির কার্যকারিতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তোলে। আবার তালিকায় কংগ্রেস-শাসিত হিমাচ঩লের সোলান ও সিরমৌর, তেলঙ্গানার ভদ্রাদ্রি কোথাগুডেম এবং জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরও রয়েছে। অতএব এই পরিসংখ্যানকে দলীয় প্রচারের সহজ অস্ত্র বানানোর বদলে প্রশাসনিক ব্যর্থতার নির্দিষ্ট জায়গাগুলি চিহ্নিত করা দরকার। অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার যথার্থই বলেছেন, ‘প্রত্যাশামতো কাজের সুযোগ তৈরি না-হওয়াই বেকারত্বের হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ এবং প্রতিটি জেলার সমস্যার চরিত্র আলাদা।’ এই কারণে ডবল ইঞ্জিন মানেই মুশকিল আসান—এমন রাজনৈতিক সরলীকরণ সত্যিই বোকা বোকা বুলি।  কোনো একটি দলের শাসনকে সব বেকারত্বের কারণ দেগে দেওয়ার পিছনেও যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।
এরপর ন্যাশনাল লেভেলের ছবিতেও আত্মতুষ্টির অবকাশ কোথায়? গত আগস্ট মাসে ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সিদের বেকারত্বের হার জুলাইয়ের ৫.১ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশ হয়েছে। গ্রামীণ বেকারত্ব নেমে এসেছে ৪.১ শতাংশে। কিন্তু সংখ্যাটি শহরের ক্ষেত্রে ৬.৮ এবং ১৫-২৯ বছর বয়সিদের বেকারত্ব ১৫.১ শতাংশ। অর্থাৎ তরুণদের কর্মসংস্থান এখনো বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয়। ডবল ইঞ্জিন তত্ত্ব যদি কেবল কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার গঠনের ‘সৌন্দর্যকে’ ইঙ্গিত করে, তবে তার রাজনৈতিক মাহাত্ম্য সীমিত। কিন্তু যদি তার দাবি হয়—এই সমন্বয় উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে অন্যদের তুলনায় দ্রুত এগিয়ে দেবে, তাহলে সর্বোচ্চ বেকারত্বের দশ জেলার মধ্যে ছয়টি ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে অবস্থানের তথ্য বিজেপির কাছে নিছক পরিসংখ্যান নয়, জবাবদিহিরই প্রশ্ন। কর্মসংস্থানের হিসাবের খাতায় দলীয় রঙের জায়গা নেই। সেটি বরং দেখায় উপযুক্ত কাজ আছে কি নেই। অতএব ডবল ইঞ্জিনের আসল পরীক্ষা নয়াদিল্লি কিংবা রাজ্যগুলির সচিবালয়ে নয়, পাপুম পারে, কোহিমা, জয়পুর বা পাটনার সেই যুবদের জীবনে, যাদের কাছে উন্নয়নের অর্থ এখনো একটি উপযুক্ত স্থায়ী চাকরি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ