হিমাংশু সিংহ: পরিবর্তনের বাংলায় আগে একটা নতুন জেল হবে না কারখানা? ধন্দে রয়েছি। রোজ সকাল বিকেল গ্রেপ্তারি আর ভাঙচুর। প্রায় এক মাস কেটে গেলেও দপ্তর বণ্টন পর্যন্ত কথা দিয়েও হল না। তবে ডিম ছোড়ার হিড়িক যেভাবে বাড়ছে তাতে সিঙ্গুরে একটা এগ হাব করা যেতেই পারে! মহামান্য শমীকবাবুরা নিশ্চয়ই ভেবে দেখবেন।
জানি যুদ্ধ আর ভালোবাসায় সবই ষোলোআনা সঠিক, কিছুই অন্যায্য হতে পারে না। রাজনীতির উত্থান পতন এবং সরকার পরিচালনাতেও একই কথা প্রযোজ্য। অনেক আশা নিয়ে মানুষ নতুন সরকারকে এনেছে বাংলায় উন্নয়নের ভোর দেখবে বলে। তাঁদের সেই আশা সফল হোক। শুভেন্দুবাবুর হাতে নতুন দুর্নীতিমুক্ত ‘সোনার বাংলার’ পত্তন হোক। ভয় একটাই, তা করতে গিয়ে প্রতিহিংসার নাগপাশে যেন সরকার না বন্দি হয়। কিন্তু সকালই যদি গোটা দিনটার ইঙ্গিত হয়, তাহলে বলতেই হবে প্রথম মাসে হকার উচ্ছেদ, তেরো পাতার জটিল অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম, লাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রতিপক্ষের গ্রেপ্তারি, ভাঙচুর এবং কোণঠাসা দলটাকে মহারাষ্ট্র মডেলে ভেঙে দেওয়া ছাড়া বিশেষ কিছুই কি মিলেছে আম জনতার। কর্মসংস্থানের সুস্পষ্ট প্রস্তাবের বদলে প্রান্তিক মানুষের পেটে লাথি পড়েছে হকার উচ্ছেদের আড়ালে। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই। রেল স্টেশনে বসা গরিব মানুষগুলোও কিন্তু পরিবর্তন চেয়েছিলেন, উন্নয়নের স্বপ্নে বুঁদ হয়েছিলেন তাঁরাও। শুভেন্দুবাবু তাঁদের কাছেও আশার আলো হাতে নিয়েই আবির্ভূত হয়েছিলেন ভোটের প্রচারে। সংকল্পপত্রের আশ্বাসে। রুটিরুজি হারানো হকারদের দিকটাও তাই পরিবর্তনের সরকারের দেখা উচিত সহানুভূতির সঙ্গে। মলিন মুখের বাদামওয়ালাদের সরিয়ে কর্পোরেট হকার আমদানিও কিন্তু সাধারণের স্বার্থবিরোধী। ওতে বড়ো ব্যবসায়ীদের বিকাশ হলেও ব্রাত্য হয়ে যাবে গরিব মানুষ। নতুন বেকার তৈরি হবে রাজ্যে। সরকারি কর্মীদের ডিএ সংক্রান্ত ঘোষণাও ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে আসন্ন বাজেট পর্যন্ত। কথা দিয়েও ৩৫ মন্ত্রীর দপ্তর বণ্টনই হয়নি, কেটে গিয়েছে গোটা মাস। সরকারি বাসে মহিলাদের যাতায়াত সম্পূর্ণ ফ্রি করে দেওয়া নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য পদক্ষেপ। কিন্তু রাস্তায় সরকারি বাস তো দূরবিন দিয়ে খুঁজতে হচ্ছে। সরকারি বাস না বাড়িয়ে এই সাহসী সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কীভাবে?
তবে আমার কাছে প্রথম মাসের সেরা ঘটনা নিঃসন্দেহে হেরো তৃণমূলকে মহারাষ্ট্র মডেলে ভেঙে দেওয়ার অসামান্য গেরুয়া অপারেশন। মানছি মহামান্য স্পিকারকে দেওয়া চিঠিতে বিধায়কদের সই জাল করা গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনো ক্ষমা নেই। কিন্তু এমন দল ভাঙাভাঙির খেলা বাংলার পরিবর্তনের আবহে নিঃসন্দেহে অভিনব এবং অভূতপূর্ব! গেরুয়া ইন্ধন ছাড়া এই অপারেশন কোনোমতেই সম্ভব হতে পারে না। এই অভিযানে ‘একনাথ সিন্ধে’ হিসাবে উঠে এসেছেন ৯ বছর আগে সিপিএম থেকে বিতাড়িত হয়ে তৃণমূলে আশ্রয় নেওয়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিই এখন মহামান্য বিরোধী দলনেতা। শুভেন্দুবাবুর ছেড়ে আসা চেয়ারের মালিক। ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর হঠাৎ মনে হল এ দলে কথা শোনার কেউ নেই। চারদিকে দমবন্ধ করা পরিবেশ আর ভয়ংকর বসিং! শুনতে কী কিউট না! সিপিএমে থাকার সময় বুদ্ধদেববাবুর মধ্যে ঋতব্রতবাবু লেনিনকে দেখতেন। তাঁর স্নেহেই রাজ্যসভার সদস্যপদ বাগিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে চকিত প্রবেশ। তখনও একাধিক সিনিয়র কমরেডকে টপকে তাঁর উত্থান ভালো চোখে দেখেনি পার্টির একটা বড়ো অংশ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গত পাঁচ বছরে একাধিকবার ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন, মমতার মধ্যে তিনি লেনিনকে দেখতে পান। তিনিই আরাধ্য! তৃণমূল আজ যখন কোণঠাসা তখন মওকা বুঝে পরিষদীয় দলকে আড়াআড়ি ভাঙার নেতৃত্ব দিলেন এককালের সম্ভাবনাময় বাম নেতা ঋতব্রতই। তাঁর নতুন আশ্রয়দাতা নিঃসন্দেহে শুভেন্দু অধিকারী।
গত ২২ মে দিল্লির বঙ্গভবনে মধ্যাহ্নভোজের অবসরে ‘আচমকা’ লাজুক হাসিতে দেখা হয়ে গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আর তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রতের। সেই এক পলকের একটু দেখাই দেড় দশক রাজ্য শাসন করা দলটার দু’টুকরো হওয়ার আদর্শ অনুঘটক।
ভোটের ফল বেরিয়েছিল ৪ মে। জুনের ৪ তারিখ আসার চব্বিশ ঘণ্টা আগেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল তৃণমূল। ৬ মে কালীঘাটের বাড়ির লাগোয়া দফতরে জয়ী বিধায়কদের বৈঠক ডেকেছিলেন মমতা। বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাকে সম্মান জানাতে উঠে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন দলনেত্রী, যা তৃণমূলের অধিকাংশ সদস্যকেই ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। সেই থেকেই তৃণমূলের পরিষদীয় দলে ঐক্যের সুর তাল দুই-ই কাটতে শুরু করে। এরপর ১৯ মে ফের একটি বৈঠক হয় কালীঘাটে। সেখানেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ হয় নির্বাচিত দুই বিধায়ক ঋতব্রত ও সন্দীপন সাহার বক্তব্যে। ফলতার জাহাঙ্গির খান দলকে বিপাকে ফেলে ভোটের ময়দান ছাড়ার পরেও কেন বহিষ্কার হবেন না, প্রশ্ন ছিল সেটাই। অথচ দল যখন ক্ষমতায় তখন অভিষেকের ব্লু আইড বয় হয়েই ঋতব্রত তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের মাথায় ছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত। উত্তরের চা বাগানে ঘুরে ঘুরে সংগঠন সাজিয়েছেন। এই সেদিনও ভোটের আগে যখন সিপিএম ভেঙে প্রতিকুর রহমান তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন তখনও বলেছিলেন, সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে রুখতে পারেন একমাত্র মমতাই। এমনও বলেছেন, সিপিএম ছেড়ে এসে তিনি বুঝেছেন, মমতাই প্রকৃত বামপন্থী।
নির্বাচনে পরাজয় সব সমীকরণ বদলে দেয়। প্রশ্নাতীত আনুগত্য রাতারাতি বদলে যায় আড়াআড়ি বিদ্রোহে। বন্ধু শত্রু আর শত্রু হয়ে যায় সুহৃদ। শ্বাসকষ্ট থেকে ছটফটানি বাড়ে। এভাবে ক্ষমতাই শেষ কথা বলে চিরদিন! বিজেপির অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলন পরিণতি পেয়েছে। তৃণমূল ভেঙে তিনি নিজেই বলেছেন, সাহস বড়ো সংক্রামক। খুব সত্যি কথা। এর অর্থ, ভাঙন শুধু বিদ্রোহী বিধায়কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে কোভিডের মতো ছড়িয়ে পড়ছে জোড়া ফুলের সংসদীয় দলেও। হচ্ছেও তাই। আর এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিষদীয় দলের ভাঙন ব্যাধি সংক্রামিত হবে সংসদীয় দলেও। বাংলা দখলের পর মোদি-অমিত শাহের অগ্রাধিকার একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ বিলকে আইনে পরিণত করা। মহিলা সংরক্ষণের সংশোধনীর আড়ালে ডিলিমিটেশন, ওয়ান নেশন ওয়ান ইলেকশন, ইউনিভার্সাল সিভিল কোড সহ নানা বিতর্কিত বিল যা পাশ করাতে লোকসভা ও রাজ্যসভায় নিরঙ্কুশ দুই তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে ক্ষমতা হারানো বাংলার তৃণমূল এবং তামিলনাড়ুর ডিএমকে স্বভাবতই গেরুয়া শিবিরের সফট টার্গেট!
ওই যে প্রথমেই বলেছি রাজনীতি সম্ভাবনার শিল্প। এখানে জো জিতা ওহি সিকান্দার! দুর্দিনের আশ্রয়দাতা তৃণমূল ভেঙে একেবারে হক কথাটাই বলেছেন ঋতব্রত। অভিষেকের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, দল ভাঙার জন্য তাঁকে কেউ বেইমান, গদ্দার বলতেই পারেন, কিন্তু চোর বলতে পারবেন না। তাঁর ইঙ্গিত স্পষ্ট। তবে নব তৃণমূলের নেতা তথা সম্মাননীয় এলওপির মুখে কথাটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ থমকে গিয়েছিলাম। এই ঝিমধরা গ্রীষ্মেও একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গিয়েছিল মেরুদণ্ড বেয়ে। যতদূর জানি ঋতব্রত ইংরাজিতে রোমহর্ষক এমএ হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাসেরও নিষ্ঠাবান ছাত্র। ইতিহাসে মিরজাফরের ভূমিকাকে এভাবে গৌরবান্বিত করতে কাউকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বিরোধী দলনেতা হিসাবে তাঁর এই যাত্রা সফল হোক, শুভকামনা রইল। আরএসএস দুর্বল তৃণমূল চায়, কিন্তু কোনোমতেই দলটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক চায় না। কারণ সেক্ষেত্রে রাজ্যে সিপিএম ও কংগ্রেসের উত্থান অনিবার্য। আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে তা হলে আর যেই খুশি হোক, মোদি অমিত শাহদের অস্বস্তি বাড়তে বাধ্য। এই সার সত্যটা দীনদয়াল উপাধ্যায় ভবনের থিঙ্কট্যাঙ্কদের বিলক্ষণ জানা।
পরাজয় ৪ মে, দেড় দশক পর রাজ্যে গেরুয়া শাসন প্রতিষ্ঠা ৯ মে। আর দলের রাশ মমতার হাতছাড়া হয়ে গেল ৩ জুন। সাকুল্যে এক মাসও গেল না। আজ ৭ জুন। নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর আটাশ দিন অতিবাহিত। সবকিছুরই ভালো মন্দ থাকে। কিছু কাজ হয়, কিছু হয় না। কিছু প্রতিশ্রুতি সভাসমিতি, ভোটের ময়দানে, চায়ের টেবিলে, সচিবালয়ের তুফান তোলা বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকে। সময় যত এগোয় শাসকের অজান্তেই দুর্নীতি বাসা বাঁধে পরতে পরতে। জনসমর্থনে থাবা বসায় অ্যান্টি ইনকামবেন্সি। এভাবেই আজ যাঁরা ‘কাজের লোক’ হয়ে সরকারে আসেন পরশু তাঁরাই ব্রাত্য হয়ে যান কালের নিয়মে।
এই সেদিনও যাঁরা মমতা-অভিষেকের চারপাশে স্বার্থের তাগিদে, শাঁসালো পদ, এমএলএর টিকিট, প্রভাব প্রতিপত্তির লোভে ঘুর ঘুর করতেন নটে গাছটাকে মুড়োতে দেখে তাঁদের ছটফটানি যে সপ্তমে চড়বে তা বলাই বাহুল্য। দুর্দিনে যাঁরা আশ্রয় দিয়েছিলেন তাঁদের রাজনৈতিক সংকটে এটাই প্রাপ্য! ক্ষমতায় থাকা আর ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার মধ্যিখানের এই অসীম শূন্যতার লেখচিত্রের ওঠাপড়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহজ নিয়মেই ঘটে। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা, এনসিপি, দিল্লিতে আপ... আর পাঁচটা দলের মতোই তৃণমূলের সেই জীবন বৃত্তও সম্পূর্ণ হওয়ার পথে। দলটার বয়স ২৮ বছর পাঁচ মাস সাতদিন। কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এসে মমতা তৃণমূল তৈরি করেছিলেন ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি। ৩ জুন, ২০২৬ ভেঙে গেল তৃণমূলের সেই স্বচ্ছ নিটোল লুকিং গ্লাসটা। তীব্র বাম বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উঠে এসে দেড় দশক শাসন ক্ষমতায় থাকার পর মাত্র একমাসে লন্ডভন্ড হয়ে গেল দিদির জোড়াফুলের বাগান। কয়েক হাজার বিশ্ববাংলার ‘ব’ লোগো।
মমতার সাজানো রাজ্যপাট উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে তছনছ হয়ে যাওয়ার মুখে। বিদ্রোহীরা বলছেন মমতার পরামর্শ নিয়ে চলবেন, কিন্তু অভিষেক নৈব নৈব চ। আসলে দলের মূল সংগঠন থেকে বেরিয়ে এসে ঋতব্রতরা তৃণমূলের পরিষদীয় দলকে আলাদা একটা বৃত্তে বেঁধে ফেলতে চাইছেন, সেই বৃত্তে এন্ট্রি নেই অভিষেকের। মহারাষ্ট্রে একনাথ সিন্ধেকে সামনে রেখে এভাবেই বালাসাহেব থ্যাকারের শিবসেনাকে আড়াআড়ি ভেঙে দিয়েছিল বিজেপি। সেই ইতিহাস খুব পুরানো নয়।
ভোটে হারা জেতা নির্ভর করে সাধারণ মানুষের সমর্থনের উপর। কিন্তু দু’মাস আগেও কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারত না তৃণমূলের পরিষদীয় দল জুন মাসের শুরুতে ভেঙে যাবে ঋতব্রত-সন্দীপনদের মতো মাঝারি মাপের নেতার হাতে। চুরি বড়ো অপরাধ না, বিশ্বাসঘাতকতা-গদ্দারি? ধন্য মিরজাফর! এই ছাব্বিশের বদলের বাংলায় তুমি জিতে গেলে সই জাল কাণ্ড এবং অভিষেকের উপর দলের সিংহভাগ এমএলএ’র ক্ষোভের সৌজন্যে। অপেক্ষায় বিদ্রোহী এমপিরাও। রাজনীতি নিজের মতো এগবে। আজকের রাজা আগামী দিনে ফকির হবে। নতুন রাজা আসবে আবার। কিন্তু নিষ্পত্তি হবে না একটা মাত্র প্রশ্নের, চুরি বড়ো অপরাধ না গদ্দারি?