হিন্দুদের বিশেষ করে শক্তিসাধকদের নিত্য-আবৃত্ত অসংখ্য শাস্ত্রগ্রন্থের মধ্যে ‘দেবীমাহাত্ম্য’ অন্যতম। গীতা যেরূপ মহাভারতের একটি অংশ ‘দেবীমাহাত্ম্য’ও সেরূপ মহর্ষি বেদব্যাস রচিত মার্কণ্ডেয় পুরাণের একটি অংশ। মার্কণ্ডেয় পুরাণের ৮১ থেকে ৯৩—এই তেরটি অধ্যায় নিয়ে ‘দেবীমাহাত্ম্য’। এই প্রসিদ্ধ গ্রন্থখানিতে দেবী মহামায়ার লীলামাহাত্ম্য বর্ণিত ও কীর্তিত হয়েছে। ‘দেবীমাহাত্ম্য’ নামেই তার ইঙ্গিত রয়েছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘দেবীমাহাত্ম্য’ অংশের মন্ত্রসংখ্যা সাতশত। তাই গ্রন্থখানিকে ‘সপ্তশতী’ও বলা হয়। তবে ‘চণ্ডী’-ই গ্রন্থের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং সুপ্রচলিত নাম। ‘চণ্ডী’ শক্তিসাধকদের অত্যন্ত প্রিয় একখানি শাস্ত্রগ্রন্থ। ভগবানকে মাতৃভাবে আরাধনা হিন্দুধর্মের একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। এই আরাধনার বিরামহীন ধারা চলে আসছে বৈদিক যুগ থেকে। এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বেদ এবং তন্ত্র উভয়কে নিয়েই ভারতীয় সংস্কৃতি। পরব্রহ্মের বৈদিকী আরাধনার সঙ্গে পরাশক্তির তান্ত্রিকী আরাধনার ধারাও সমান্তরালভাবে বয়ে আসছে পুণ্যভূমি এই ভারতবর্ষে। শক্তি-সাধনার অপ্রতিহত এই ধারা বৈদিকযুগ থেকে প্রবাহিত হয়ে বিবর্তিত আকারে ক্রমে পৌরাণিক এবং তৎপরবর্তী যুগে আরও বিস্তার লাভ করে এবং ব্যাপকভাবে সাধনার অবলম্বনরূপে অগণিত মানুষকে পরাশক্তি মহামায়ার আরাধনায় উদ্বুদ্ধ করে এবং আজও করে আসছে। ভগবানকে মাতৃভাবে আরাধনা করে বহু সাধক যে এই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছেন ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। স্থান, কাল ও পাত্রভেদে সাধকের সাধনার বৈচিত্র্যে মহাশক্তি প্রকটিতা হয়েছেন বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রূপে। বৈদিক যুগের ঋষিকন্যা ব্রহ্মবিদুষী বাক্ থেকে আরম্ভ করে পরবর্তী যুগসমূহের বিভিন্ন শক্তিসাধকদের জীবন-ইতিহাসই এই ধারার বিরামহীনতা এবং গতিশীলতা প্রমাণ করে। সাধক রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, বামাক্ষ্যাপা, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ মাতৃসাধকদের জীবনে মাতৃশক্তির সঙ্গে সাধকের একাত্মতা এবং শক্তিরূপিণী মহামায়ার চৈতন্যময় ও আনন্দময় সত্তায় সাধকের আত্মলয়ের বিস্ময়কর সাধন-ইতিহাস আজও শক্তিসাধককে সমানভাবে আকর্ষণ করে, অনুপ্রাণিত করে সাধন-পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।


