Bartaman Logo
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিকট নিদান

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকরা ভোট দেন। তৈরি হয় নির্বাচিত সরকার। কল্যাণকামী রাষ্ট্রের আশু লক্ষ্য থাকে সমাজের‌ বৈষম্য কমানো

বিকট নিদান
  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকরা ভোট দেন। তৈরি হয় নির্বাচিত সরকার। কল্যাণকামী রাষ্ট্রের আশু লক্ষ্য থাকে সমাজের‌ বৈষম্য কমানো। চূড়ান্ত লক্ষ্যটি অবশ্যই বৈষম্য থেকে পূর্ণমুক্তি। তবেই প্রকৃত উন্নয়নের সড়কে প্রথম পদক্ষেপ ঘটে। বাংলাসহ সমগ্র ভারত স্বাধীনতালাভের আট দশকেও গরিবি পুরো দূর করতে পারেনি। ‘মধ্য আয়ের’ দেশের সারিতেও বসার সৌভাগ্য হয়নি আমাদের। ‘উন্নত’ পৃথিবীর অংশ হিসাবে উত্তরণ, গেরুয়া অভিধানে যা ‘অমৃতকাল’—এখনও বহু যোজন দূরে। আমাদের বর্তমান পরিচয় আমরা ‘নিম্ন-মধ্য আয়ের’ দেশের নাগরিক। মনে রাখতে হবে, আদানি, আম্বানি প্রভৃতির বিপুল বিশাল আয়পত্তর যোগ করেই এই রুগ্‌ণ জিডিপি। এসব বাদ দিলে ভারতবাসীর আর্থিক হল, নিঃসন্দেহে কহতব্য নয়। অর্থাৎ ভয়াবহ বৈষম্য হ্রাসের লড়াইটা আরও ভয়াবহ। তাই দারিদ্রসীমার নীচের মানুষের হাতে কিছু নগদ জোগানের সংস্থান করাই দস্তুর। রাষ্ট্রকে এই দায়িত্ব লাগাতার পালনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ প্রধান অর্থনীতিবিদরা। সেই সূত্রে ভারতসহ নানা‌ দেশে নাগরিকদের একাংশকে কিছু ভাতা প্রদানের রীতি চালু আছে। এমন স্বাভাবিক সম্পর্কটিও কি এখন নতুন ব্যাখ্যা দাবি করছে? ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিন। ওই উপলক্ষ্যে সেদিন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের উপভোক্তা, এমনকি কোভিড টিকাপ্রাপ্ত নাগরিকদেরও ‘আশীর্বাদ কি দিয়া’ জ্বালাতে হবে। আরও বিস্ময়কর, পশ্চিমবঙ্গে এক কোটির বেশি পরিবারকে যুক্ত করার পাশাপাশি ৮০ হাজার স্কুলের পড়ুয়া এবং তাঁদের অভিভাবকদেরও সন্ধ্যার কর্মসূচিতে টেনে আনার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেনিফিশিয়ারির তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৃতজ্ঞতা’ জানাতে হলে ‘জনকল্যাণ’ আর ‘অনুগ্রহ’ তফাত হারায়। এই টাকা তো শাসকের ব্যক্তিগত নয়। উৎস হল কর বা রাজকোশ। শাসকের ব্যক্তিগত দয়ারূপে মেনে নিতে বলা হচ্ছে না কি? এটি যুগপৎ রাজনৈতিক প্রচারের বাড়াবাড়ি এবং রাষ্ট্র ও দলের সীমারেখা মুছে ফেলার বিপজ্জনক প্রবণতা। করোনার সময়ে থালা-বাসন বাজানোর কদর্য স্মৃতি এখনও মোছেনি। তখন মহামারির বিরুদ্ধে প্রতীকী লড়াইয়ের নিদান ছিল ‘শব্দব্রহ্ম’, এবার জন্মদিনের আবহে প্রতীকী আনুগত্যের নিদান ‘প্রদীপ-প্রজ্বলন’। নিদানের ভাষাই পালটেছে কেবল, প্রশ্নটি রয়ে গিয়েছে অবিকল: রাষ্ট্র কি নাগরিকের জন্য, না নাগরিক শাসকের জন্য?

Advertisement

সবচেয়ে আপত্তিকর জায়গাটি অবশ্য শিক্ষাঙ্গন। স্কুলপড়ুয়াদের সরকারি কর্মসূচির অংশ করে তোলা, তার সঙ্গে অভিভাবকদেরও যুক্ত করা—এখানে ‘সেবা’ আর রাজনৈতিক প্রচারের মাঝের দেওয়ালটি কোথায়? কোমলমতি খুদেদের সামনে নাগরিকত্বের শিক্ষা হওয়ার কথা: অধিকার, দায়িত্ব, যুক্তি ও প্রশ্ন করার স্পর্ধা। সেখানে রাষ্ট্রীয় পরিসরেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক বন্দনার অনুশীলন শুরু হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঠিক কী শেখানো হচ্ছে? ‘বাচ্চো কে স্বপ্নো কা ভারত’-এর নামে আঁকা, কুইজ, বক্তৃতা, বিতর্কের আয়োজন শুনতে যতই আকর্ষক হোক, তার সামগ্রিক আবহ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্মদিন এবং সাফল্য উদ্‌যাপনের সঙ্গে জুড়ে গেলে বিরূপ প্রশ্ন উঠবেই। দলীয় কর্মসূচি দল পালন করুক। সে তাদের অধিকার। কিন্তু প্রশাসন-যন্ত্র, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাঙ্গনকে সেই রাজনৈতিক উদ্‌যাপনের বাহন করে তোলার প্রবণতা গণতন্ত্রে মোটেই অভিপ্রেত নয়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ—দল নির্বিশেষে স্থানীয় বিধায়কদের সাহায্য করার আহ্বান। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতভেদ সরিয়ে সবাইকেই যেন এক প্রদীপের আলোয় প্রোজ্জ্বল হতে হবে! গণতন্ত্রে মতের বৈচিত্রই আলো, একরঙা আনুগত্য নয়।
আর এই প্রদীপের তলায় যে অন্ধকারটি প্রকট, তা হল অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। এক কোটি পরিবারকে প্রদীপ দিতে অন্তত ২ কোটি টাকা খরচ হবে—অর্থাঙ্কটি বিপুল সরকারি ব্যয়ের পাশে নগণ্য হলেও প্রতীকের বিচারে সাক্ষাৎ সর্বনাশা। মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানুষের আয়—এই বাস্তব প্রশ্নগুলির উত্তর না দিয়ে যদি শাসকের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে প্রদীপ, রঙ্গোলি, সেবা-গাথা, সংকল্প-যাত্রা আর উৎসবের পর উৎসব সাজানো হয়, তবে সেটি জনসেবা নয়, জনমোহনের মঞ্চসজ্জা হয়ে ওঠে। মানুষের ঘরে আলো জ্বালানোর রাজনীতি তখনই অর্থবহ, যখন সেই ঘরে রান্নার জ্বালানি, সন্তানের শিক্ষার নিশ্চয়তা, চিকিৎসার সামর্থ্য এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচার সুযোগ নিশ্চিত হয়। বেনিফিশিয়ারির হাতে প্রদীপ ধরিয়ে তাঁকে ‘কৃতজ্ঞ’ বানানো সহজ, কিন্তু সেই নাগরিককে এমন জায়গায় পৌঁছে দেওয়া কঠিন, যেখানে সে কারও আশীর্বাদের মুখাপেক্ষী নয়। রাষ্ট্রের কাজ সেই কঠিন কাজটিই করা। জন্মদিনে প্রদীপ জ্বলুক—যাঁরা স্বেচ্ছায় জ্বালাতে চান, জ্বালান। কিন্তু সরকারি সুবিধার সঙ্গে কৃতজ্ঞতার প্রদীপের সলতের বন্ধন নিয়ে আপত্তি থাকবেই। কারণ গণতন্ত্রে নাগরিক কোনো অনুগৃহীত প্রজা নন, আর সরকারি ভাতা কোনো রাজদরবারের দান নয়। সেই মৌলিক সত্যটি ভুলিয়ে দিতে যত প্রদীপই জ্বালানো হোক, তার আলোয় নিদানের বিকটতাই আরও স্পষ্ট হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ