Bartaman Logo
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাষ্ট্রসংঘের দ্বিমুখী নীতি

একটি মানচিত্র। কয়েকটি রেখা। আর সেই রেখাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন কূটনৈতিক অস্বস্তি

রাষ্ট্রসংঘের দ্বিমুখী নীতি
  • ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

একটি মানচিত্র। কয়েকটি রেখা। আর সেই রেখাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন কূটনৈতিক অস্বস্তি। বিশ্বের মানচিত্রে সীমান্তের একটি রেখা কখনো নিছক একটি রেখা নয়। তার পিছনে থাকে সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস, যুদ্ধ এবং রাষ্ট্রের দাবি। আর এবার সেই রেখাতেই প্রশ্ন তুলেছে দিল্লি। রাষ্ট্রসংঘের সদ্য প্রকাশিত নতুন বিশ্ব মানচিত্রে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ এবং আকসাই চীনকে এমন ভাবে দেখানো হয়েছে, যা ভারতের সরকারি অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিষয়টি সামনে আসতেই উঠছে একের পর এক প্রশ্ন—রাষ্ট্রসংঘের মানচিত্রে কেন ভারতের ভূখণ্ডকে পৃথক বা বিতর্কিত অঞ্চল হিসাবে দেখানো হল? এটি কি নিছক কার্টোগ্রাফিক পদ্ধতি, নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনো কূটনৈতিক বার্তা? রাষ্ট্রসংঘের প্রকাশিত ওই মানচিত্রটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১ জুলাই ২০২৬। সেখানে অরুণাচল প্রদেশের ক্ষেত্রে ভারতীয় সীমান্তের বদলে পৃথক একটি রেখা ব্যবহার করা হয়েছে। মানচিত্রে অরুণাচলকে এমন একটি অঞ্চল হিসাবে দেখানো হয়েছে, যার একদিকে অসম ও অন্যদিকে চীনের সীমান্ত রয়েছে। আরও চমক অপেক্ষা করছিল পশ্চিমে। একইভাবে আকসাই চীনকেও পৃথক অঞ্চল হিসাবে দেখানো হয়েছে— পশ্চিম দিকে ভারতের সঙ্গে এবং পূর্ব দিকে চীনের সঙ্গে সীমান্ত দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ভারতের সরকারি মানচিত্রে যে ভূখণ্ড ভারতের অংশ, রাষ্ট্রসংঘের এই উপস্থাপনায় সেটি যেন একটি আলাদা প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Advertisement

সম্প্রতি রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘ম্যাপ সংশোধন বা কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ নামে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। প্রস্তাবটির লক্ষ্য ছিল বিশ্বের মানচিত্রে থাকা ভৌগোলিক বৈষম্য দূর করা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তন ও অবস্থানকে আরও যথাযথভাবে তুলে ধরা। আফ্রিকান ইউনিয়নের সমর্থনে আনা এই প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয়। ৪ সেপ্টেম্বর ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। ভারতও ছিল সেই তালিকায়। এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড়ো ধাঁধা। ভারত প্রস্তাবটিকে সমর্থন করল। অথচ, সেই একইসময় রাষ্ট্রসংঘের মানচিত্রে ভারতের ভূখণ্ডের উপস্থাপনাকে ঘিরে আপত্তি তুলছে নয়াদিল্লি। তাহলে কি ভারত নিজের অবস্থানের সঙ্গে বিরোধী এমন কোনো প্রস্তাবকে সমর্থন করল? ভারতের উত্তর—একেবারেই নয়। নয়াদিল্লির যুক্তি পরিষ্কার। কোনো একটি প্রস্তাবকে সমর্থন করার অর্থ রাষ্ট্রসংঘের প্রকাশিত প্রতিটি মানচিত্র বা সীমান্ত-চিত্রকে মেনে নেওয়া নয়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের অবস্থান, ভারতের ভূখণ্ডকে দেখাতে হবে ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ীই। জম্মু-কাশ্মীর, লাদাখ কিংবা দেশের অন্য কোনো অংশকে ভুল, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হলে তা মেনে নেবে না ভারত। আর এখানেই সামনে চলে আসে দুই ভূখণ্ড—অরুণাচল প্রদেশ এবং আকসাই চীন। অরুণাচল প্রদেশকে দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে চীন। বেজিং এই অঞ্চলকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বলে অভিহিত করে। অন্যদিকে, আকসাই চীন বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ভারত সেটিকে লাদাখের অংশ বলে দাবি করে। ফলে দুই অঞ্চলই ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নতুন রাষ্ট্রসংঘের মানচিত্রে জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে আলাদা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ডটেড লাইন দিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নিয়ন্ত্রণরেখা দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে, জম্মু-কাশ্মীরের চূড়ান্ত অবস্থান দুই দেশের মধ্যে এখনও নির্ধারিত হয়নি। এই কারণেই রাষ্ট্রসংঘের নতুন মানচিত্র নিয়ে বিতর্কটি নিছক মানচিত্রের বিতর্ক হয়ে থাকছে না। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে যাচ্ছে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মানচিত্র কখনো নিরপেক্ষ কাগজের টুকরো নয়। একটি সীমারেখা কীভাবে আঁকা হচ্ছে, কোনো অঞ্চলকে কী নামে চিহ্নিত করা হচ্ছে কিংবা কোথাও একটি ডটেড লাইন ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই কূটনৈতিক তাৎপর্য থাকতে পারে। আর সেই কারণেই অরুণাচল প্রদেশ এবং আকসাই চীনের উপস্থাপনাকে ঘিরে ভারতের আপত্তি এতটা গুরুত্বপূর্ণ। 
তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী? রাষ্ট্রসংঘ কি নতুন মানচিত্রের এই উপস্থাপনা সংশোধন করবে? নাকি বিষয়টি ব্যাখ্যা করে জানানো হবে, কেন অরুণাচল প্রদেশ ও আকসাই চীনের ক্ষেত্রে পৃথক সীমারেখা ব্যবহার করা হয়েছে? আর যদি সংশোধন না হয়, তাহলে ভারতের কূটনৈতিক আপত্তি কতদূর গড়াবে? প্রশ্নের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। কারণ এখানে শুধু ভারত ও চীনের দ্বন্দ্ব নেই। রয়েছে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে একটি দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড কীভাবে উপস্থাপিত হবে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নও। একটি মানচিত্রে কয়েকটি রেখা হয়তো দেখতে খুব সামান্য। কিন্তু সেই রেখাই যদি কোনো দেশের সীমান্ত, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে স্পর্শ করে, তখন তার গুরুত্ব আর সামান্য থাকে না। অরুণাচল প্রদেশ থেকে আকসাই চীন, জম্মু-কাশ্মীর থেকে লাদাখ—প্রতিটি রেখার পিছনে রয়েছে আলাদা ইতিহাস, আলাদা দাবি এবং আলাদা কূটনৈতিক হিসাব। আর সেই কারণেই রাষ্ট্রসংঘের নতুন মানচিত্র এখন হয়ে উঠেছে নতুন এক কূটনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সেই রেখার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের সার্বভৌমত্বের দাবি। এখন দেখার—মানচিত্র বদলায়, নাকি বদলে যায় বিতর্কের মাত্রা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ