Bartaman Logo
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ব্রিকস এবং বিশ্ব: কেন গুরুত্বপূর্ণ?

শুধুমাত্র দুই দোভাষীকে সঙ্গে নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং বেজিং-এর সরকারি অতিথিশালা ঝংনানহাই প্রাঙ্গণে হাঁটতে হাঁটতে মৃদু স্বরে কথা বলছিলেন

ব্রিকস এবং বিশ্ব: কেন গুরুত্বপূর্ণ?
  • ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: শুধুমাত্র দুই দোভাষীকে সঙ্গে নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং বেজিং-এর সরকারি অতিথিশালা ঝংনানহাই প্রাঙ্গণে হাঁটতে হাঁটতে মৃদু স্বরে কথা বলছিলেন। ২০১৪ সালের মে মাসে পুতিনের চীন সফরে দুই রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে যে দ্বিপাক্ষিক ও প্রতিনিধিস্তরের বৈঠক হয়েছে, তার বাইরে এই ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ছিল নিছকই এক গল্পগুজব। যদিও এসবই কূটনৈতিক প্রোটোকলেরই অন্তর্গত থাকে। যাকে বলা হয় ইনফর্মাল আলোচনা। অনেক দূরে ছিল তাবৎ মিডিয়ার ক্যামেরা। মনে করা হয়েছিল দূর থেকে নিছক ছ঩বি ও ভিডিয়ো পাওয়া যাবে। তাঁদের সেই আড্ডার প্রতিপাদ্য কী সেটা তো আর জানা সম্ভব নয়। কিন্তু রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ভিজিটিআরকের বুম মাইক্রোফোনে সেই আলাপচারিতার বিষয়বস্তু ক্ষীণ ভাবে ধরা পড়ে যায়। এবং দুই মহাশক্তিশালী রাষ্ট্রের দুই শক্তিধর রাষ্ট্রনায়কের আলোচ্য যা ছিল, সেটি জেনে গোটা বিশ্ব কার্যত হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সেমিকন্ডাকটর, 

Advertisement

রেয়ার আর্থ, লিথিয়াম ব্যাটারি, সুপার এআই এবং এশিয়া-প্যাসিফিক সমুদ্রাঞ্চল ইত্যাদি যা নিয়ে সুপারপাওয়ার দেশগুলির মধ্যে সবথেকে বেশি প্রতিযোগিতা ও শত্রুতা চলছে বর্তমান সময়ে, সেসব মোটেই আলোচনার প্রতিপাদ্য ছিল না। জিনপিং এবং পুতিন আলোচনা করছিলেন মানুষের আয়ুবৃদ্ধির গবেষণা নিয়ে। অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে কীভাবে 
মানুষের আয়ু ১২০ বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে নেওয়া যায় এবং সুস্থ শরীরে নবযৌবনও লাভ করা যায়, সেটাই ছিল তাঁদের দুজনের মূল চর্চা। দুজনেরই বয়স সত্তর পেরিয়েছে। বিশ্বজুড়ে সর্বদাই আলোচনা চলে যে, পৃথিবীর প্রায় সব দেশের রাষ্ট্রনায়কই অবিরত চেষ্টা করছেন কীভাবে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা যায়। আর সেজন্য দরকার বৃদ্ধ না হওয়া। ওই একটি আলোচনাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, চীন ও রাশিয়ার দুই প্রেসিডেন্ট তাঁদের দেশে এই আয়ুবৃদ্ধির গবেষণাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন আকুলভাবে নিজেদের বয়স ধরে রেখে আরও ৫০ বছর বেঁচে থাকার বাসনা বাস্তবায়িত করতে। সেই মনোবাসনা‌ই ধরা পড়ে গিয়েছে তাঁদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়। দুই দেশেই সেই গবেষণায় সবথেকে বেশি অর্থবরাদ্দ হয়েছে। 
একদিকে যেমন এই লক্ষ্য কবজা করতে চাইছে চীন, রাশিয়া, আমেরিকার মতো সুপারপাওয়ার দেশগুলি, পাশাপাশি গোটা বিশ্বকে নিজেদের মুঠোয় নিয়ে আসার গোপন বাসনাও সকলের মধ্যে রয়েছে। অতএব আয়ুবৃদ্ধির মোক্ষম ফরমুলা এবং বিশ্বশাসনের ক্ষমতার মডেল, এই দু‌ইই চাই ঩বিশ্বনিয়ন্তাদের। করোনা পরবর্তী বিশ্ব ওই লক্ষ্যপূরণের সমীকরণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ এবং আমেরিকার ইরান আগ্রাসন, সেই সমীকরণকে সম্পূর্ণ নতুন দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমেরিকা, ইওরোপ এবং এশিয়া। তিন মহাদেশের কার ভাগ্যে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ভাগ্যনিয়ন্তার তকমা পাওয়া অপেক্ষা করছে? 
আজ থেকে দিল্লিতে তিনদিনের ব্রিকস সম্মেলন হতে চলেছে। তাই এই পটভূমিতেই বিচার করা দরকার যে ব্রিকস রাষ্ট্রগোষ্ঠীর গুরুত্ব কী? ব্রিকস কাকে বলে? ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। এই পাঁচ দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্রিকস। এই পঞ্চরাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বশক্তির নিরিখে চীন এবং রাশিয়া অনেক এগিয়ে বাকিদের তুলনায়। কিন্তু ব্রাজিল, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা গোটা বিশ্বেই বিবেচিত হচ্ছে সবথেকে দ্রুত বৃদ্ধিশীল অর্থনীতি হিসাবে। এই তিন দেশের অর্থনীতি, বাজার এবং আধুনিক বিশ্বে স্থান করে নেওয়ার ক্ষমতা সর্বাধিক। সংগত প্রশ্ন হল, জাপান নেই কেন? প্রধান কারণ, জাপান অনেক বেশি করে পশ্চিমি অক্ষে যুক্ত। বিশ্বের সর্ববৃহৎ উন্নত অর্থনীতির যে জোট, সেই জি সেভেনে একমাত্র এশিয়ার প্রতিনিধি জাপান। ব্রিকসের মন্ত্র হল, গ্লোবাল সাউথ। পৃথিবীর দক্ষিণই আগামীদিনে হবে চালিকাশক্তি, এই ধ্রুবপদ গ্রহণ করেছে এই ব্রিকস। আর সেখানে পশ্চিমি শক্তিধরদের যে গ্লোবাল নর্থ স্লোগান, তার একনিষ্ঠ সমর্থক জাপান। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে একই গোষ্ঠীতে জাপান থাকবে না। কারণ, পূর্ব চীন সাগরের সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জের অধিকার নিয়ে চীন ও জাপানের প্রবল দ্বন্দ্ব। আর পাশাপাশি তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের অতি আগ্রাসনে প্রবল অস্বস্তিতে জাপান। পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শেষ পর্বে যখন জাপান আত্মসমর্পণ করছে মিত্রশক্তির কাছে, সেই সময় থেকে আজও কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে মস্কোর সঙ্গে টোকিওর তীব্র মতান্তর ও বিরোধ। আজও মস্কো এবং টোকিওর কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি হয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধের পরও আমেরিকার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জাপান রাশিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধজ্ঞা জারি করেছে। সুতরাং জাপান এশিয়ার হলেও, সে আদতে পাশ্চাত্যপন্থী এবং পশ্চিমবন্ধু। ভারত নিয়ে জাপানের কিন্তু কোনো সমস্যা নেই। আর সেই কারণেই চীনকে প্রতিহত করতে আমেরিকা যে কোয়াড রাষ্ট্রগোষ্ঠী গঠন করেছিল, সেই জোটে জাপান রয়েছে আমেরিকা, ভারত, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। 
আমেরিকা যে জোটকে সবথেকে বেশি অপছন্দ করে সেই ব্রিকসে চীনের সঙ্গে ভারত রয়েছে, আবার দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসন  ঠেকাতে আমেরিকার তৈরি কোয়াডেও ভারত আছে। ব্রিকস আমেরিকার একচ্ছত্র বাণিজ্য ও অর্থনীতির বিকল্প হয়ে উঠতে চাইছে। অথচ ভারত আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক মোটেই নষ্ট করতে চায় না। বন্ধুত্বও সমানভাবে রেখে চলেছে। একইভাবে আমেরিকা শত হুমকি দিলেও রাশিয়ার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই ভারত ছিন্ন করতে নারাজ। বরং আরও বেশি করে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সমঝোতা হচ্ছে দিল্লি ও মস্কোর মধ্যে। কেন? কারণ, ১৮৪৮ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোন মোক্ষম কথা বলে গিয়েছিলেন, বিদেশনীতির কোনো স্থায়ী বন্ধু হয় না, বিদেশনীতির কোনো স্থায়ী শত্রু হয় না। বিদেশনীতিতে একমাত্র স্থায়ী হল দেশের স্বার্থ।
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আজকের নতুন বিশ্বে প্রতিটি দেশের কাছে প্রধান চালিকাশক্তি হল দেশের স্বার্থ। কোনো শিবির বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। অর্থাৎ আমেরিকার শিবিরে বহু দেশ, রাশিয়ার শিবিরে একঝাঁক দেশ, চীনের অধীনে সুযোগ সুবিধা পাওয়া রাষ্ট্রগোষ্ঠী এরকম কোনো বিভাজন আর বিশ্ব রাজনীতি ও কূটনীতিতে চলে না। জওহরলাল নেহরুর নির্জোট নীতিও বস্তুত পরিত্যাগ করেছে ভারত। কারণ, নির্জোটের মূল মন্ত্র ছিল, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন, কোনো শিবিরেই না থাকা। সম্পূর্ণ পৃথক এক স্বাধীন জোট। কিন্তু এখন সেরকম মনে করা হয় না। যখন যে রাষ্ট্র যেখান থেকে সুবিধা পেয়ে নিজের দেশের উন্নতি করতে পারবে, সেই দেশের সঙ্গেই হাত মেলাবে। 
ইওরোপকে ক্রমাগত অপমান করে, আর্থিকভাবে তাদের দেউলিয়া দশা, আমেরিকার উপর নির্ভরশীলতা ইত্যাদি কথা প্রকাশ্যে বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইওরোপে এখন অত্যন্ত সমালোচিত। সব দেশের উপর শুল্ক চাপাচ্ছেন তিনি। অসম্মান করছেন। এই দম্ভ ও যথেচ্ছাচারের কারণ, ট্রাম্প জানেন ডলারের শক্তি সর্বোচ্চ। সামরিক শক্তিতেও সর্বোচ্চ। প্রযুক্তিতে আমেরিকা প্রথম। বিশ্বজুড়ে আমেরিকার সোশ্যাল মিডিয়াই তাবৎ মানুষ ব্যবহার করে আসক্ত। অতএব আমেরিকা সর্বশক্তিমান। 
ঠিক এই অহং এবং আত্মবিশ্বাসেই আঘাত হেনেছে ব্রিকস। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ বসবাস করে ব্রিকসের পঞ্চরাষ্ট্রে। বিশ্বের যে অর্থশক্তি তথা জিডিপি, তার এক তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে এই ব্রিকস গোষ্ঠীর পাঁচ দেশ। আইএমএফ কিংবা বিশ্বব্যাংক আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ। ব্রিকস তার 
পালটা নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গঠন করেছে। এবং ডলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। ব্রিকসের রাষ্ট্রপ্রধানদের লক্ষ্যই হল বিশ্ববাণিজ্যে তারা চেষ্টা করবে বেশি করে নিজেদের স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন করতে। অর্থাৎ টাকা, রুবল, ইউয়ান। 
জ্বালানি বাণিজ্যে দিরহাম। সোজা কথায় যত কম ডলার দিয়ে লেনদেন হবে, ততই ডলারের চাহিদা কমবে। আর যতই চাহিদা কমবে, ততই ডলার দুর্বল হবে। যা আমেরিকার কাছে দুঃস্বপ্নের শামিল। ব্রিকসে কেউ বিগ ব্রাদার নয়। সকলেই সমান। যে কোনো সিদ্ধান্তে ভোটিং ক্ষমতা সকলের আছে। ব্রিকস কার্যত আমেরিকার একক বিশ্বশাসনের আগ্রাসনেই আঘাত করতে উদ্যত। তাই ব্রিকসের উপর খড়্গহস্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প। 
আমেরিকার একক শক্তির ধারেকাছে কেউ নেই। একথা সত্য। তাদের জিডিপি ৩১ লক্ষ কোটি ডলার। অনেক পিছনে চীন, ১৭ লক্ষ কোটি ডলার। জার্মানি, জাপান, ভারত অনেক পিছনে। এখনও কেউ ৫ লক্ষ কোটি ডলারেই পৌঁছয়নি। কিন্তু ব্রিকস একজোট হয়ে অর্থ, প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্যে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইছে। আমেরিকা সেটাই আটকাতে মরিয়া। ইওরোপকে আর আমেরিকার ভয় নেই নতুন ক্ষমতার উৎসের সূর্যোদয় হতে চলেছে এশিয়ায়। সেই লক্ষ্যপূরণে সবথেকে শক্তিশালী অক্ষশক্তি হল ব্রিকস। ভবিষ্যৎ বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে! 
ভারতের জন্য লক্ষ কোটি টাকার প্রশ্ন হল, চীনকে কি বিশ্বাস করা যায়? স্বপ্নের মতো মনে হলেও, যদি চীন-ভারত-রাশিয়া একজোট হতে পারে, তাহলে বিশ্বে ক্ষমতার নতুন সূর্য উঠবে এশিয়ায়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ