Bartaman Logo
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

জিডিপি বাড়লে আম আদমির কী

দেশের জিডিপি বেড়েছে ৭.৮ শতাংশ। সুখবর নিঃসন্দেহে। কিন্তু এই খুশির খবর শুনেও সাধারণ মানুষ হাসতে গিয়ে একটু থমকে যায়

জিডিপি বাড়লে আম আদমির কী
  • ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশের জিডিপি বেড়েছে ৭.৮ শতাংশ। সুখবর নিঃসন্দেহে। কিন্তু এই খুশির খবর শুনেও সাধারণ মানুষ হাসতে গিয়ে একটু থমকে যায়। তাঁর বেতন কি ৭.৮ শতাংশ বেড়েছে? নাকি মাসের শেষে সঞ্চয়? ১০০ টাকা নিয়ে বাজারে গেলে আগের চেয়ে বেশি জিনিস পাওয়া যাচ্ছে? নাকি উলটোটা! গত মাসে কেনা ৯০ টাকার ওষুধটার দাম কি এবার ৭.৮ শতাংশ সস্তা হবে? নাকি তা ১২০ টাকায় পৌঁছে যাবে! এমনই শতেক ভাবনা‌ ভিড় করে আসে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মনন ও মগজে। বাড়িভাড়া, ছেলেমেয়ের স্কুলের ফি সব নিয়ে বাতাসে অঙ্ক কষা চলে বারবার। তবে সঠিক উত্তর কি মেলে তাও? তাহলে তো সহজে জেনে যাওয়া যেত, জিডিপির এই বৃদ্ধির সুফল আম আদমির জীবন কতটা বদলে দিল!

Advertisement

সরকার অবশ্য চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ৭.৮ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধিকে সাফল্য হিসাবে তুলে ধরছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ। তাঁদের মতে, নমিনাল জিডিপি ১০.৩ শতাংশ বাড়লেও মূল্যবৃদ্ধির হিসাবে গরমিলের কারণে প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধি ৭.৮ শতাংশ দেখানো হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির হিসাবের গরমিলের কারণে প্রকৃত বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ দেখানো হয়েছে। এই বিতর্কের মধ্যেই মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়ার মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং প্রাক্তন যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান সরাসরি ৭.৮ শতাংশের অঙ্ককে মিথ্যা বলেননি। বরং বলেছেন, ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর জন্য এই বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। বৃদ্ধির হার আরও অনেকটা বাড়াতে হবে। শুধু কোনো একটি বা দু’টি বছরে নয়, চাই নিরবচ্ছিন্ন উচ্চ বৃদ্ধি। লক্ষ্য হওয়া উচিত দুই অঙ্কের বৃদ্ধির হার। কথাটা আসলে সরকারের সাফল্যের দাবিকেই চ্যালেঞ্জ করে, তবে অন্য মাপকাঠিতে। ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি যদি সত্যিও হয়, তাহলেও এটা নিয়ে আত্মতুষ্টির জায়গা নেই। কারণ, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য যদি সত্যিই ‘বিকশিত ভারত’ হয়, তবে মাঝেমধ্যে ভালো বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দেখিয়ে সেই লক্ষ্যপূরণের দাবি করা যায় না। এবং প্রশ্নও থেকে যায় যে, এই বৃদ্ধির সুফল মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছল? বেতন যদি বাড়ে ৫ শতাংশ, অথচ সংসারের খরচ তার দ্বিগুণ, তাহলে সরকারি পরিসংখ্যান যতই সুন্দর হোক, মধ্যবিত্তের কাছে সেই অর্থনীতি অসার, অপছন্দের। এখানেই সরকারি প্রচারের সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতির ফারাকটি স্পষ্ট হয়ে যায়।
মন্টেক সিংয়ের বক্তব্যের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ অবশ্যই ‘বিকশিত ভারত’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত দু’বছর ধরে এই স্লোগানকেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বপ্ন বহলে সগর্বে ঘোষণা করেছেন। এবং একের পর এক সময়সীমা পেরিয়ে স্থির করা হয়েছে নতুন লক্ষ্য—২০৪৭!  স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তির মধ্যে ভারতকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করা হবে, প্রচারে এ স্বপ্ন যত উজ্জ্বল, তার বাস্তবায়নের পথ ততটাই কঠিন। বিরোধীদের কটাক্ষ, একের পর এক সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর মোদিজি স্বপ্নের মেয়াদ ২০৪৭-এর দিকে ঠেলে দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও কি সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব? অর্থনীতিবিদ সুরজিৎ ভাল্লা সাফ বলেছেন যে, তিনি এখনও মনে করেন ২০৪৭-এর লক্ষ্যপূরণ সম্ভব নয়। মন্টেকের নিজের মূল্যায়ন আরও স্পষ্ট, ‘বিকশিত ভারত-এর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যপূরণে আমরা সঠিক পথে এগচ্ছি না!’ এর সঙ্গে রয়েছে আরও বড়ো প্রশ্ন—উন্নয়নের সুফল কার কাছে যাচ্ছে? শুধু জিডিপি বাড়লেই তো ‘বিকশিত ভারত’ হবে না। মন্টেক তাই সতর্ক করেছেন সম্পদের অসম বণ্টন নিয়ে। তাঁর আশঙ্কা, দেশের কোনো কোনো অংশ হয়তো বিকশিত হবে, কিন্তু বৃহত্তর অংশের মানুষ তার সুফল নাও পেতে পারেন। সেখানেই ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্নের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। ২০৪৭ এখনও দূরে। কিন্তু ২০২৬-এর বাজার যদি মানুষের সংসারে মহার্ঘ হয়ে ওঠে, তাহলে হাজার কোটির বিজ্ঞাপনেও সেই উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণই থেকে যায়। কারণ, জিডিপি খায় না মাথায় দেয়, সেটা মানুষ বোঝে না। সে বোঝে সংসার খরচ, বাজারের ব্যাগ, ওষুধের বিল, বাড়িভাড়া, সন্তানের স্কুলের ফি আস্তে আস্তে নাগালের বাইরে চলে যাওয়া। সে গোনে—পকেটে কত ছিল, বাজার করার পর কতটা থাকল! অর্থনীতির কেতাবি অঙ্কের সঙ্গে সংসারের অঙ্ক মেলে না কেন? সেটাই আম আদমির কাছে আসল প্রশ্ন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ