Bartaman Logo
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চীনের ‘রোবট বিপ্লব’

২০১১ সালে হিউ জ্যাকম্যানের একটি সিনেমা রিলিজ করেছিল—‘রিয়েল স্টিল’। কী ছিল সেই সিনেমার বিষয়বস্তু?

চীনের ‘রোবট বিপ্লব’
  • ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: ২০১১ সালে হিউ জ্যাকম্যানের একটি সিনেমা রিলিজ করেছিল—‘রিয়েল স্টিল’। কী ছিল সেই সিনেমার বিষয়বস্তু? তাতে দেখানো হয়েছিল, ২০২০ সালের পৃথিবীতে বক্সিং প্রতিযোগিতায় আর মানুষ নয়, লড়ছে রোবটরা। সেই জমানায় সিনেমাটিকে আর পাঁচটা সায়েন্স ফিকশনের মতোই মনে হয়েছিল। সেই সাই-ফাই এখন ঘোর বাস্তব। তার হাতেগরম প্রমাণ মিলল দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে। হিউম্যানয়েড রোবটদের মার্চপাস্ট বা রোবোটিক ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে পতাকা নাড়ার দৃশ্যগুলি ক্ষণে ক্ষণে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল অতীতের সেই জগতে। যখন সিনেমা দেখতে দেখতে মনে হত, একদিন যদি পৃথিবীর সর্বক্ষেত্রে রোবটদের বাড়বাড়ন্ত হয়, তাহলে কী হবে! সেই উদ্বেগ এখন বিশ্বব্যাপী। সৌজন্যে চীন। যে কারণে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক রায়ান ফেডাসিউক পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘বেজিংয়ের রোবট বাহিনী আর কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়। এটা আজ বাস্তব।’

Advertisement

রিপোর্ট বলছে, বর্তমানে গোটা বিশ্বের হিউম্যানয়েড রোবটের প্রায় ৯৫-৯৭ শতাংশই তৈরি হচ্ছে চীনে। শুধু উৎপাদন ক্ষমতা নয়, বেজিং প্রমাণ করে দিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ফিজিক্যাল মেকানিক্সের মেলবন্ধনে তৈরি এই ‘এম্বডিড ইন্টেলিজেন্স’ই আগামীতে ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান অস্ত্র হতে চলেছে।
বেজিংয়ে আয়োজিত পাঁচ দিনের এই ওয়ার্ল্ড গেমসে ১৬টি দেশের ৬৬৬টি দলের ২ হাজার ৫৬টি হিউম্যানয়েড রোবট মোট ৫১টি ইভেন্ট ও ১,৩০১টি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনাটি ঘটে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে। বেজিং হিউম্যানয়েড রোবট ইনোভেশন সেন্টারের তৈরি ‘তিয়ানগং আল্ট্রা’ নামের রোবটটি ১০০ মিটার দৌড় শেষ করে মাত্র ৮.৬৪ সেকেন্ডে! ভেঙে দেয় উসেইন বোল্টের বিশ্ব রেকর্ডও (৯.৫৮ সেকেন্ড)। অন্যদিকে ৪০০ মিটার দৌড়ে জয়ী হয় চীনের তিয়ানগং রোবট। সময় নেয় মাত্র ৩৮.১৫ সেকেন্ড। সেখানে মানুষের বিশ্বরেকর্ড ৪৩.০৩ সেকেন্ড। গত বছরের প্রতিযোগিতায় এই ইভেন্টে জয়ের সময় ছিল ১ মিনিট ২৮ সেকেন্ড। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে এই রোবটগুলির দক্ষতা ও গতির উন্নতি ঘটেছে কয়েক গুণ। আবার, ২৪ ঘণ্টার অল-রোবট ক্যাফেতে কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই ১ ঘণ্টায় ২০২ কাপ কফি পরিবেশন করে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েছে চীনা রোবট। অবশ্য এসবের মধ্যে ত্রুটিও ছিল বিস্তর। দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়া, ফুটবলে নিজের দলের খেলোয়াড়কেই ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়ার মতো অনেক হাস্যকর দৃশ্য এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। কিন্তু এই ব্যর্থতাগুলিকে চীনের দুর্বলতা ভাবলে ভুল হবে। কারণ এই সব ছোটো ছোটো ‘ভুল’ থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্রমে আরও নিখুঁত হয়ে উঠছে তারা।
মার্কিন মুলুক সহ একাধিক প্রথম সারির দেশে শ্রমিক ঘাটতি মেটাতে রোবটিক্স নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। আর চীন সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও ওয়ার্ল্ড মার্কেটে আধিপত্য বিস্তার করছে। কীভাবে এই বাজার দখল করছে তারা? সেই উত্তর রয়েছে তাদের দামের হিসাবে। চীনের অন্যতম প্রধান রোবট প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘ইউনিট্রি’ তাদের ‘জি১’ হিউম্যানয়েড রোবট বিক্রি করছে মাত্র ১৬ হাজার মার্কিন ডলারে—যা মার্কিন বা ইউরোপে তৈরি রোবটের মূল্যের দশভাগের একভাগ মাত্র। এই সংস্থার তৈরি রোবট কুকুর বা ‘কোয়াড্রাপ্যাড’ আন্তর্জাতিক বাজারে ছেয়ে গিয়েছে। ফলে বস্টন ডাইনামিক্সের মতো নামজাদা মার্কিন সংস্থাকে টেক্কা দিয়ে চীন এক বছরে ১০০টি দেশে প্রায় ১০ গুণ বেশি রোবট রপ্তানি করেছে।
বেজিংয়ের এই কৌশল যে কার্যকরী, সেই প্রমাণ মিলেছে ব্রিটেনের লজিস্টিক শিল্পে। উৎপাদন বৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকট কাটাতে টেসকো, আসডা বা নেক্সট-এর মতো নামী ব্র্যান্ডের ওয়্যারহাউসে ইতিমধ্যেই কাজ করছে ‘গিক প্লাস’-এর তৈরি ২ হাজারেরও বেশি ‘মোবাইল ফ্লোর রোবট’। চীনের হেফেই শহরে অবস্থিত কারখানা থেকে প্রতিদিন জাহাজ বোঝাই হয়ে বিশ্বজুড়ে পাড়ি দিচ্ছে রোবটগুলি। এই প্রযুক্তি মূলত চীনের ইলেকট্রিক ভেহিকল ইকোসিস্টেমের উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে। ইভি-র জন্য উৎপাদিত উন্নত ব্যাটারি, সেন্সর, মোটর এবং সেমিকনডাকটরই ব্যবহৃত হচ্ছে রোবটে। যেভাবে এগচ্ছে, ভবিষ্যতে কোনো গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা শুধু কার-কোম্পানি থাকবে না। তারা রোবটিক্স কোম্পানিতে পরিণত হবে। আমি নই, এমন চাঞ্চল্যকর দাবি স্বয়ং চীনা ইভি প্রস্তুতকারী এক্সপেং-এর প্রধান হে জিয়াওপেংয়ের।
খেলাধুলা বা ওয়্যারহাউসে রোবটের এই দক্ষতা শুধু বিনোদন বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আর সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে আগামীর সমর যুদ্ধের এক ভয়াবহ ছবি। অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞ তথা প্রাক্তন ব্রিগেডিয়ার ইয়ান ল্যাংফোর্ডের দাবি, বেজিং আদতে এই ধরনের খেলার আসরকে তাদের ‘কিলার রোবট’ বাহিনীর পরীক্ষার মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করছে। সম্প্রতি চীনের সরকারি টিভি চ্যানেল ‘সিসিটিভি’-তে দেখানো একটি সামরিক মহড়ার দৃশ্য ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। সেখানে দেখা গিয়েছে, শহরের ড্রিল গ্রাউন্ডে ড্রাগন ড্রোন, মেশিনগান সজ্জিত চারপেয়ে রোবট কুকুর এবং আনম্যান্ড গ্রাউন্ড ভেহিকেল চীনা সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মহড়া দিচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের জায়গায় ধীরে ধীরে পা রাখছে ‘রোবট সেনা’। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের চরিত্র আমূল বদলে যেতে চলেছে। আর এখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখছে ভারত। কারণ, বিভিন্ন সময় নানা ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়েছে চীন-ভারত সীমান্ত। ধীরে ধীরে যদি সেই সীমান্তেও সশস্ত্র ও নিজে থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম রোবট সেনাবাহিনী মোতায়েন করে বেজিং, তাহলে তা হবে নয়াদিল্লির কাছে বড়ো চ্যালেঞ্জ।
চীনের এই রোবোটিক ঝড়ের মধ্যে ভারতের অবস্থান ঠিক কোথায়? আন্তর্জাতিক রোবটিক্স ফেডারেশনের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, চীনের কারখানায় ২০ লক্ষ ২৭ হাজারেরও বেশি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট কর্মরত ছিল। সেখানে ভারতের কারখানায় মোট রোবটের সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ৫২ হাজার। আবার চীনে যখন ১৫০টিরও বেশি হিউম্যানয়েড রোবট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিপুল সরকারি অনুদানে রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠছে, সেখানে ভারতে এই সংখ্যা নগণ্য।
অবশ্য, ভারতে রোবটিক্স ব্যবস্থার ধীরগতির নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভারতীয় রোবটিক্স স্টার্টআপগুলির জন্য সবচেয়ে বড়ো বাধা—প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাব। অটোবোনিক্স-এর সহ প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ আজহারের মতে, ভারতে হিউম্যানয়েড বা অন্যান্য রোবট তৈরির উপাদানগুলির অন্তত ৯৯ শতাংশই আমদানি করতে হয় চীন, জাপান বা জার্মানি থেকে। মাইক্রোকন্ট্রোলার, মাদারবোর্ড, সেন্সর, অ্যাকচুয়েটর বা উন্নত ক্যামেরার জন্য ভারত চীন বা ইউরোপীয় সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয়ত, ভারত সরকারের ‘প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ’  প্রকল্পের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক্স ও অটোমোবাইল খাতে লক্ষ কোটির বিনিয়োগ এলেও, কেবল রোবটিক্স হার্ডওয়্যার গবেষণায় যে ধরনের বিপুল ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’ বা সরকারি ভরতুকি প্রয়োজন, তা এখনও যথেষ্ট নয়। চীনে প্রায় ৯০০টির বেশি কোম্পানি রোবট তৈরিতে ভুল করে, তা থেকে শেখে এবং সরকার সেই ব্যয়ভার বহন করে। কিন্তু ভারতীয় স্টার্টআপগুলির কাছে সেই সুযোগ নেই। 
সেই কারণে চীনের ‘ফার্স্ট ফলোয়ার’ হওয়াই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারতের। অর্থাৎ, প্রযুক্তিগতভাবে চীন আজ যে উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছে, ২০২৮ সালের মধ্যে সেই জায়গায় পৌঁছাতেই হবে। তবে তার জন্য অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যেমন, সম্পূর্ণ রোবট অ্যাসেম্বল করার বদলে উন্নত সেন্সর, অ্যাকচুয়েটর, সার্কিট বোর্ড ও উচ্চমানের ডিসি মোটর তৈরির দেশীয় ইকোসিস্টেম তৈরি করা। পাশাপাশি, দেশের আইআইটি এবং প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে প্রাথমিক গবেষণার অঙ্গ করে তোলা। এখানেই শেষ নয়। রোবটিক্সকে শুধুমাত্র সফটওয়্যার পরিষেবার চোখে না দেখে গভীর প্রযুক্তি বা ‘ডিপ-টেক’ হিসাবে চিহ্নিত করে সরাসরি অনুদান ও কর ছাড় দেওয়া।
চীন একটা বিষয় বুঝতে পেরেছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি ভবিষ্যতের ‘মস্তিষ্ক’ হয়, তবে রোবটিক্স হল তার ‘হাত ও পা’। যে দেশ এই দুইয়ের মেলবন্ধনে শীর্ষে থাকবে, একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে চালনা করবে তারাই। ভারতের কাছে সময় অত্যন্ত কম। শুধুমাত্র সফটওয়্যার ব্যাক-অফিস বা সস্তা শ্রমশক্তির দেশ হয়ে থাকার দিন শেষ। চীন থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতকেও দ্রুত নিজেকে বদলাতে হবে। না হলে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের পণ্য প্রতিযোগিতা থেকে নয়, সীমান্তে সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নেও ব্যাকফুটে পড়তে হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ