একবার একটা ছেলে আমাকে অনুরোধ করেছিল— সঙ্গীত ও নৃত্য সম্বন্ধে কিছু বলুন। আমি বললুম যে বিষয়টা খুবই গৌণ। আমি এ সম্বন্ধে কোন প্রবন্ধ পরে রচনা করব, সেটাই ভাল হবে। এখন সংক্ষেপে কিছু বলছি। সবাই জানে যে বিশ্বে সঙ্গীতশাস্ত্রের আদি গুরু, আদি প্রবক্তা হলেন সদাশিব। সেই সদাশিবই আয়ুর্বেদের, নৃত্যের, গীতের, বাদ্যের ও আরও অনেক কিছুরই প্রবক্তা। কেন সদাশিব গীত, বাদ্য, নৃত্যশাস্ত্র তৈরী করতে গেলেন? শুধু তাই নয়, তার সঙ্গে শ্বাসের আগমন-নির্গমনের (নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের) সঙ্গেও নৃত্যের, সঙ্গীতের ও বাদ্যের কী সম্পর্ক তাও নিরুপণ করে দিয়েছিলেন। ওটাকে বলা হয় স্বরশাস্ত্র। গীত, বাদ্য ও নৃত্য— এই তিনের মিলিত নাম হ’ল সঙ্গীত। ‘গৈ’ ধাতু + ‘ক্ত’ প্রত্যয় করে ‘গীত’ শব্দ নিষ্পন্ন হয়। আমি আগেই বলেছি, আর অনেকবারই বলেছি যে আমাদের হচ্ছে বৈবহারিক সন্তুলনের মাধ্যমে মূল কারণের দিকে যাওয়া। (Subjective approach through objective adjustment)। ‘সন্তুলন’ মানে হচ্ছে কী! সব কিছুকে এমনভাবে গুছিয়ে মানিয়ে নেওয়া যা’ গ্রহণযোগ্য হতে পারে। খুব বেশী তেঁতো হ’ল না, ঝাল হল না, টক হ’ল না— এমনভাবে সব কিছু রয়েছে অথচ মানিয়ে নিয়েছে। তোমরা সন্তুলনটা জানতে পারবে, ডাল রাঁধতে গেলে মাঝখানে ডাল সাঁতলে নিতে হয়। কোথাও বলে ‘সম্বরা দেওয়া’, কোথাও বলে ‘সাঁতলানো’। সাঁতলানো মানে সন্তুলন করা। ফোঁড়ন-টোড়ন দিয়ে এমন করা যাতে সেটা গ্রহণযোগ্য, ভোজনযোগ্য হয়।
সদাশিব যখন অধ্যাত্মবিদ্যার প্রচলন করলেন তখনই তাঁকে ভাবতে হল যে এই যে ধর্মসাধনা যারা করবে তাদের বৈবহারিক জীবনে সন্তুলনের দরকার। বৈবহারিক জীবনে সন্তুলন না থাকলে মন খিঁচড়ে থাকবে, মন বিশ্রী হয়ে থাকবে— সাধনায় মন বসবে না। বৈবহারিক জীবনের জিনিসগুলোর মধ্যে থেকে উনি এমন তিনটি জিনিস বেছে নিলেন যা বৈবহারিক জগতেও চলছে ও আধ্যাত্মিক জীবনেও সাংঘাতিক রকমের সাহায্য করছে। এটা হল ‘সঙ্গীত’। যার প্রথম চরণ, প্রথম অংশের নাম ‘গীত’। গীত হচ্ছে এমন একটা জিনিস যা’ স্থূল জগতের মধ্যে রয়েছে কিন্তু তরঙ্গটা বার বার মানস জগতের ভেতরে এসে পড়ছে। আর মানস জগৎটা হচ্ছে কী?—না, চিত্তাণুসৃষ্ট জগৎ, Ectoplasmic World। তার মধ্যে ঠিক সেই ধরণের ভাবতরঙ্গ উত্থিত হচ্ছে যা’ শেষ পর্যন্ত সরলরেখাকারে গিয়ে আত্মাকে ছুঁচ্ছে, আয়াকে স্পশ করছে। এখন আত্মাকে স্পর্শ করতে গেলে যেমন গীতের মধ্যে ছন্দ থাকবে, সুর থাকবে, তার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে ভাবও থাকবে। সুতরাং ভাববর্জিত হলে গীতের মাধুর্য সম্পূর্ণ হতে পারে না। তাই গীতকে ভাবযুক্ত হতে হবে। এর সঙ্গে উনি দিলেন কী?— না, বাদ্য আর নৃত্য। যা’ আর্যভারতীয় সঙ্গীত নামে খ্যাত, যা’ আর্যাবর্ত বা হিন্দুস্তানী সঙ্গীত ও দাক্ষিণাত্য বা কর্নাটক সঙ্গীত এই দুই শাখায় বিভক্ত। একই ধরণের রাগ-রাগিণীকে আশ্রয় করে বিভিন্ন প্রজাতির অভিব্যক্তি হ’ল এই দুই শাখার মূল ধর্ম। এর মধ্যে আবার বিভিন্ন ঘরাণা আছে। অর্থাৎ এক-একটা মানুষ এক-একটা বিশেষ ধরণে তার লক্ষ্য পরমপুরুষকে সন্তুষ্ট করার প্রয়াস করে গেছে। এইগুলোকে বলে এক-একটা বিশেষ ‘ঘরাণা’। বাংলাতে ধ্রুপদের ‘বিষ্টুপুরী ঘরাণা’ রয়েছে। কীর্তনেও মনোহরশাহী, রাণীহাটি, গরাণহাটা, মন্দারণ ইত্যাদি বিভিন্ন ‘ঘরাণা’ রয়েছে। ঘরাণাগুলো হ’ল বিভিন্ন রাগ-রাগিণীকে আশ্রয় করে নিজের মনের বিশিষ্ট মনোভাবকে ঠেলে দেওয়া সামনের দিকে। গীতে যেমন ভাব রয়েছে তার সঙ্গে ছন্দও রয়েছে, সুরও রয়েছে কিন্তু সে ভাবাশ্রয়ী। বাদ্য কিন্তু সে ধরণের ভাবাশ্রয়ী নয়।
শ্রীআনন্দমূর্তির ‘ভক্তিরস ও কীর্ত্তনমহিমা’ থেকে