তন্ময় মল্লিক: স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার ও নাবালিকা বিয়ে আটকাতে বদ্ধপরিকর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তারজন্য সরকারি অনুদান বন্ধ করা থেকে যাবতীয় কড়া পদক্ষেপ করতে প্রস্তুত। সরকার কঠোর হলে বিজেপির ভোট কমতে পারে। সেই আশঙ্কা প্রকাশ করেও তিনি কড়া পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত। ছাত্রসমাজের স্মার্টফোনে আসক্তি ও নাবালিকা বিয়ে জ্বলন্ত সমস্যা। তাতে লাগাম পরাতে পারলে মঙ্গল সমাজেরই। সরকারি কঠোরতায় শাসক দলের ভোট কমবে কি না, বলা কঠিন। তবে, তিনি বহু বাবা-মায়ের আর্শীবাদ যে পাবেন, তা নিয়ে সংশয় নেই।
মোবাইল আসক্তি যে ছাত্রছাত্রীদের ভয়ংকর ক্ষতি করছে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু আমাদের রাজ্য বা দেশ নয়, গোটা বিশ্ব মোবাইল থেকে সন্তানদের দূরে রাখার রাস্তা খুঁজছে। এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারে অশান্তির অন্যতম কারণ স্মার্টফোন। ফোন ঘাঁটা নিয়ে অশান্তি হয় না, এমন পরিবার তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যাবে না। গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইলে ডুবে থাকছে বহু ছাত্রছাত্রী। তাতে পড়াশোনা তো গোল্লায় যাচ্ছেই, শারীরিক এবং মানসিকভাবেও বিধ্বস্ত হচ্ছে। মোবাইলের নেশা মাদকের চেয়েও ভয়ংকর। গেমিংয়ের চক্করে পড়ে, অশান্তির জেরে বহু প্রাণ অকালে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
এমনই এক পরিস্থিতিতে শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ছাত্রছাত্রীদের স্মার্টফোনে আসক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শুধু উদ্বেগ প্রকাশই করেননি, কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাতে দলের ভোট কমলেও তাঁর সরকার যে পিছু হটবে না, তারও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
করোনার সময় গৃহবন্দি ছাত্রছাত্রীরা যাতে ঘরে বসেই পড়াশোনা করতে পারে তারজন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার চালু করেছিল ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্প। উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়াদের মোবাইল কিনতে ১০হাজার টাকা অনুদান দেয়। সেই সময়ের পরিস্থিতি বিচার করলে এই প্রকল্প চালুর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। কিন্তু, করোনা মহামারি বিদায় নেওয়ার পরেও কি তার কোনো প্রয়োজন ছিল? বিপুল অর্থ খরচ করে এই প্রকল্প চালু রাখায় শিক্ষার উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায়নি, কেবল স্কুলছুটের সময়টা পালটেছে। একটা সময় মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই স্কুলে যাওয়া বন্ধ হত। মোবাইল দেওয়া শুরু হওয়ায় সেটা একাদশ শ্রেণিতে অ্যাডমিশন পর্যন্ত গড়িয়েছে।
এখন কোনো রকমে টেনেটুনে মাধ্যমিক পাশ ছাত্রছাত্রীরাও একাদশ শ্রেণিতে অ্যাডমিশন নিচ্ছে। উচ্চ শিক্ষালাভ নয়, ১০ হাজার টাকা পকেটস্থ করাই অনেকের উদ্দেশ্য। একাদশে ভরতি ও পরীক্ষায় বসা ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার ফারাকই তার প্রমাণ। অনেকে মনে করেন, করোনা বিদায় নেওয়ার পরই ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্প বন্ধ করা উচিত ছিল। হয়তো নির্বাচনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ার আশঙ্কাতেই পূর্বতন সরকার অনুদান চালিয়ে গিয়েছে। নতুন সরকার সম্ভবত সে রাস্তায় হাঁটবে না। স্মার্টফোনের জন্য টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেবে। তারজন্য ছাত্রছাত্রীরা বিজেপির উপর চটতে পারে। তবুও মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধান্ত থেকে নড়বেন না। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন, একইসঙ্গে ‘ডুড ও তামাক’ খেয়ে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো যায় না। সরকার স্মার্টফোন কেনার টাকা দেবে, আবার মোবাইল আসক্তির সমালোচনা করবে, একই সঙ্গে দু’টো চলতে পারে না।
মুখ্যমন্ত্রী এব্যাপারে কড়া পদক্ষেপ করলে ভোট কমবে কি না জানা নেই, তবে অভিভাবকরা তাঁকে দু’হাত তুলে সমর্থন করবেন। তাঁরা যে কাজটা প্রতিনিয়ত লড়াই করেও করতে ব্যর্থ, সেটাই করতে চাইছে সরকার। অভিভাবকদের জন্য এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে? সরকারের পদক্ষেপে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। তাই যে সমস্ত অভিভাবক অঘটন ঘটার ভয়ে সন্তানকে মোবাইল কিনে দিতে বাধ্য হন, তাঁরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন।
মোবাইলের মতো নাবালিকা বিয়েও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চরম সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী একটি রিপোর্ট সামনে এনে সকলকে চমকে দিয়েছেন। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২১ জুন পর্যন্ত রাজ্যে ৬০ হাজার নাবালিকা মা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। নার্সিংহোম বা বাড়িতে ডেলিভারির হিসাব ধরলে সংখ্যাটা অনেক বাড়বে। নাবালিকা মায়ের সংখ্যার বিচারে শীর্ষে রয়েছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলা। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, নাবালিকা মায়ের স্বামী, বাবা-মা, পুরোহিত এবং কাজির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে তাদের বাদ দেওয়া হবে।
অনেক সময়, ভালো কথায় কাজ না হলে চাপ সৃষ্টি করতে হয়। আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হয়। যেমন হেলমেট ছাড়া বাইক চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে আরোহীরই ক্ষতি হয়। মাথায় বেশি চোট লাগলে বাঁচানো যায় না। তাই হেলমেট পরে বাইক চালানোর জন্য আইন করা হয়। কিন্তু, সেই আইন বহু মানুষ মানে না। হেলমেটহীন বাইক আরোহীকে চোখের সামনে মরতে দেখেও সংবিৎ ফেরে না। তাই হেলমেট পরতে বাধ্য করার জন্য জরিমানার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। তাতে হেলমেট পরার প্রবণতা কিছুটা হলেও বেড়েছে। এভাবেই মানুষের ভালোর জন্যই সরকারকে আইন লাগু করতে হয়, কঠোর হতে হয়। তাই নাবালিকা বিয়ে বন্ধ করার স্বার্থে সরকার কড়া পদক্ষেপ করলে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে তাকে সমর্থন জানানো উচিত। তবে, এটাও ঠিক, শুধু শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। শাস্তির ভয়টা থাক। পাশাপাশি নাবালিকা বিয়ের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
নাবালিকা বিয়ের অন্যতম প্রধান কারণ অশিক্ষা ও গরিবি। কন্যসন্তানকে ১৮ বছর পর্যন্ত যেকোনো ভাবে পড়াশোনার মধ্যে আটকে রাখতে হবে। তাহলেই অনেকটা সমস্যা মিটে যাবে। সম্ভবত সে কথা মাথায় রেখেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী এবং রূপশ্রীর মতো প্রকল্প চালু করেছিলেন। ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকলেই মেয়েরা পেত কন্যাশ্রীর ২৫ হাজার টাকা। এই প্রকল্প চালু হওয়ায় কমেছিল মেয়েদের স্কুলছুটের সংখ্যা। এখনও প্রায় প্রতিটি জেলাতেই মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছাত্রের চেয়ে ছাত্রীর সংখ্যাই বেশি হয়।
একইভাবে রূপশ্রী প্রকল্পও রাশ টেনেছিল নাবালিকা বিয়েতে। দুঃস্থ পরিবারের কন্যাসন্তানদের বিয়ের খরচ বাবদ সরকার ২৫ হাজার টাকা অনুদান দিত। ফলে অনেক পরিবারই মেয়ের বিয়ের জন্য
১৮ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করত। তাতে একদিকে বাড়ছিল নারী শিক্ষার হার, অন্যদিকে কমছিল নাবালিকা বিয়ের সংখ্যা। কিন্তু, করোনার ছোবলে সব লন্ডভন্ড হয়ে যায়। জীবন বন্দি হয়ে যায় চার দেওয়ালের মধ্যে। মাসের পর মাস স্কুল বন্ধ। ফলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহটাই অনেকে হারিয়ে ফেলে। তাতেই ড্রপ আউট ও নাবালিকা বিয়ের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যায়। ছাত্রছাত্রীর অভাবে বন্ধ হয়ে যায় বহু স্কুল। ফের ছাত্রছাত্রীদের স্কুলমুখী করতে পারলেই বদলাবে পরিস্থিতি।
রাজ্যের মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি মুর্শিদাবাদ জেলায়। আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া জেলার সামনের সারিতে থাকা এই জেলাতেই নাবালিকা মায়ের সংখ্যা সর্বাধিক। তার কারণ আর কিছুই নয়, আর্থিক অনটন। কন্যাসন্তান জন্মালেই যে সব পরিবারে ঘনিয়ে আসে শ্রাবণের অন্ধকার তাদের বোঝাতে হবে, মেয়েকে যথাযথ শিক্ষা দিলে সে ছেলেদের থেকে কোনো অংশে কম নয়। এখন আর কন্যাসন্তান ‘আপদ’ নয়, ‘সম্পদ’।
পরীক্ষাহলে পরীক্ষার্থীর খাতা জমা নেওয়ার আগে একটা ওয়ার্নিং বেল বাজানো হয়। তাতে পরীক্ষার্থীরা বুঝে যায়, পরীক্ষার সময় শেষ হয়ে আসছে। নাবালিকা বিয়ে বন্ধের জন্য কড়া পদক্ষেপের আগেও একটা ‘ওয়ার্নিং’ দেওয়া দরকার। নতুন করে কেউ যাতে নাবালিকার বিয়ে দিতে সাহস না পায় তারজন্য যতটা কঠোর হওয়া সম্ভব সরকার ততটাই হোক। কিন্তু, ইতিমধ্যেই যে সব নাবালিকা মা হয়েছে তাদের সরকারি সুবিধা বন্ধ করলে বিপদ বাড়বে। এমনিতেই তাদের সন্তানদের অপুষ্টির শিকার হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তার উপর সুযোগ থেকে বঞ্চিত করলে তারা চরম অর্থকষ্টে ভুগবে। পাশাপাশি নাবালিকা সন্তানসম্ভবারাও ভয়ে হাসপাতালে যাবে না। হাতুড়ের দ্বারস্থ হবে। তাতে মা ও সন্তান উভয়েরই বিপদ বাড়বে। তাই কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারকে হতে হবে মানবিক। তবেই মিলবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা একটা কঠিন সমস্যা সমাধানের পথ।