Bartaman Logo
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাজ্যের সামনে চ্যালেঞ্জ

এমন পরিস্থিতি আগেও তৈরি হয়েছে। গ্রাম-শহরে জল সরবরাহ, নিকাশি, রাস্তা-আলো, পরিকাঠামো তৈরিতে ‘টায়েড’ ও ‘আনটায়েড’ তহবিলে কোটি কোটি টাকা দেয় অর্থ কমিশন।

রাজ্যের সামনে চ্যালেঞ্জ
  • ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

এমন পরিস্থিতি আগেও তৈরি হয়েছে। গ্রাম-শহরে জল সরবরাহ, নিকাশি, রাস্তা-আলো, পরিকাঠামো তৈরিতে ‘টায়েড’ ও ‘আনটায়েড’ তহবিলে কোটি কোটি টাকা দেয় অর্থ কমিশন। বছর শেষে দেখা যায়, তার অনেকটা অর্থ খরচই করতে পারেনি রাজ্য সরকার। ধরা যাক, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ পর্যন্ত চালু পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের কথা। ওই পাঁচ বছরে কেন্দ্রীয় করের ভাগ ছাড়াও টায়েড ও আনটায়েড তহবিলে মোট ২১ হাজার কোটি টাকা পেয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। খবরে প্রকাশ, পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে দেখা গিয়েছে, এর মধ্যে প্রায় ২০০০ কোটি টাকা খরচের কোনো হিসাব দিতে পারেনি রাজ্যের বিগত সরকার। ঘটনা হল, প্রতি বছরই মোটা অঙ্কের টাকা বরাদ্দের পর বছরের প্রথম দিকে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহারে নজর দেয় না সরকার। তারপর ‘মরণকালে হরিনাম’-এর মতো শেষলগ্নে তড়িঘড়ি হাতে থাকা অর্থের সৎকার করতে প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়। কিন্তু অল্প সময়ে বেশি অর্থ খরচ করতে না পারায় তহবিলে প্রচুর টাকা থেকে যায়। শেষ বিচারে সমস্যার সমাধান হয় না। তথ্য বলছে, ২০২০-২০২১ সালে হাতে থাকা অর্থের মধ্যে রাজ্য খরচ করতে পেরেছিল মাত্র ৪৪১ কোটি টাকা (১৮.৭৩ শতাংশ), ২০২১-২২-এ ২৫৫২ কোটি টাকা (৪৪.২৪ শতাংশ), ২০২২-২৩-এ ৩৮৩৮ কোটি টাকা (৭৯.০২ শতাংশ)। এই পরিস্থিতিতে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের একটা সময় দেখা যায়, হাতে থাকা প্রায় ৪৩৬৬ কোটি টাকার মধ্যে খরচ হয়েছে ২৪৭৪ কোটি টাকা। নবান্নের কর্তারা হিসাব করে দেখান, সেই অর্থবর্ষ শেষের বাকি কয়েক মাস পুরো টাকা খরচ করতে গেলে দৈনিক গড়ে ৬০ কোটি টাকার কাজ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়েছে কি না, তা আর জানা যায়নি।

Advertisement

প্রায় একইরকম একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে রাজ্যের এই প্রায় সাড়ে চার মাস বয়সের বিজেপি সরকার। কেন্দ্রীয় প্রকল্প অটল মিশন ফর রিজুভিনেশন অর্থাৎ আরবান ট্রান্সফরমেশন, সংক্ষেপে ‘অম্রুত-২-এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি অর্থবর্ষে, মানে ২০২৭’-এর মার্চে। অর্থাৎ হাতে আর মাত্র সাত মাস সময়। এর মধ্যে রাজ্যের ১২৮টি পুরসভা এলাকায় পানীয় জল সরবরাহ, নিকাশি উন্নয়ন, জলাশয় পুনরুজ্জীবন এবং সবুজায়নের কাজে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে রাজ্যকে। মানে, দৈনিক ২৭ কোটি টাকা। এই অসাধ্যসাধন করতে না পারলে হাতছাড়া হবে রাজ্যের প্রাপ্য বিপুল পরিমাণ অর্থ। খাতায়-কলমে সাত মাস সময় বলা হলেও উৎসবের মরশুম এবং শনি-রবিবার ছুটির দিন ধরলে হাতে কাজের দিন পাঁচ মাসও থাকবে না। সাদা চোখে এই কম সময়ে এত বিপুল অর্থ খরচ করার কথা শুনে চোখ কপালে উঠলেও লক্ষ্য স্থির রেখে সঠিক পরিকল্পনা, কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতা দেখাতে পারলে এই অসম্ভবকে সম্ভব করা যেতে পারে। অভিজ্ঞ আমলাদের মতে, কম সময়ে বিপুল অর্থ খরচের জন্য নির্বাচিত ক্ষেত্র হতে পারে বাড়ি বাড়ি পানীয় জল সরবরাহের কাজটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগনোর চেষ্টা। তবে সরকারে এসেই বাড়ি গাড়ি পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেইমতো প্রকল্পের পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলা হয়েছে।
মমতা জমানায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বিশেষত ১০০ দিনের কাজ ও গ্রামীণ আবাস যোজনা নিয়ে রাজ্যের অভিযোগ ছিল সর্বাধিক। এই অভিযোগ আংশিক সত্য। কিন্তু আরও একটি সত্য হল, স্রেফ রাজনৈতিক কারণে বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা থেকে রাজ্যবাসীকে বঞ্চিত করে রেখেছিল আগের সরকার। এরসঙ্গে সমান সত্য ছিল, নিয়ম মেনে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের কাজ শেষের শংসাপত্র (ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট) জমা দেওয়ার কাজে সীমাহীন ব্যর্থতা। যার জেরে অনেকক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের অর্থ থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে রাজ্যকে। পাশাপাশি অর্থ কমিশন বা অম্রুত প্রকল্পের মতো একাধিক ক্ষেত্রের বিপুল অর্থ হাতে পেয়েও স্রেফ নিজেদের অপদার্থতার কারণে টাকা খরচ করতে পারেনি তৃণমূল সরকার। যার ফল ভুগতে হয়েছে রাজ্যবাসীকে। ফলে এখন অম্রুত প্রকল্পের টাকা যাতে ফেরত না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে পালাবদলের এই সরকারকে। সন্দেহ নেই, রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের কাছে এ এক বড়ো চ্যালেঞ্জ। একাধিক পুরসভার আসন্ন নির্বাচনে জিততে হলে যে পরীক্ষায় বসতে হবে বর্তমান শাসক দলকে, তার চেয়ে দিল্লির পাঠানো টাকা সময়ের মধ্যে খরচ করতে পারার কঠিন বাস্তবটাও কম চ্যালেঞ্জের নয়। আপাতত সেই পরীক্ষায় অগ্নিমিত্রা পালের দপ্তর সফল হয় কি না সেটাই দেখার।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ