Bartaman Logo
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভরসার বাংলায় এত ধমক কেন!

মুখ্যমন্ত্রী সতর্ক করতে পারেন। সাবধান করাও অন্যায় বলব না। কিন্তু তিনি কথায় কথায় ধমক দিতে পারেন তাঁর সামান্য প্রজা থেকে শুরু করে বিরোধীদের? সমাজবিরোধীদের শাসন করতেই পারেন। আইন মেনে জেলেও পুরতে পারেন। পাঁচ বছরের জন্য সেই অধিকার তিনি পেয়েছেন বলে দাবি করছেন।

ভরসার বাংলায় এত ধমক কেন!
  • ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: মুখ্যমন্ত্রী সতর্ক করতে পারেন। সাবধান করাও অন্যায় বলব না। কিন্তু তিনি কথায় কথায় ধমক দিতে পারেন তাঁর সামান্য প্রজা থেকে শুরু করে বিরোধীদের? সমাজবিরোধীদের শাসন করতেই পারেন। আইন মেনে জেলেও পুরতে পারেন। পাঁচ বছরের জন্য সেই অধিকার তিনি পেয়েছেন বলে দাবি করছেন। কিন্তু গুন্ডাদমন আইন এনে আতঙ্কের উদ্রেক করতে পারেন রাজ্যবাসীর মনে? ভয় আর প্রতিহিংসার বিরুদ্ধেই কিন্তু রাজ্যের মানুষ ভোট দিয়েছেন গত এপ্রিলে। কলঙ্কিত সেই জমানার অনেক অপরাধীই আজ বুক ফুলিয়ে ঘুরছেন সেটিংয়ের সৌজন্যে। বিজেপির তৈরি করা ফরমুলা মেনে হঠাৎ আত্মপ্রকাশ করা অনামা দলের নিরাপদ আড়াল থেকে। উলটো করে ঝোলানো দূরে থাক, বর্তমান সাড়ে চার মাসের জমানাতেও নতুন করে নব্য তোলাবাজদের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন। তাদের দমনে মন না দিয়ে, এটা লেখা যাবে না, ওটা করা যাবে না, ফতোয়ার এত মরশুমি বাহার কেন পদ্মবনে? 

Advertisement

হতে পারে কেউ বিরোধী, ভিন্ন মত ও পথের পথিক। কেউ সৎ আবার কেউ অসৎ। ছত্রধর মাহাতর বাইকে মমতা যখন জঙ্গলমহল ঘুরতেন তখন মেদিনীপুর সহ বিস্তৃত অঞ্চলে নেত্রীর দলের অন্যতম কান্ডারি কে ছিলেন? অস্বীকার করার উপায় নেই। মেদিনীপুর ও জঙ্গলমহলজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানোর পাশাপাশি নন্দীগ্রাম আন্দোলনের আগুনে দিনগুলোর কথা কী এত সহজে ভোলা যায়! একজন নকশালের সঙ্গেও আজকের শাসক দলের কারও যোগাযোগ ছিল না কস্মিনকালে? কিংবা কিষেণজির সঙ্গে সখ্য? আর ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় বিচ্যুতি, সে তো বিজেপিতেও ভূরি ভূরি আছে। ইতিমধ্যেই রাঘববোয়াল থেকে চুনোপুঁটি সবাই এ রাজ্যে বলছে, আমাকে আমার মতো কামাতে দাও! কথাটা শুধু সাধারণ মানুষ বলছে না, খোদ আপনার দলের সভাপতি স্বীকার করছেন, তোলাবাজি কমার বদলে আকাশ ছুঁয়েছে। বিবেকের ভূমিকায় রাজ্য সভাপতি, কেউ তাঁর কথা শুনছে বলে মনে হচ্ছে না। টাকা তুলতে পুজোর হাতবদল হচ্ছে মাত্র। দুর্ভাগ্য এটাই!
সাধু-সন্তদের যথোচিত সম্মান জানিয়েই বলছি, ত্যাগ, পবিত্রতা, সংযম যেমন আছে, তেমনি ঘোরতর বিচ্যুতিও খুব কষ্টকল্পিত কিছু নয়। সারাদেশে খুঁজলে ভাণ্ডার উজাড় হয়ে যাবে! তা বলে জনসভায় দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষ সবাইকে রাষ্ট্রবিরোধী বলে দাগিয়ে দিয়ে উপড়ে ফেলার হুমকি দেওয়া যায়? যদি বলতেন, আইনত ব্যবস্থা নেব, কিছু বলার ছিল না। কিন্তু উপড়ে ফেলব! এ তো সরাসরি হুমকি, যুদ্ধ ঘোষণা! বিজেপি, আরএসএসের বিরুদ্ধ কোনো মতবাদ এদেশে এখনও নিষিদ্ধ নয়। তাহলে মুখে মুখে নিষিদ্ধ আচরণ ও শব্দবন্ধের সংখ্যা এত দ্রুত বাড়তে দিচ্ছেন কেন? পাঁচ বছর পর পুরো তালিকাটা অভিধানের চেয়ে বড়ো বই করে ছাপতে হবে না তো! 
বিরোধ, প্রতিবাদ, মতান্তর নীতির লড়াই গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আইনসভা মানেই ‘হাউস বিলংস টু অপোজিশন’। জরুরি অবস্থায় যাঁরা ইন্দিরার বিরোধিতা করেছিলেন তাঁরা কি সেদিন রাষ্ট্রবিরোধী ছিলেন না শাসকের চোখে! আদবানি, বাজপেয়িও জেল খেটেছিলেন। ঠিক যেমন আজকের মুখ্যমন্ত্রীও ছিলেন কয়েক মাস আগে পর্যন্ত তৎকালীন শাসকের চক্ষুশূল! গ্রেপ্তারি এড়াতে পদে পদে রক্ষাকবচের খোঁজে হাইকোর্টে ছুটতে হত তাঁকে। ৫১ বছর আগে জরুরি অবস্থার দমনপীড়ন, কালাকানুন মিশা নেমে এলেও আন্দোলন, প্রতিবাদের মৃত্যু হয়নি। মত ও পথের ফারাকও উবে যায়নি। এটাই ভারতীয় গণতন্ত্রের চমৎকারিত্ব। বরং ধরপাকড় ধমকানি চমকানি যত বাড়ে, বিরোধীদের পায়ের তলার জমি তত শক্ত হয়। আজ যিনি গরাদের পিছনে, কাল তিনিই মানুষের হৃদয়ে! জেন জি’রা হিরো হল দিল্লিতে তাদের উপর লাঠি গুলি চলল বলেই না! আপনিই তো তিনি, শুধু সভা করার অনুমতি আদায় করতেই ১০৪ বার ‘বিরোধী দলনেতা’কে আদালতে ছুটতে হয়েছে বলে দাবি করেন। নিশ্চিতভাবে তা কাঙ্ক্ষিত ছিল না গণতন্ত্রে। তার মাশুলও দিতে হচ্ছে পুরানো শাসককে। গোটা দলটাই খণ্ড খণ্ড। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এ জমানার শাসকও যখন সেই একই ভুল প্রবৃত্তির শিকার হন, তখনই সংবিৎ ফেরে। বুঝতে পারি, দোষটা একজন ব্যক্তির নয়, ক্ষমতার প্রশস্ত অথচ গা ঘিনঘিনে একচোখা সংকীর্ণ গলিটার! নির্দিষ্ট ডিএনএ’র। যে বসে গদিতে তাঁরই কি আচরণ রাতারাতি আস্ফালনে বদলে যায় একরোখা দম্ভের জাদুছোঁয়ায়! মৃত্যু হয় সহ্য, সৌজন্য ও সহাবস্থানের। এভাবেই একের পর এক দুনিয়া কাঁপানো একনায়ক শাসকের অপমৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী থাকি আমরা, মানে সব হারানো ভ্যাবলা জনগণ!
বিধানসভার কক্ষে দাঁড়িয়ে আপনি বলেছেন, পাঁচ বছরের জন্য বাংলার মানুষকে শাসন করার আইনি ছাড়পত্র আপনার পকেটে। হিসাব যা হওয়ার হবে পাঁচ বছর পর। খুব সত্যি কথা। কিন্তু একইসঙ্গে দুঃখের কথা, প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে গিয়ে ধমক চমকের চক্রব্যূহে একের পর এক শব্দ এবং শব্দবন্ধও নিষিদ্ধ হচ্ছে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। গরিব হচ্ছে, সংকুচিত হচ্ছে মত প্রকাশের বিস্তৃত দিগন্ত। এটা কি কাঙ্ক্ষিত ছিল ভরসার বাংলায়? পবিত্র গেরুয়ার আগে পরে কিছু লেখা নিষিদ্ধ। ওতে নাকি ত্যাগের রং-টার অবমাননা হবে। কোনোমতেই তা হতে দেওয়া যায় না। শিক্ষার গৈরিকীকরণের কথা তো কবে থেকে লিখে আসছি। কেউ তো আপত্তি তোলেনি এতদিন। অবমাননা না করেই বলছি, শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ কিংবা শ্রী চৈতন্যর গেরুয়া আর যোগী আদিত্যনাথের ‘স্যাফ্রন’ রং-য়ের মধ্যে ফারাক নেই মানতে হবে বাংলায় বসে? দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক যতই চোখ রাঙান আম বাঙালি কী এর সঙ্গে একমত? স্বামীজি, শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্যদেব, প্রণবানন্দস্বামী কখনও ক্ষমতা দখলের রাজনীতি করেননি। মানুষে মানুষে বিভেদ করেননি। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা তাঁদের হিন্দুধর্মের মূল সুর ছিল না কস্মিনকালেও। তাহলে গেরুয়াকে রাজনীতির ঘোলাজলে নামিয়ে এনে তার পবিত্রতার অবমাননা করল কারা?
মধ্যপ্রদেশে থেকে সম্মানননীয় বাগেশ্বর বাবা নবান্নে গোটা মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে আহার করেছেন। খুব ভালো কথা। তারপর কার্যত পুজোয় আমিষ নিষিদ্ধ করার ফতোয়া জারি করেছেন। বাঙালির ‘গন্দে গন্দে ভোজন’, পুজোয় আমিষ খাওয়াদের ‘পাখন্ডি’র সঙ্গে তুলনা করার লাইসেন্স তাঁকে দিল কে? এ হেন বাবার মন্তব্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে গ্রেপ্তার হয়েছেন কংগ্রেস নেতা অতনু দাস। তাঁর দ্রুত মুক্তি দাবি করছি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। আমাদের কাছে গেরুয়া বললেই প্রথমে সামনে আসে স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীচৈতন্য, স্বামী প্রণবানন্দের নাম। তাঁরা হিন্দুধর্মের স্বরূপ নির্ধারণ করে দিয়ে গিয়েছেন বহুকাল আগে। বাঙালি সেই পথেই চলবে। স্বামী বিবেকানন্দ বলে গিয়েছেন, গীতা পড়ার চেয়ে ফুটবল খেলা যুব সম্প্রদায়ের চরিত্র গঠনে অধিক সহায়ক। আজও রামকৃষ্ণ মিশনে মাছ মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। স্বামী বিবেকানন্দ ও শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শ প্রোথিত রয়েছে একটা মাত্র বাক্যে: জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। সনাতন সেই হিন্দু ধর্মের ভিত্তিই সব পথ আর মতের মিলনের মধ্যে। পুজোয় বাঙালি কী করবে, কী পরবে, কী খাবে তা ভিনদেশি কোনো বাবার উপদেশ শুনে ঠিক হবে না যত মত তত পথের শারদোৎসবে! 
বলি, সব ছেড়ে দিয়ে শারদোৎসবেও আজকের শাসকের আপত্তি কেন? পণ্ডিতরা, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ কী বলে গিয়েছেন সেই উচ্চমার্গের বিতর্কে না গিয়েও বলতে বাধা নেই, আপনি পিঁপড়ে মারতে কামান দাগছেন। এতে হীনবল বামেরাই অক্সিজেন পাচ্ছে। বামেরা পুজোর সময় মণ্ডপের বাইরে যে বইয়ের স্টল দেন, সেটির অনুমতি পেতেও এবার সনাতন সংস্কৃতি মেনে স্টলের বাইরে লিখতে হবে ‘দুর্গাপুজো’ শব্দটি। বামপন্থীরা বিশেষ করে সিপিএম ‘শারদোৎসব’ লিখে মার্কসীয় পত্রপত্রিকার স্টল যাতে দিতে না পারে সেজন্য পুজো কমিটিগুলিকে সতর্ক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বাঙালি জীবনে পুজো আর উৎসব কোথায় মিশে গিয়েছে তার শিকড় ধরে টান মারার কি খুব প্রয়োজন ছিল আজকের দুর্দিনে? একইভাবে স্রেফ যাদবপুরের শিক্ষক সংগঠনকে ভাঙতে গিয়ে যে কায়দায় রাতারাতি একটা আইন নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন, তাও ভবিষ্যতে ব্যুমেরাং হতে পারে। ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ অ্যান্ড কলেজেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ পাশ হয়েছে। উদ্দেশ্য, যাকে যখন খুশি বদলি। এসবই গণতন্ত্রের পক্ষে সুস্থ কি না, সেই প্রশ্ন উঠবেই। শিক্ষাক্ষেত্রে ‘অনিলায়ন’ ও ‘মমতায়নে’র কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু যাদবপুর দখল করতে তিনি যা করলেন তাই বা কম কীসে? এটাকে কী বলবেন? ‘শুভেন্দুয়ায়ন’!
ভয় সরিয়ে ভরসা চেয়েছিল বাঙালি। ষোলোআনা প্রতিশ্রুতিও ছিল বিজেপির প্রচারে ও বিজ্ঞাপনে। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের ৩৪ দিন আগে রিপোর্ট কার্ড কী বলছে। জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলে প্রধান শিক্ষককে ফেলে মারধরের ঘটনার ভিডিয়ো এখনও তাজা। সমাজমাধ্যমে চলছে নিন্দার ঝড়। ছাত্রদের এভাবে শিক্ষকের উপর হামলার ঘটনার পিছনে কেউ ইন্ধন জুগিয়েছিল কি না, তা নিয়েও চলছে কাটাছেঁড়া। সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের অদ্ভুত দাবিতে এক সংখ্যালঘু মহিলা উপাধ্যক্ষ সারারাত আটকে থাকলেন এবং শেষে ইস্তফা দিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হলেন কেন? এসবই কি সুশাসন এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ফিরে আসার লক্ষণ, যার জন্য নির্বাচনের আগে মানুষ একজোট হয়েছিল। নাকি নতুন করে কোনো নৈরাজ্যের পদধ্বনি। যখন তুমি আমায় ভণ্ড বলো ধন্য যে হয় সে ভণ্ডামি! শুভেন্দু অধিকারীরকে যথোচিত সম্মান জানিয়েই বলছি, বাঙালিকে আর পিছনের দিকে টানবেন না। অসুখ নির্ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলুন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ