Bartaman Logo
২৬ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মন্ত্রীর ইস্তফা: কেন্দ্রের কাছে অশনিসংকেত

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা কেন্দ্রের জন্য বড় সংকেত। ছাত্রদের আন্দোলন ও সরকারের চাপে বদলাচ্ছে পরিস্থিতি। বিস্তারিত পড়ুন।

মন্ত্রীর ইস্তফা: কেন্দ্রের কাছে অশনিসংকেত
  • ২৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: গণআন্দোলনের জয় হল। প্রমাণ হল, বিরোধীদের কিনে নিলেই প্রতিবাদ শেষ হয়ে যায় না। ভাষা হারায় না প্রতিরোধ। নেতারা বিক্রি হয়, রুখে দাঁড়ায় ছাত্র-যুবরা। স্বীকৃত রাজনৈতিকদলগুলিকে নানা প্রলোভনে বশ করলেই দেশের অন্তরাত্মাকে দিয়ে ‘সব ঠিক হ্যায়’ বলানো যায় না। চলতি আন্দোলনের এটাই শিক্ষা। আর সাফল্য? দীর্ঘ টালবাহানা সত্ত্বেও ইস্তফা দিতে বাধ্য হলেন মোদির আশীর্বাদপুষ্ট শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রীর ১২ বছরের শাসনে সবচেয়ে বড়ো পরাজয়। সেইসঙ্গে মোক্ষম শিক্ষা হল সর্বগ্রাসী গেরুয়া শক্তির। প্রতিষ্ঠিত হল, শাসক নয়, এখনও এদেশে শেষ কথা বলে জনগণই, যার সামনে মোদি থেকে ইন্দিরা গান্ধী যুগে যুগে রাষ্ট্রপ্রধানরা মাথা ঝোঁকাতে বাধ্য হয়েছেন। 

Advertisement

কথা ছিল, চলতি বাদল অধিবেশনে দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন অর্জন ও সেই সুবাদে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশের উৎসবে পরিণত করবে শাসক বিজেপি। সেই লক্ষ্যে যাবতীয় আয়োজন ছিল সারা। কাড়া নাকাড়া নিয়ে তৈরি ছিল সাজানো বাজনদাররাও। এক সপ্তাহ কাটতে চলল সেই গুড়ে বালি! কোথা থেকে উড়ে এসে আরশোলারা মোদিজির সাজানো বাগান তছনছ করতে উদ্যত। আইনসভায় সরকারের নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা থাকলেই সংসদে সড়কে রাজপথে আন্দোলনের মৃত্যু হয় না। এটাই সার্বভৌম ভারত ও ৭৬ বছরের সংবিধানের অন্তর্নিহিত শক্তি। সেই জরুরি অবস্থার সময় থেকে শুরু করে। নিট পরীক্ষা বাতিল নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চেয়ে যুব সমাজের নাছোড় বিক্ষোভ মিছিলে তা আর একবার প্রমাণিত। নিঃশব্দে বদলে দেওয়ার বিপ্লবে শেষ কথা বলে জনগণই। শাসক সেখানে নিমিত্ত মাত্র! বলবান সময় সব হিসাব উলটে দেয় নির্মমভাবে।
নরেন্দ্র মোদি বসে বসে দেখলেন আন্দোলন কাকে বলে। ২১টা রাজ্যে গালভরা ডবল ইঞ্জিন, তবু তাঁর ১২ বছরের শাসনে দেশ উত্তাল। প্রতিবাদের ঝড় দিল্লির সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে মুম্বই, পাটনা, লখনউ, কলকাতা হয়ে দেড়শো শহরের আনাচেকানাচে। সেই অভিঘাতে ১২ বছরের শাসনকালে একটাও সাংবাদিক সম্মেলন না করা প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত চাপে পড়ে মধ্যরাতে বেনজির আশ্বাস দিচ্ছেন সুবিচারের। নিতান্ত বাধ্য হয়েই। পেপার লিকের ঘটনায় আরও কঠোর আইন আনার, ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচারের প্রতিশ্রুতিতেও ছাত্ররা দাবি থেকে সরতে নারাজ। গত ১২ মে নিট পরীক্ষা বাতিল হয়, ২১ জুন পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের কাজও সম্পূর্ণ। আর প্রধানমন্ত্রী ছাত্র সমাজকে আশ্বস্ত করছেন ২৩ জুলাই মধ্যরাতে চাপে পড়ে। কী বলবেন? আন্দোলন না হলে কি এটুকও হত? মন্ত্রিসভা ছেড়ে যেতে বাধ্য হতেন উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী? মোদিজির আশ্বাসে ২৬ দিনের অনশন তুলে নিয়েছেন শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুক। কিন্তু তাতেও আন্দোলন থামার লক্ষণ নেই, বরং তা আরও ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে। ক্রমশ প্রধানমন্ত্রীর দিকে আঙুল উঠতেই আর শিক্ষামন্ত্রীকে বাঁচাতে পারলেন না মোদি-অমিত শাহ জুটি। শুধু মন্ত্রীর ইস্তফাতেই আন্দোলন থামবে না, পেপার লিকের দোষীদের কঠোরতম শাস্তি চাই অবিলম্বে। ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলবে না।
দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে আজকের প্রধানমন্ত্রী সব বিচারে অতিক্রম করেছেন বলে প্রায়শই দাবি করেন গেরুয়া পণ্ডিতরা। কটাক্ষ করেন কথায় কথায়। কিন্তু নেহরুজি তাঁর কার্যকালে ১৯০টি সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন। ইন্দিরাজি ৪২টা। ‘দুর্বল’ মনমোহন ১১৪টি, আর মোদিজি শূন্য। শক্তিশালী বলে কি সাংবাদিকদের সামনে আসতে নেই! যা বলব সব একতরফা, পালটা প্রশ্নের সুযোগ নেই। আরও আগে শিক্ষামন্ত্রীকে সরালে সরকারের মাথায় কী এমন আকাশ ভেঙে পড়ত? মুখ পুড়ত? এতটা টালবাহানার পর দাবি মানল মোদি সরকার, বার্তাটা কি খুব ভালো গেল! 
কথায় বলে, হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেল্ফ। মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রায় ৩০ বছর আগের একটি ঘটনা। সেখানে প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে পথে নেমেছিলেন আজকের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী! সালটা ১৯৯৭। তখন কংগ্রেস শাসিত ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জানকীবল্লভ পট্টনায়ক। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধেও ওঠে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ। ভুবনেশ্বরে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের কয়েক কিলোমিটার দূরে বিক্ষোভে বসেন হাজার দেড়েক ছাত্র-ছাত্রী। তাঁদের নেতৃত্ব দিয়ে রাতারাতি শিরোনামে উঠে আসেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। আজকের মতোই প্রবল অস্বস্তিতে পড়ে কংগ্রেস সরকার। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য ছিল, কোনো অবস্থাতেই এর দায় এড়াতে পারে না জানকী পট্টনায়ক সরকার। সেই থেকেই তিন দশক পেরিয়ে ওড়িশায় প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করে কলিঙ্গ বিজয়ের প্রধান কারিগর ধর্মেন্দ্র প্রধানই। আজীবন আরএসএসের দক্ষ সংগঠক এবং প্রচারক। শুধু ওড়িশাই নয়, বিহারে লালু এবং নীতীশের প্রভাব মুছে গেরুয়া উত্থানেরও নেতৃত্বে ছিলেন তিনিই। দলের অন্যতম ভোট কৌশলী। বিহার, ওড়িশার বাইরে হরিয়ানাতেও তিনিই ছিলেন দলের প্রচারের দায়িত্বে। বিজেপির আঞ্চলিক রাজনীতির ভারসাম্যে তাই ধর্মেন্দ্র প্রধানের গুরুত্ব কম নয়। নিছক হিন্দি বলয়ের দল থেকে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ জয়ের নেপথ্য কারিগরকে সহজে পদচ্যুত করতে রাজি ছিল না মোদি সরকার। অমিত শাহদের ভয়, শিক্ষামন্ত্রীকে সরালে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েও একই দাবি উঠতে বিশেষ সময় লাগবে না, তেমনি জাতীয় শিক্ষা নীতি নিয়ে ওঠা বিতর্কও আরও তীব্র হবেই। এর কারণ ধর্মেন্দ্রজির নেতৃত্বেই নয়া শিক্ষানীতি কার্যকর করার রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষক সমাজের একটা বড়ো অংশ প্রথম থেকেই সরব। ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদি সরকার যে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি গড়ে গুরুত্বপূর্ণ নিট পরিচালনার ভার তুলে দিয়েছেন তার নেপথ্যেও সেই ধর্মেন্দ্র প্রধানই। যদিও জন্মলগ্ন থেকেই এই নয়া এজেন্সি এনটিএ শুধু বদনামই কুড়িয়েছে। চব্বিশ সালেও নিটের প্রশ্ন ফাঁসের কলঙ্ক এনটিএ’র মাথায়। নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ গৌরবময় ১২ বছরের শাসনকালে চারবার সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। সরকার কর্ণপাত করেনি। এর কারণ আত্মসন্তুষ্টি। কিন্তু এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোদিজির বোঝা উচিত ছিল, যুব সমাজ রাজনীতির প্রচলিত পথে চলে না। তাঁদের আবেগ নিয়ে খেললে সরকারের সর্বনাশ নিশ্চিত।  
রাজ্যে রাজ্যে অপারেশন লোটাস করে সংসদ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। দুই তৃতীয়াংশ সমর্থন পেলেই সংবিধানকে ইচ্ছামতো বদলে দেওয়ার ক্ষমতা হাতে আসে। সেই উৎসব উদযাপনেরই প্রহর গুনছিল বাদল অধিবেশন। তখন কে জানত ছাত্রদের মনে এত ক্ষোভ জমা হয়েছিল ভিতরে ভিতরে। বিন্দুমাত্র আভাসটুকুও পায়নি বশংবদ গোয়েন্দারা। সরকারের কেষ্টবিষ্টু, মহামান্য দোভাল সাহেব, কেউ টের পাননি। প্রেশার কুকারের উপরের ছিদ্রটা এঁটে টাইট করে বন্ধ করে দিয়ে রাজ্যে রাজ্যে অপারেশন লোটাসের কুনাট্যের যা অনিবার্য পরিণতি! এই পরিস্থিতি সরকারের পক্ষে খুব স্বস্তির নয়। সংসদের বাদল অধিবেশন শুরুর দিনে দলে দলে নিরস্ত্র জেন জি’র ঢল রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলে। দাবি একটাই, বিচার পাইনি, বিচার দাও! বিচার চাইছে ছাত্র যুবক তরুণ তরণী। কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল রাজধানীর সীমানা বরাবর। এভাবে কাঁপিয়ে দেয়নি সংসদের গেট থেকে দিল্লির রাজপথ। আন্না হাজারের অনশনও দেখেছে দিল্লি। ১৫ বছর আগে। মনমোহন সিং জমানায়। সেখানে এত ছাত্র-যুবক-তরুণের ভিড় ছিল না। এবার কিন্তু বাদল অধিবেশনের শুরুটাই হল ঝড় নিয়ে। সংসদভবনের গেট বন্ধ করে। এই রোষ এবং তার পরিণতি দেখে কি টনক নড়বে নরেন্দ্র মোদি সরকারের? নাকি ‘এত গোলযোগ আর সয় না’ বলে পাশ ফিরবে শাসক! এই ক্ষোভ যদি বাড়তে থাকে তাহলে তথাকথিত বিরোধী নেতানেত্রীদের ম্যানেজ করেও খুব স্বস্তিতে থাকতে পারবে না বিজেপি। বিপদ সংকেত কিন্তু জানান দিচ্ছে এখন থেকেই। সাধারণ তরুণ তরুণী থেকে যুব সমাজ, যাদের চাকরি নেই। কর্মসংস্থান শিকেয়। ব্যবসা লাটে! অগণিত যুবক যুবতীর ভবিষ্যৎ নষ্ট। জেন জি যে দেশে ফুঁসতে থাকে সেখানে সরকার শুধু পাটিগণিতের সংখ্যার জোরে সুরক্ষিত থাকতে পারে? যন্তরমন্তরের বাঁধ ভাঙা বিক্ষোভ এবং শাসকের নির্দেশে পুলিশের অমানবিক লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, অস্ত্র উঁচিয়ে নিরস্ত্র যুবক যুবতীদের দিকে ছুটে যাওয়া প্রমাণ করল শাসক বদলায়, তাঁর রং পালটে যায়, কিন্তু কোথাও অস্বস্তি দেখলেই বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়ার ঝোঁক বদলায় না কিছুতেই। একদিন না একদিন সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ফেটে বেরয় ঠিকই। আপাত নিস্তব্ধতার আড়ালে ধিকিধিকি জ্বলছে যুবসমাজের সেই রোষ। এখানে সোনাম ওয়াংচুক, অভিজিৎ দিপকে কিংবা গীতাঞ্জলি আংমো উপলক্ষ্য মাত্র। সরকারকে অবিলম্বে সমাধান দিতে হবে। ছাত্র-যুবর ক্ষোভ যদি কমানো না যায় তাহলে মোদিজির বিকশিত ভারতের স্বপ্ন অচিরেই মাঠে মারা যাবে। স্নো পাউডার মাখিয়েও ইতরবিশেষ হবে না। 
মোদি সরকারের কাছে একটাই আবেদন, ছাত্র- যুবদের শক্তিকে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন ছোটো করে দেখবেন না। জেন জি’র শক্তিতেই বাইশে শ্রীলঙ্কা, চব্বিশে বাংলাদেশ এবং পঁচিশে নেপালে পালাবদল ঘটে গিয়েছে মাত্র কয়েকদিনের আন্দোলনে। আমরা নৈরাজ্য যেমন চাই না, তেমনি স্থবির শাসকও না-পসন্দ! বিরোধীদের কেনা ছেড়ে তরুণ সমাজের বুকের স্পন্দন শোনার চেষ্টা করুন মোদিজি। অন্যথায় সব জয় করেও স্বস্তি পাবেন না, পরিণতি হবে ভয়ংকর! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ