তাজপুর আউট, দাদনপাত্রবাড় ইন। গত কুড়ি বছর ধরে রাজ্যে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প নির্মাণের বিষয়টি কুমির ছানার মতো বের করেছিল বিগত দুই সরকার। বাম আমলে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৬ সালে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগরে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির পরিকল্পনার কথা প্রথম শোনে রাজ্যবাসী। সেই প্রস্তাবের অপমৃত্যুর প্রায় এক যুগ পর আসরে নামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। তখন জানানো হয়, পূর্ব মেদিনীপুরের তাজপুরে সেই স্বপ্নের প্রকল্প গড়ে উঠবে। শেষপর্যন্ত রাজ্যে তৃণমূল সরকারের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তাজপুরের প্রকল্পও বাতিল বলে ঘোষণা করল নতুন বিজেপি সরকার। ফলে রাজ্যের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ পরিকল্পনার নতুন গন্তব্য হল, তাজপুর থেকে ১০ কিমি দূরে দাদনপাত্রবাড়। নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণায় আবার নতুন করে আশায় বুক বাঁধতে চলেছে বঙ্গবাসী। গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি হলে তার লাগোয়া রেল-সড়ক যোগাযোগ, ওয়্যারহাউস তৈরির জন্য কয়েক হাজার একর জমির প্রয়োজন। তা না হলে প্রকল্প লাভজনক হতে পারে না। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, তাজপুরে সেই জমি ছিল না। কিন্তু দাদনপাত্রবাড়ে সরকারের হাতে ১৭০০ একর জমি আছে। প্রকল্পের জন্য এই জমি কাজে লাগানো হবে। কেন্দ্র রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প নির্মাণের পর রাজস্বও ভাগাভাগি হবে দুই সরকারের মধ্যে। নিঃসন্দেহে এ এক ভালো উদ্যোগ।
ঘটনা হল, এরাজ্যে কোনো গভীর সমুদ্র বন্দর নেই। আছে কলকাতা ও হলদিয়া বন্দর, যা মূলত নদী বন্দর। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নদী বন্দর জব চার্ণকের আমলে আদর্শ হলেও এখনকার বিচারে যথেষ্ট নয়। আজকের দিনে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে গভীর সমুদ্র বন্দরের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এরাজ্যে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর হলে তা শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির পাশাপাশি পড়শি নেপাল, ভুটানের জন্যও একটি প্রধান সমুদ্রপথের প্রবেশদ্বার হিসাবে কাজ করতে সক্ষম হবে। গভীর সমুদ্র বন্দরে জলের গভীরতা অনেক বেশি হওয়ায় ভারী, বেশি মালবাহী বড়ো জাহাজ নোঙর করতে পারবে। এতে পরিবহণ খরচ ও সময় দুইই বাঁচবে। পাশাপাশি বন্দর সংলগ্ন অঞ্চলগুলিতে নতুন শিল্প, ওয়্যারহাউস, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হবে। সৃষ্টি হবে হাজার হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ। যা জরুরি। বিগত সরকারের দেওয়া তথ্য বলছে, তাজপুরে সমুদ্র বন্দর নির্মাণ হলে ২৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হত। কর্মসংস্থান হত ১ লক্ষ ২৫ হাজার মানুষের। দাদনপাত্রবাড়ে প্রস্তাবিত নতুন সমুদ্র বন্দর নির্মাণ হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
যদিও গত দু’দশকে সেই সমুদ্র বন্দর নির্মাণের কাজ শুরুই করতে পারেনি রাজ্যের আগের দুই সরকার। বাম আমলে সাগরে প্রস্তাবিত প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় ‘ভোর সাগর’। এই প্রকল্প-প্রস্তাবটি কেন্দ্র-রাজ্য টানাপোড়েন, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, পরিবেশ মন্ত্রকের ছাড়পত্র না পেয়ে কার্যত কাজই শুরু করতে পারেনি। অথচ কথা ছিল, কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি হবে। নানাবিধ বাধায় শেষপর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিল না হলেও থমকে যায়। তৃণমূল সরকারের তাজপুর প্রকল্প অবশ্য বাতিল বলেই জানিয়ে দিয়েছেন নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী। যদিও তাজপুরের প্রকল্পটিও কেন্দ্রের সঙ্গে যৌথভাবে করার পরিকল্পনার কথা শোনা গিয়েছিল প্রথমে। পরে মমতা জানিয়েছিলেন, রাজ্য একাই এই প্রকল্প করবে। তারও পরে মত পালটে জানানো হয়, প্রকল্পটি হবে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে। সেইমতো ২০২২ সালের অক্টোবরে বিজয়া দশমীর চা-চক্রে তাজপুর বন্দর তৈরির ইচ্ছাপত্র বা বরাত আদানি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেয় মমতার সরকার। যেকোনো কারণেই হোক, তারা কোনো কাজ শুরু না করায় এই চুক্তি বাতিল করে ২০২৩-এর নভেম্বরে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে নবান্ন। তাতে অবশ্য কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে তাজপুর প্রকল্পের সেখানেই অপমৃত্যু ঘটে। কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, এবার নতুন মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাজপুরের প্রকল্পটি পূর্বতন সরকারের ‘অপরিকল্পিত’ পদক্ষেপ ছিল। কারণ এই প্রকল্প করতে হলে যে পরিমাণ জমি দরকার, তাজপুরে তা ছিল না। সেখানে প্রকল্প হলে তা লাভজনক হত না। সব মিলিয়ে তাই গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ নিয়ে গভীর প্রশ্ন রয়েই গিয়েছে। একটি প্রকল্প নিয়ে বারবার ব্যর্থতার যে নজির তৈরি হয়েছে, আশা করা যায়, এবার আর তার পুনরাবৃত্তি হবে না। গুজরাত থেকে ওড়িশা পর্যন্ত উপকূলবর্তী রাজ্যগুলিতে গভীর সমুদ্র বন্দর থাকার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের যে সুবিধা তারা পাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ নিশ্চয়ই সেই লক্ষ্যেই পৌঁছে যাবে। নতুন সরকারের কাছে নতুন আশা রাজ্যবাসীর এটাই। এবার ডবল ইঞ্জিনের সুবাদে আশা করা যায় আর কোনো গভীর প্রশ্নের উদয় হবে না।