তন্ময় মল্লিক: নগরায়নের জেরে ভেঙেছে যৌথ পরিবার। একইভাবে ভারতবর্ষে ‘বিজেপি-আয়নে’টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে দেশের আঞ্চলিক দলগুলি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বভারতীয় সভানেত্রী থাকাকালীনই তাঁর চোখের সামনে ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গেল তাঁরই হাতে গড়া দল। আপাত দৃষ্টিতে এটা তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্ব মনে হলেও অনেকেই মনে করছেন, কলকাঠি নাড়ছে বিজেপি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনে পর্যুদস্ত একটা দলকে ভাঙার জন্য বিজেপি এত মরিয়া কেন? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশে একদলীয় শাসন কায়েমই বিজেপির লক্ষ্য। বিরোধীরা যাতে ঘুরে দাঁড়াতে না পারে তারজন্য তাদের কোমর ভেঙে দিতে চাইছে। বাংলায় চলছে তারই মহড়া।
তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙনে অনেকে বাংলায় ‘মহারাষ্ট্র মডেলে’-এর ছায়া দেখছেন। কিন্তু, একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, বাংলার সঙ্গে মহারাষ্ট্রের ঘটনার তেমন মিল নেই। ২০২২ সালে মহারাষ্ট্রে যখন শিবসেনা ভেঙেছিল তখন বিজেপি ছিল বিরোধী দল। রাজ্যের ক্ষমতায় ছিল শিবসেনা। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বাল থ্যাকারের ছেলে উদ্ধব থ্যাকারে। উদ্ধব কংগ্রেসের সঙ্গে সখ্য বাড়াচ্ছেন অভিযোগ তুলে বিদ্রোহ করেছিলেন একনাথ সিন্ধে। তিনিই আসল শিবসেনা বলে দাবি করেছিলেন। দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক তাঁর সঙ্গে থাকায় সিন্ধেই হয়ে যান আসল শিবসেনা। বিজেপির সমর্থনে সিন্ধেই হয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী। এখন কিন্তু সেখানে বিজেপির সরকার। আর সিন্ধে সেই সরকারের শরিক।
শিবসেনাকে ভাঙানো এবং সিন্ধেকে মুখ্যমন্ত্রী করার গোটা পরিকল্পনাটি যে বিজেপির ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ তখনও ছিল না, এখনও নেই। অভিযোগ, উদ্ধব থ্যাকারকে সরিয়ে সিন্ধেকে মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য বিজেপির বিপুল টাকা খরচ হয়েছিল। ‘ঘোড়া’পিছু নাকি দামও উঠেছিল প্রচুর। তবে, তৃণমূল কংগ্রেসকে ভাঙার জন্য তাদের এক পয়সাও খরচ হয়নি। কারণ এখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বসেছে বিজেপি। সরকার চালাতে অন্য কোনো দলের বিধায়কের সমর্থন দরকার নেই। তা সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেসকে ভাঙতে মরিয়া বিজেপি। তবে, তার সব দায়টা বিজেপিকে দিয়ে লাভ নেই। যেভাবে সিংহভাগ তৃণমূল বিধায়ক শাসক দলের ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য ছটফট করছেন তাতে যেকোনো দলই এই পরিস্থিতির সুযোগ নিত।
তিন তিনবার রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় থাকা একটা দল নির্বাচনে হেরে যাওয়ার এক মাসের মধ্যে এভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, এমনটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এই মুহূর্তে বিরোধী দলের সামনে হকার উচ্ছেদ, বুলডোজার সংস্কৃতি আমদানির বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। কিন্তু, মানুষের স্বার্থে আন্দোলন না করে নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে ব্যস্ত তৃণমূল বিধায়করা। কারা প্রকৃত তৃণমূল সেই নিয়েই চলছে দড়ি টানাটানি। সঙ্গে কাদা ছোড়াছুড়িও।
তৃণমূলের মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আছেন সাধারণ তৃণমূল কর্মী-সমর্থক। কিন্তু তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় সংখ্যা নেই। আর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের কাছে আছে সংখ্যা। কিন্তু মানুষ আছে, এমনটা এখনই জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। তাঁরা প্রত্যেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ঝুলিয়ে নির্বাচনে জিতেছেন। তাই সংখ্যার জোরে বিধানসভায় ‘আসল তৃণমূল’বলে নিজেদের প্রমাণ করলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাশে চাইছেন। কারণ তাঁরা জানেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্ব কতটা। অভিযোগ, ইতিমধ্যেই ‘আসল তৃণমূল’টিমের কয়েকজন বিধায়ক তাঁদের ভুল বুঝিয়ে সই করানো হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
বিধানসভায় যাঁরা প্রকৃত তৃণমূল বলে দাবি করছেন, তাঁদের এখনও অগ্নিপরীক্ষা হয়নি। সংখ্যার জোরে ঋতব্রতবাবু বিরোধী দলনেতা। কিন্তু, তিনি যে বিজেপি বিরোধী, তার প্রমাণ তাঁকে দিতে হবে। বাংলার এই প্রজন্মের মানুষ বিরোধী নেতা বা নেত্রী হিসাবে দু’জনকে দেখেছে। একজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যজন শুভেন্দু অধিকারী। বিরোধীনেত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কতটা ভয়ঙ্কর, সেটা সবচেয়ে ভালো জানে সিপিএম। তৃণমূলের আমলে কোনো অঘটন ঘটলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলতেন, ‘এই ইস্যুটা বিরোধী নেত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেলে শাসক দলের রাতের ঘুম কেড়ে নিতেন।’
শুভেন্দুবাবুও বিরোধী দলনেতা হিসাবে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। যখনই রাজ্যে কিছু ঘটেছে তখনই সেখানে ছুটেছেন। এবার ঋতব্রতবাবুকে পালন করতে হবে সেই বিরোধীনেতার ভূমিকা। সেটা ঠিকমতো করতে পারলে মানুষ বুঝবে, যোগ্য লোকই বিরোধীনেতা হয়েছেন। আর ব্যর্থ হলে মানুষের চোখে তিনি হয়ে যাবেন ‘বিজেপি স্পনসর্ড’বিরোধী দলনেতা।
রাজনীতিতে দলবদল বা ‘ঘোড়া’কেনাবেচা নতুন কিছু নয়। সরকার গড়ার ও বিরোধী দল ভাঙার জন্য ‘ঘোড়া’কেনাবেচা হয়। একুশে ব্যাপকহারে দল বদল দেখেছিল বাংলা। সেবার ক্ষমতায় আসার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের তাবড় তাবড় নেতার কাছে বিজেপির ‘ওপেন অফার’ ছিল। অনেকেই সেই ‘টোপ’গিলে বিজেপিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু, এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উলটো।
তৃণমূল ক্ষমতা থেকে চলে যেতেই দলের কিছু বিধায়ক ও সাংসদ বিজেপির সঙ্গে ‘সম্পর্ক’গড়ে তুলতে রীতিমতো হ্যাংলামি শুরু করেছেন। অনেকেই বিজেপির ‘গুড বুকে’ঢুকে পড়ে হয়রানি এড়াতে চাইছেন। কারণ গোটা রাজ্যে একধার থেকে তৃণমূলের ব্লকের নেতা থেকে প্রাক্তন বিধায়ক গ্রেপ্তার হচ্ছেন। যে সমস্ত অভিযোগে তাঁদের জেলে ভরা হচ্ছে, তা যে কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধেই আনা যায়। যদিও এখনও পর্যন্ত তৃণমূলের কোনো ‘রানিং এমএলএ’গ্রেপ্তার হননি। কিন্তু, হবেন না, তেমন গ্যারেন্টি নেই। সেই ‘গ্যারেন্টি’পেতেই বিজেপি ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য লাফালাফি শুরু হয়েছে।
এসব দেখে অনেকে বলছেন, বাংলার ‘ঘোড়া’যে সহজলভ্য, সেটা দিল্লির বিজেপি নেতারা একুশের নির্বাচনেই বুঝেছিলেন। তখন গেরুয়া শিবিরের অন্দরে একটা প্রচার হয়েছিল, সরকার গড়ার জন্য দেড়শো আসন দরকার নেই। একশোর বেশি সিট পেলেই বাংলায় সরকার গড়বে বিজেপি। কিন্তু, একশো টপকাতে না পারায় বিজেপি হাত বাড়ায়নি। তবে বিরোধী দলনেতার প্রশ্নেই যেভাবে তৃণমূলটা ভেঙে গেল তাতে মনে হচ্ছে, বিজেপি চাইলে ৭৭টি আসন নিয়েই একুশে রাজ্যের ক্ষমতা দখল করে নিতে পারত।
তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে যাওয়ায় সবচেয়ে লাভবান হয়েছে বিজেপি। এরাজ্যে ক্ষমতায় এলেও সাংগঠনিকভাবে বিজেপি এখনও ততটা শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল নয়। তাই ‘ভালো তৃণমূলী’দের জন্য দরজা খোলার কথা ভেবেছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। মুখে সেকথা বলেও ছিলেন। কিন্তু, তৃণমূল ভেঙে যেতেই তিনি ‘ব্যাক গিয়ার’ দিয়েছেন। ‘ভালো তৃণমূলী’দের আশার গুড়ে বালির বদলে শমীকবাবু ফেলে দিয়েছেন ‘বোল্ডার’।
২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের সময় কংগ্রেস-শূন্য ভারত গড়ার ডাক দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। তারপর কখনো আচ্ছে দিনের স্বপ্ন দেখিয়ে, কখনো জাতীয় ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে জিতেছে বিজেপি। কিন্তু, চব্বিশে কোনো ‘বালাকোট’ছিল না। তাই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি বিজেপি। এর অর্থ, নরেন্দ্র মোদি সরকারের জনপ্রিয়তা কমছে। শরিক দলের উপর নির্ভর করে সরকার চালাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। অথচ এই মুহূর্তে দেশের চারটি বাদ দিয়ে সমস্ত রাজ্যে ক্ষমতায় আছে বিজেপি। কোথাও প্রধান শাসক দল হিসাবে, কোথাও বা শরিক দল হিসাবে। বিজেপি যেখানে দুর্বল সেখানে প্রথমে জোট করে সরকারের শরিক হয়। তারপর সেখানে বিজেপিই হয়ে যায় প্রধান শাসক। এটাই বিজেপির কৌশল।
বিজেপির এজেন্ডায় আছে, ‘এক দেশ এক ভোট’। কিন্তু আসল লক্ষ্য, ‘এক দেশ এক ভোট এক দল।’ অর্থাৎ দেশে বিজেপি ছাড়া অন্য কোনো দল থাকবে না। টানা তিনবার কেন্দ্রের ক্ষমতায় বিজেপি। ফলে বাড়ছে ‘অ্যান্টি ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টর’। মোদি সরকারের প্রতি মানুষের মোহভঙ্গ হচ্ছে। কিন্তু, বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ নয়। তাই চব্বিশেও কোনোরকমে সরকার গড়েছে বিজেপি। এই পরিস্থিতিতে এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের একটাই পথ, অবিজেপি রাজ্যের মানুষের সামনে শাসক দলের ত্রুটি তুলে ধরে দখল করতে হবে ক্ষমতা। বাংলা দখল হয়ে গিয়েছে। এখন চলছে বিরোধীদের কোমর ভাঙার কাজ।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ অমান্য করে ৫৮জন বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভায় বিরোধীনেতা করায় অনেকেই বলছেন, ‘তৃণমূল শেষ’। হয়তো তাঁরা ঠিক বলছেন, কিন্তু রাজনীতি তো সম্ভাবনার শিল্প। তাই আর একটু অপেক্ষা করতে পারতেন। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনটা দেখে উপসংহারটা টানলেই বোধহয় ভালো করতেন।