Bartaman Logo
২৬ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ছাত্র-যুবশক্তির জয়

দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলনের ফলে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলেন। সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিস্তারিত পড়ুন।

ছাত্র-যুবশক্তির জয়
  • ২৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশজুড়ে প্রবল ছাত্র আন্দোলনের চাপে শেষপর্যন্ত নতিস্বীকার করলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধমেন্দ্র প্রধান। যৌবনের বজ্রনির্ঘোষ হুংকারের কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হল স্বঘোষিত ‘বিশ্বগুরু’র সরকার। স্বাধীনতার পর শিক্ষা সুরক্ষার দাবিতে এমন ছাত্র আন্দোলন দেখেনি এই দেশ। যে আন্দোলন টলিয়ে দিল শিক্ষামন্ত্রীর আসন। পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। শনিবার সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের প্রস্তাবিত তৃতীয় বৈঠকের আগেই সমাজমাধ্যমে নিজের পদত্যাগের কথা জানান তিনি। উল্লেখ্য, গত প্রায় এক মাস ধরে নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে পথে নেমে আন্দোলন চালাচ্ছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। যত দিন গড়িয়েছে আন্দোলনের ঝাঁঝ তত বেড়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকেন সিজেপি নেতৃত্ব। অবশেষে এল তাদের জয়। তাদের কাছে এ যেন এক ‘ঐতিহাসিক’ মুহূর্ত। জয় হল গণতান্ত্রিক আন্দোলনেরও। যদিও প্রথমে দেশব্যাপী ছাত্র-যুব আন্দোলনে রাশ টানতে কেন্দ্রীয় সরকার চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। দমনপীড়নের চেষ্টা চালিয়েও নাছোড় ছাত্রদের বশে আনা যায়নি। মৌনতা ভেঙে শেষপর্যন্ত আসরে নামতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা রুখতে কড়া পদক্ষেপের নানা সিদ্ধান্তের কথাও ঘোষণা করেন তিনি। কিন্তু ককরোচ পার্টির অন্যতম প্রধান দাবিটিই ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। সেটাই হল। ক্ষুব্ধ ছাত্র-যুবশক্তি একজোট হলে কী করতে পারে তা দেখল দেশবাসী। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় যে কাজ রাজনৈতিক দলগুলি করতে পারে না, তাই করে দেখাল দেশের যুবশক্তি। যে আন্দোলনকে প্রথমে মোদি সরকার প্রথমে গুরুত্বই দেয়নি, ২০ জুলাই থেকে দিল্লির যন্তরমন্তরে তা অন্য মাত্রা পেতেই নড়েচড়ে বসেন প্রধানমন্ত্রীসহ শাসকগোষ্ঠী। কোণঠাসা মোদি সরকার প্রথমে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পরিবর্তে উচ্চ শিক্ষাসচিবকে সরিয়ে নিট পরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) থেকে এক ধাক্কায় ৪৭ জন আধিকারিককে বরখাস্ত করে। প্রশ্ন ফাঁস রুখতে কঠোর বিল আনার ঘোষণা করে এবং তিন মাসের মধ্যে মামলার দ্রুত বিচারে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচারের কথা জানিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু অনড় আন্দোলনকারীদের তাতে দমানো যায়নি। সরকারের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপ ঘোষণা নিয়েও বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়। ছাত্র ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, রাজ্যে রাজ্যে, এমনকি বিদেশেও। অবশেষে নতিস্বীকার। আন্দোলনকারী ককরোচদের সব ক’টি দাবি মানতে বাধ্য হয় মোদি সরকার। ছাত্ররা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সরকারের ব্যর্থতার নানা দিক। প্রশ্ন হল, এর থেকে আদৌ কি কোনো শিক্ষা নেবে সরকার? প্রশ্ন উঠছে, কারণ আন্দোলনরত ছাত্রসমাজ যেখানে গোটা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সিস্টেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যেখানে কয়েকটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার কথা বলে কেন্দ্র আসলে সব কিছু ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। লক্ষণীয় বিষয় হল, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর ছাত্রসমাজ ক্ষোভে ফুঁসতে থাকলেও এই সরকার প্রায় ৩৬ দিন নির্বিকার ছিল। ককরোচদের আন্দোলনে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সরকার নড়েচড়ে বসে। যে পদক্ষেপ অনেক আগেই করা দরকার ছিল তা কেন করা হয়নি সংগতকারণেই সেই প্রশ্ন উঠছে। 

Advertisement

প্রথমত, পদক্ষেপ হিসাবে কেন্দ্রীয় উচ্চশিক্ষা সচিব বিনীত যোশীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁকে নিয়েও বিতর্ক ছিল। অভিযোগ, তাঁর পরিবর্তে নরেশ পাল গাঙ্গোয়ার নামে কেন্দ্রীয় পশুপালন ও ডেয়ারি দপ্তর থেকে যাঁকে নতুন উচ্চশিক্ষা সচিব করা হয়েছে— তাঁর বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। রাজস্থান ক্যাডারের এই আইএএস অফিসার ও তাঁর পরিবার কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রকের আওতাধীন জাতীয় উদ্যানপালন পর্ষদ থেকে ১ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা ভরতুকি পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার মানে, একজন ‘বিতর্কিত’ সচিবকে সরিয়ে আরেকজন ‘বিতর্কিত’ আমলাকে সচিব পদে এনে সরকার আসলে ‘প্রহসন’ করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই। পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতার প্রশ্নে সরকারের সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। দ্বিতীয়ত, পুরো খোলনলচে না বদলে এনটিএ থেকে ৪৭ জনকে বরখাস্ত করে নীচুতলার আধিকারিকদের বলির পাঁঠা করা হল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। বারবার সর্বভারতীয় এই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের প্রেক্ষিতে দাবি উঠেছিল, এনটিএকে সরিয়ে দিয়ে নতুন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করার। তৃতীয়ত, প্রশ্নফাঁস রুখতে তড়িঘড়ি বিল আনছে সরকার। ২০২৪-এর আইন কেন ২০২৬-এ বাতিল করতে হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনা হল, ২০২৪-এ প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে প্রমাণাভাবে গত বৃহস্পতিবারই ‘ক্লিনচিট’ দিয়েছে সিবিআই। চতুর্থত, প্রশ্ন হল ছাত্রদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার দায়িত্ব পালনে বারবার মোদি সরকার কেন ব্যর্থ হচ্ছে— সে প্রশ্ন উঠছে। 
প্রত্যাশিতভাবেই, শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফায় আন্দোলনকারীদের উদ্দীপনা তুঙ্গে। মোদি জমানায় কৃষক আন্দোলন সরকারকে চরম অস্বস্তিতে ফেললেও ছাত্র-যুবদের এই আন্দোলন নিঃসন্দেহে এক নজির গড়ল। মোদি সরকার হয়তো ভাবতেও পারেনি নানা কারণে ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা যুবসমাজ জাগলে ঠিক কী কী হতে পারে। এর থেকে কোনো শিক্ষা সরকার নেয় কি না এবার সেটাই দেখার। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ