Bartaman Logo
২৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

তিন মাসেই কেন এত অভিযোগ?

বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগের জেরে রাজ্যে অস্থিরতা বাড়ছে। তিন মাসে কেন এত অভিযোগ উঠল? বিস্তারিত পড়ুন।

তিন মাসেই কেন এত অভিযোগ?
  • ২৫ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: বাঁশে ঘুণ ধরবে। লোহায় মরচে পড়বে। এটা যতটা বাস্তব তারচেয়েও অনেক বড়ো 

Advertisement

সত্যি হল ক্ষমতায় বসলে দুর্নীতি বাসা বাঁধবে। ঘুণপোকা, মরচে, দুর্নীতি খেয়ে নেয় সার অংশ। বাইরের কাঠামো ঠিক থাকলেও দুর্নীতির ঘুণপোকা ভিতরটা ফোঁপরা করে দেয়। বামেদের 
সময় লেগেছিল ৩৪বছর। দেড় দশকেই পাততাড়ি গোটাতে হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসকে। তবে, যে বিজেপি তৃণমূলকে ‘তোলামূল’ বলে কটাক্ষ করে ক্ষমতায় এসেছে তাদের বিরুদ্ধেই উঠছে তোলাবাজির গুচ্ছের অভিযোগ। সাধারণ মানুষ তো বটেই, বিরক্ত দলের নেতানেত্রীরাও। তাঁরা বলছেন, ‘তৃণমূল যেখানে শেষ করেছিল, বিজেপি দু’মাসেই তাকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের একশো দিন পূর্তির আগেই শাসক দলের বিরুদ্ধে কেন এত অভিযোগ!
‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারকে ঘিরে রাজ্যবাসীর প্রত্যাশা অনেক। সেই আশা জাগিয়েছেন বিজেপি নেতারাই। বলেছিলেন, ডবল ইঞ্জিন সরকার হলে সোনার বাংলা গড়ে দেবেন। রাজ্যে কর্মসংস্থান হবে। শ্রমিকদের আর পরিবার ছেড়ে ভিন রাজ্যে যেতে 
হবে না। বছরের পর বছর বন্ধ থাকা চাকরির 
পরীক্ষা চালু হবে। নিয়োগ হবে স্বচ্ছ। বন্ধ হবে তোলাবাজি, খতম হবে সিন্ডিকেটরাজ। বহু প্রতিশ্রুতির মধ্যে দু’টি মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছে। এক, স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রতি বছর নিয়োগ। দুই, বন্ধ হবে তোলাবাজি, সিন্ডিকেটরাজ।
তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে বিপুল সংখ্যক সামাজিক প্রকল্প চালু হয়েছিল। কোটি কোটি মানুষ বছরের পর বছর সেই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু, সামাজিক প্রকল্পের উপভোক্তাদের কাছ থেকে কাটমানি নেওয়ায় তৃণমূলের ক্ষতিও হয়েছে বিস্তর। নিজের হকের টাকা থেকে নেতাকে ভাগ দিতে বাধ্য হওয়ায় ব্যাপক ক্ষোভ জন্মেছিল। সমব্যথীর মতো প্রকল্প থেকেও কাটমানি নিতে অনেক তৃণমূল নেতার হাত কাঁপত না। আর প্রোমোটার ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে কামাত লক্ষ লক্ষ টাকা। এমনকি, বাড়ির পুরানো পাঁচিল প্লাস্টার করার জন্যও কাউন্সিলারদের দিত হত টাকা। না হলেই কাজ বন্ধ। তোলাবাজি আর কাটমানিতে বিরক্ত তৃণমূলের লোকজনকেও বলতে শোনা গিয়েছে, ‘একবার পালটেই দেখা যাক না, কী হয়!’
সরকার পালটেছে। কিন্তু, কাটমানি, তোলাবাজির সংস্কৃতি কি বদলেছে? তোলাবাজি নিয়ে পাণ্ডবেশ্বরের বিজেপি বিধায়ক জিতেন্দ্রনাথ তেওয়ারির উপলব্ধির কথা শোনা যাক তাঁরই মুখে। জিতেন্দ্রনাথবাবুর বক্তব্য, ‘১৫ বছর শাসন করার পর তৃণমূল নেতারা যেমন গুন্ডা হয়েছিল দু’মাসের মধ্যে আমাদের লোকেরা তারচেয়েও বড়ো গুন্ডা হওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের কর্মীরাই সাধারণ মানুষের বাঁচা কঠিন করে দিয়েছে। কিছু নেতা কালেকশন মাস্টার হয়ে উঠেছে। ওরা(তৃণমূল) মাসে ইসিএলের চারটি কোয়ার্টার দখল করত। এখন আমাদের লোকেরা সপ্তাহে চারটি দখল করছে।’
এখানেই শেষ নয়। জিতেন্দ্রনাথবাবু বলেছেন, ‘দু’ মাসের মধ্যে মানুষ আপনাদের ভয় পেতে শুরু করেছে। যারা ভোটের আগে দু’ হাজার টাকা খরচ করলে ফোন করে বারবার চাইত, এখন তারাই ৫০হাজার টাকা খরচ করে ফেলছে। কিন্তু, আমার কাছে টাকা চাইছে না। কোথা থেকে আসছে এই টাকা?’ জিতেন্দ্রনাথবাবু প্রকাশ্য সভায় আরও 
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রশাসনিক কাজে পার্টির নেতাদের হস্তক্ষেপ নিয়েও তিনি সুর চড়িয়েছেন। প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আপনারা কেন দায়িত্ব নিচ্ছেন?’
জিতেন্দ্রনাথবাবু আদি বিজেপি নন। আগে 
তিনি তৃণমূলের মেয়র ও বিধায়ক ছিলেন। মেয়র থাকাকালীন তাঁর কাজকর্ম নিয়েও অনেক অভিযোগ আছে। অবশ্য এখন তিনি বিজেপির বিধায়ক। তবে, নব্য বিজেপি বলে তাঁর কথাগুলি উড়িয়ে না দিয়ে গুরুত্ব দিলে লাভ হবে বিজেপিরই। একথা ঠিক, রাজ্যের প্রায় সর্বত্র বিজেপি দলের লোকজন ডেপুটেশন দেওয়ার নামে সরকারি কাজে খবরদারি করছেন। ডিম খাওয়ার ভয়ে বহু অফিসার 
মেনেও নিচ্ছেন। তবে, মেনে নেওয়ার আরও একটি কারণ আছে। প্রত্যেকেই প্রভাবশালী নেতা অথবা মন্ত্রীর নাম নিচ্ছেন। তাঁরা কত ঘনিষ্ঠ তার ছবিও অফিসারদের দেখাচ্ছেন। 
মাত্র তিন মাসেই পরিস্থিতি এমন একটা জায়গায় গিয়েছে যে পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এনিয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন। মানুষকে সতর্ক করতে ভিডিও বার্তা পোস্ট করেছেন। অগ্নিমিত্রা বলেছেন, ‘অভিযোগ আসছে, আমার নাম করে বাজার থেকে টাকা তোলা হচ্ছে। আপনারা এক্সটরশন বলতে পারেন, কাটমানি বলতে পারেন, সিন্ডিকেটও বলতে পারেন। মন্ত্রীদের নাম করে টাকা তুললে আমাদের জানান। তবে প্রমাণ মাস্ট। কেউ কাটমানি, গুন্ডাট্যাক্স বাবদ টাকা নিলে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।’ তৃণমূলের পথে হাঁটলে তাদেরও যে পচা ডিম হজম করতে হবে, সেটা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দুর্গাপুরের বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়ও। 
একটা সরকারকে মানুষ ৬০ মাসের জন্য নির্বাচিত করে। কিন্তু, তিন মাস যেতে না যেতেই চারিদিকে কেন ত্রাহি ত্রাহি রব? কেন বারাসাতের কলোনি মোড়ের সেলুনের মালিকের বা বেহালার প্রোমোটারের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা চাওয়া হল? কেন বিজেপির দাবিমতো ২৩ লক্ষ টাকা দিতে না পারায় বর্ধমানের দেওয়ানদিঘির তৃণমূল নেতাকে আত্মঘাতী হতে হল? কেন তোলাবাজির অভিযোগে গোবরডাঙা মণ্ডলের বিজেপি নেতাকে বহিষ্কার করতে হল? তোলাবাজির প্রতিবাদ করায় কেন বর্ধমানের বিজেপি নেতা মনোজ চক্রবর্তীর বাড়িতে হামলা হল? ক্ষমতায় বসার ১০০দিনের মধ্যে এতগুলি ‘কেন’-র মুখে কোনো শাসক দলকে পড়তে হয়েছে কি না, জানা নেই। তবে, প্রশ্ন ওঠার কারণ খতিয়ে দেখতে হবে। নিতে হবে ব্যবস্থা। তা না হলে মানুষ হতাশ হবে। কারণ এই সরকারকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা বিপুল। আর প্রত্যাশা পূরণ না হলেই জন্মায় হতাশা। 
বালি এখন অগ্নিমূল্য। বিজেপি বলত, ‘তৃণমূল নেতাদের কাটমানির জন্যই বালির দাম আগুন। আবাস যোজনার উপভোক্তারা ঘর করতে পারছেন না। বালির দাম কমাতে হবে’। একথা ঠিক, বালির দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচুর ক্ষোভ ছিল। সেটা বুঝেই ক্ষমতা বদলের পর বিজেপি নেতারা প্রশাসন ও ঘাট মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে বালির দাম বেঁধে দিলেন। কম দামে বালি পেলে বাড়ির কাজটা শেষ হবে, এই আশায় উপভোক্তারা খুশিও হলেন। কিন্তু, ফল হল উলটো। তৃণমূলের আমলে এক ট্রাক্টর বালির দাম ছিল সাড়ে তিন হাজার টাকা। এখন তার দাম হয়েছে সাত হাজার। এর বিহিত করতেই হবে। কারণ মানুষ রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে স্বস্তি পাওয়ার জন্য। বালির দাম ডবল দেওয়ার জন্য নয়।
ক্ষমতায় বসেই বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপ করেছে সরকার। কিছু বিষয় নিয়ে বির্তক থাকতেই পারে। কিন্তু, সরকার যে ঩কিছু কিছু ব্যাপারে ভীষণ কড়া, সেটা মানুষ বুঝেছে। এর পাশাপাশি তোলাবাজি, চাঁদার জুলুম থেকেও মানুষকে রেহাই দিতে হবে। তারজন্য নিতে হবে কড়া পদক্ষেপ। দেরি করলেই বাড়বে বিপদ। কারণ বিড়াল মারতে হয় প্রথম রাতেই। 
তবে, দুর্নীতি দমন মৌখিক নাকি আন্তরিক, তা নিয়ে বিজেপির কর্মীদের মধ্যেই সংশয় তৈরি হচ্ছে। অভিযোগ পেলে নেতৃত্ব ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সেটা বলা যাবে না। কিন্তু, বেশ কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্তের বদলে অভিযোগকারীকেই শাস্তি দেওয়া হচ্ছে! বর্ধমান শহরের ৪নম্বর মণ্ডলের আদি বিজেপি নেতা মনোজকুমার চক্রবর্তীর অভিজ্ঞতা অন্তত তেমনটাই। তিনি দলেরই এক নেতার বিরুদ্ধে বালিখাদ সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে তোলাবাজির নালিশ জানিয়েছিলেন। তার পরিণতি ভালো হয়নি। অভিযুক্ত নেতার পেটোয়া লোকজন রাতের অন্ধকারে মনোজবাবুর বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। বিহিতের আশায় নেতাদের কাছে ছুটেছিলেন মনোজবাবু। কিন্তু, অভিযুক্ত নয়, শাস্তি পেয়েছেন তিনিই। দল তাঁকে সাসপেন্ড করেছে। মনোজবাবুর আক্ষেপ, ‘তৃণমূল আমলে বিজেপি করায় জেল খেটেছি। জরিমানা দিয়েছি। ভেবেছিলাম, বিজেপি ক্ষমতায় এলে অবস্থার পরিবর্তন হবে। সরকারটা পালটালো। কিন্তু, পরিস্থিতি বদলালো না।’
জিতেন্দ্রনাথবাবু ও মনোজবাবু দুই প্রান্তের 
বাসিন্দা। কিন্তু, তোলাবাজি নিয়ে উভয়ের অভিজ্ঞতা এক। ‘না খাউঙ্গা না খানে দুঙ্গা’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। এখন দেখার, বিজেপি ‘অল ইজ ওয়েল’ বলে তৃণমূলের জুতোয় পা গলায়, নাকি 
কড়া ব্যবস্থা নিয়ে বাংলায় সরকার বদলের সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ