সর্ব্বদা একাগ্র ভক্তিসহকারে হরি ও গুরুদেবের সেবার নাম যোগ যজ্ঞ।
বাক্য, মন, শরীর ও কর্ম্মের দ্বারা অহিংসাকে তপোযজ্ঞ বলে।
নানাবিধ উপনিষৎ অভ্যাস স্বাধ্যায় যজ্ঞ বলে কথিত হয়, আর “‘ওম্’ এই আত্মাকে অব্যাকুলচিত্তে (ব্রহ্মাগ্নিতে) অগ্নিতে হোম করার নাম জ্ঞান যজ্ঞ—এ হলো সমস্ত যজ্ঞের উত্তমোত্তম যজ্ঞ।”
প্রণবাদ্যং ন দাতব্যং মন্ত্রং শূদ্রায় সর্ব্বথা।
আত্মমন্ত্রং গুরোর্মন্ত্রং মন্ত্রঞ্চাজপসংজ্ঞকম্।।
স্বাহা-প্রণবসংযুক্তং শূদ্রে মন্ত্রং দদদ্দ্বিজঃ।
শূদ্রোনিরয়মাপ্নোতি ব্রাহ্মণো যাত্যধোগতিম্।।
“প্রণবাদি মন্ত্র শূদ্রকে সর্ব্বপ্রকারে দেওয়া কর্তব্য নহে। স্বীয় উপাসিত মন্ত্র, গুরুদেবের মন্ত্র, হংস মন্ত্র ও স্বাহা প্রণব- সংযুক্ত মন্ত্র শূদ্রকে দান করলে শূদ্র নরকে গমন করে, মন্ত্রদাতা ব্রাহ্মণও অধোগতি প্রাপ্ত হন।”
সাবিত্রীং প্রণবং যজুর্লক্ষ্মীংস্ত্রীশূদ্রো যদি জানীয়াৎ, স মৃতোহধোগচ্ছতি।”
“গায়ত্রী প্রণব যজুঃলক্ষ্মীবীজ ‘শ্রীং’ স্ত্রী শূদ্র যদি জানে মরণের পর অধোগতি লাভ করে।”
কথাটা ঠিক বুঝতে পারিনা। যাতে ব্রাহ্মণের অধিকার আছে স্ত্রী শূদ্রের কোন অধিকার নাই?
স্বয়ং বেদ বলেছেন, এতে কোন যুক্তি তর্ক নাই। যার যেরূপ সামর্থ্য তাঁকে বেদ সেইরূপ অধিকার দিয়ে ভগবৎ পথে চালিত করেছেন। স্ত্রী শূদ্র তো দূরের কথা কেবল প্রণবের অধিকার ব্রাহ্মণেরও নাই।
শিখাং সূত্রঞ্চ গায়ত্রীং গৃহং দারান্ কুমারকান্।
পরিত্যজ্য জপন্ত্যেবং প্রণবং সাঙ্গমুত্তমম্।।
“শিখাসূত্র, গায়ত্রী, গৃহ, দার, পুত্রাদি পরিত্যাগ করে সাঙ্গ উত্তম প্রণব পরমহংস পরিব্রাজকগণ জপ করেন।”
যার যে বীর্য্যে, যে রক্তে জন্ম তাকে তদ্রূপ সাধন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয় নচেৎ মূল কেন্দ্রে উপস্থিত হতে পারে না।
‘ওঙ্কার’ ব্রহ্ম। এর কর্ম্ম হলো বাড়িয়ে দেওয়া। কামী, ক্রোধী, লোভী, যদি ওঙ্কার জপ করে তবে তাদের কাম, ক্রোধ, লোভ বাড়বে।
সগুণ এবং নির্গুণ আমার দুইটি স্বরূপ। মানুষ যখন দেহে অহং অভিমান করে অর্থাৎ ‘আমি দেহ’ এই বোধে আত্মবিস্মৃত থাকে তখন সে আমার সগুণ রূপ উপাসনার অধিকারী।
‘রাম’, ‘কৃষ্ণ’, ‘শিব’, ‘দুর্গা’, ‘গণেশ’, ‘সূর্য্য’ প্রভৃতি আমার সগুণ মন্ত্রের উপাসনা করে।
উপাসক যখন মন প্রাণ সব আমাতে সমর্পণ করে অহরহঃ প্রতি পলে উৎকণ্ঠা স্ফুটিত চিত্তে আমার অপেক্ষা করতে থাকে, ‘হয় তুমি এস, নয় আমাকে নাও’ বলে আকুল হয়ে কাঁদতে থাকে, আমি তখন স্থির থাকতে পারি না।
আমি ছুটে গিয়ে তার চোখের জল মুছিয়ে দিই। বুকে করে নিই, বর দিই।
আমার শরীরে (ভগবৎ বিগ্রহে) তার সে সগুণ মন্ত্র অবসান হয়ে যায়। তার হৃদয়ে ওঙ্কারের আবির্ভাব হয়, তার হৃদয় বীণায় অহরহঃ ওঙ্কার ঝঙ্কৃত হতে থাকে, সে জীবন্মুক্ত হয়। জীবন্মুক্তেরই ওঙ্কারে অধিকার।
“সন্ন্যাসীর মধ্যে কুটীচক, বহূদক ও হংস এরাও গায়ত্রীর অধিকারী। ওঙ্কারের প্রকৃত অধিকারী পরমহংস, তাঁর আর অন্য মন্ত্র উচ্চারণের শক্তি থাকে না।”
ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য—এঁদের বেদে অধিকার আছে, এরা তো ওঙ্কারের অধিকারী?
—এরাও দেহাভিমানী। সামান্যভাবে অর্থাৎ মন্ত্রের আদিতে অন্তে কর্ম্মারম্ভে ওঙ্কার উচ্চারণ করতে পারে।
কেবল ওঙ্কার জপের অধিকার এদেরও নাই।
মোট কথা জেনে রাখ্—যতক্ষণ দেহাভিমান আছে ততক্ষণ ওঙ্কারের অধিকার নাই।
স্ত্রী, শূদ্র চণ্ডালাদি নিম্নবর্ণ—এরাও কি ওঙ্কার লাভ করতে পারেন?
ওঙ্কার হ’ল প্রাণ। ওঙ্কার সকলেই লাভ করে আছে। রাম কৃষ্ণাদি সগুণ মন্ত্র জপে যখন হৃদয়ের মালিন্য দূর হয় তখন ওঙ্কার আত্ম প্রকাশ করেন।
স্ত্রী, শূদ্র ওঙ্কার লাভ করে?
নিশ্চয়ই করে। “নমঃ শিবায়” আদি জপে শূদ্র মান্ত্রব্রাহ্মণ দেহ লাভ করে। স্ত্রী মান্ত্র পুরুষ দেহ, ব্রাহ্মণ দেহ লাভে সমর্থ হয়। তখন ওঙ্কার আবির্ভূত হয়।
—যদি কোন দেহাভিমানী স্ত্রী শূদ্র ওঙ্কার জপ করেন তাঁদের কি হয়?
অধঃপাত হয়।
—ওঙ্কার জপ করেও অধঃপাত হবে?
“যে শাস্ত্রে আমি ওঙ্কার জপে মানুষ কৃতার্থ হয়, ওঙ্কার শ্রেষ্ঠ মন্ত্রবলেছি, সেই শাস্ত্রেই বলেছি—স্ত্রী, শূদ্র ও অধম দ্বিজগণের ওঙ্কারের অধিকার নাই।”
আমার মাথায় লাঠি মেরে যদি কেউ আমার চরণ পূজা করে, সে যে ফল পায়, আর অনধিকারী ওঙ্কার জাপী ঠিক সেই ফল পেয়ে থাকে।
—কি পায়?
“ওঙ্কার ব্রহ্ম; ব্রহ্ম হলেন পরম মহান। যে ভাব নিয়ে যে ব্যক্তি এর সঙ্গ করবে তার সেই ভাব বৃদ্ধি হবে।
কামী ওঙ্কার জপ করলে তার কাম বাড়বে, ক্রোধী জপ করলে ক্রোধ বাড়বে, লোভী জপ করলে লোভ বেড়ে যাবে।
এইরূপ আসুরী সম্পদ বেড়ে গিয়ে তাকে ছাগ, মহিষ, ব্যাঘ্রাদি যোনিতে নিয়ে যাবে।”
ওঙ্কারই শব্দ ব্রহ্ম। ওঙ্কার থেকেই বর্ণসকল, নিখিল শব্দ ও মন্ত্র রাশি, এই অখিল ব্রহ্মাণ্ড উৎপন্ন হয়েছে।
“ওঙ্কার আমি অভিন্ন। ওঙ্কার কুণ্ডলিনী শক্তি। এই কুণ্ডলিনী শক্তি জীবদেহে প্রসুপ্ত সর্পের আকার ধারণ করে নিজ প্রভায় দেদীপ্যমানা হয়ে নিদ্রা যাচ্ছেন। এঁর সকল অবয়ব সংস্থান সর্পের ন্যায়। ইনি বাক্দেবী। ইঁহা হতে সকলের বাক্যস্ফূর্ত্তি হয়। ইনি বর্ণময়ী, সমগ্র বীজমন্ত্র স্বরূপা।”
“এই ওঙ্কার মূলে এক, পরে অধ্যাত্ম, অধিদৈব, অধিভূতরূপে একে তিনের অপূর্ব্ব মিশ্রণে ওঁ তৎ সৎ হয়েছে।”
যেমন কারণব্রহ্মের আট প্রকার প্রকৃতি।
ক্ষিতি, অপ্, তেজ, মরুৎ, ব্যোম, মন, বুদ্ধি, অহংকার—যা’তে কার্য্যব্রহ্ম উৎপন্ন হয়েছে, তদ্রূপ শব্দ ব্রহ্ম ওঙ্কারের আটটি বীজ অষ্ট প্রকৃতি স্বরূপ।
ত্রিদণ্ডী স্বামী মাধব রামানুজ সংকলিত ‘শ্রীশ্রীওঙ্কারসহস্রবাণী’ (২য় খণ্ড) থেকে


