হিমাংশু সিংহ: ক্ষমতা কী বিষম বস্তু ঠেকে শিখছে বাংলার মানুষ। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই রাজ্যপাট এক রেখে নিয়মিত রাজার বদল স্বাস্থ্যকর কি না খতিয়ে দেখছে গড় ভোটার। ঐতিহাসিক পালাবদলের সাড়ে ৪ মাস পর। একটা দল যে কি না এই সেদিনও পুলিশ গুন্ডা তোলাবাজ সব কন্ট্রোল করত, আজ ক্রমে শূন্যের দিকে ধাবমান! মে মাসে গিয়েছিল কুরসি। আর সেপ্টেম্বরে মায় উৎসবের আশ্বিন আসতে না আসতেই না আছে ঐক্যবদ্ধ সেই দল, ঘাসের উপর জোড়াফুলের প্রতীকটাও হাতছাড়া। নতুন প্রতীক ফুটবল পায়ে গোল মুখে সগর্বে দৌড়ের। কিন্তু সোচ্চারে ‘খেলা হবে’ বলার আর কেউ কি আছে আজ এই দুর্দিনে? পুরানো লাঠির দিন গিয়েছে বলেই দেবাংশুদের আর দেখা নেই সব পাওয়ার চৌকাঠে। পার্টিটাই চুরি হয়ে যাওয়ার উপক্রম। একদা গমগম করা হাটের দোচালায় শুধুই রিক্ততার রাগিণী এমন ঝিমধরা সুরে বাজছে যে নন্দীগ্রামের প্রার্থী পর্যন্ত মনোনয়ন পেশ করেও আজকের মুখ্যমন্ত্রীর আশ্রয় পেতে ভাগলবা! রেজিনগরেও টানাপোড়েন তুঙ্গে।
অগত্যা অসহায় মমতা বাধ্য হয়ে নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের কথা জানাতেই তিনিও গ্রেপ্তার। বলি হচ্ছেটা কী! রাজা চেয়েছেন, তাই ১৯ বছরের পুরানো মামলা খুঁচিয়ে টেনে এনেছে পুলিশ দম ফেলারও আগে। সামান্য চোর ধরতে না পারা পুলিশ এব্যাপারে সব জমানাতেই সমান দক্ষ ও তৎপর। তবু তাঁকে আজ আর দলদাস বলব না! বহু ব্যবহারে আজ শব্দটা ক্লিশে। বদলে যাওয়া নয়া শাসক রাগও করতে পারেন! কিন্তু না লিখলেই সত্যটা আগের মতো এখনও মিথ্যা হয়ে যায় না! জনগণ উৎসবের আগমনি কাশফুল ছেড়ে শাসকের আস্ফালন, ধমক আর সাবধানবাণী শুনছে দু’চোখ ভরে। দুর্ভাগ্য এটাই! সঙ্গে ফাউ মোক্ষম নীতিশিক্ষা! সব এক থাকে বদলে যায় শুধু চরিত্রগুলো যুগে যুগে!
তৃণমূল মাত্র ৪ মাস আগের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত হলেও ৪১ শতাংশ ভোট পায় এবং ৮০টি আসন জেতে। একুশে বিজেপির আসন সংখ্যা থেকে তিনটি আসন বেশি। এসআইআর সত্ত্বেও প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬১ লক্ষ। মাত্র ৩২ লক্ষ ভোট বেশি পেয়েছিল জয়মাল্য গলায় পরা বিজেপি। কিন্তু এখন ভোট হলে? নিরপেক্ষ ভয়হীন ধমক চমক ছাড়া নিস্তরঙ্গ বঙ্গে। বাংলার রাজনীতিতে সেটাই এই মুহূর্তে কোটি টাকার প্রশ্ন! বদলের বাংলাতে যেমন তোলাবাজি বিদায় নেয়নি। দাদাগিরির মরণ হয়নি। বেছে বেছে ডিম কার্নিভাল দেখেছে মানুষ। আর দেখেছে দল ভাঙার নির্মম খেলা শাসকের প্রশ্রয়ে। তেমনি শাসক যেই থাকুন, উপনির্বাচনে ভোট হয় না সেই বদনাম এবারও নন্দীগ্রাম, রেজিনগরেও ঘুচবে না। ঘুচতে পারে না। শাসকের আইনের মতোই শাসকের দম্ভ ও ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে রেকর্ড মার্জিনে জয় উপনির্বাচনের নির্মম দেওয়াল লিখন। ওটা সেই সুদূর বাম জমানা থেকেই সমান দস্তুর! অমিত শাহের সোনার বাংলাতেও তার অন্যথা হওয়ার জো নেই!
এগারোতে পালাবদলের পর বামেদের ভোট নেমে এসেছিল চার থেকে ছয় শতাংশে। কোথাও আবার তার চেয়েও কম। মমতারও গত তিন দশকের বঙ্গ রাজনীতি ঘিরে গড়ে তোলা চকমিলান দালান, উঠোন-সিঁড়ি, কয়েক হাজার বিশ্ববাংলার ‘ব’, সব তছনছ এই কারণেই। নতুন কেয়ার গিভার খুঁজে নিচ্ছে সবাই, কবি থেকে কুস্তিগির। টলিউড থেকে উঠতি ব্যবসায়ী। নেত্রীর প্রতীক বদলে গিয়েছে ফুটবল খেলোয়াড়ে, বিদ্রোহীরা পেয়েছেন খাম। দল দু’টুকরো, তিন টুকরো...। এনসিপিআই বনে যাওয়াদের অবস্থা আরও শোচনীয়। ওই যে বললাম, এক সময় বাজারে বাসস্ট্যান্ডে যে স্লোগানে কান ঝালাপালা হত সেই ‘খেলা হবে’ বলে উচ্চকিত চিৎকারের লোকও আজ বাড়ন্ত, অত লাউড স্পিকারও লাগাবে কে? সবাই হিসাবে ব্যস্ত গেরুয়া না ঋত নাকি কালীঘাট? যে দিকে খুশি চলে যেতেই পারি এই ভয়হীন ভরসার বাংলায়! কিন্তু কোথায় যাব?
রাজ্যের সংখ্যালঘু ও মহিলা ভোট কোনদিকে যাবে, তার কোনো দিশা নেই আপাতত। কেউ জানে না প্রতীক মামলার স্থায়ী নিষ্পত্তি হবে কবে? আগামী ঊনত্রিশ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে যদি এর নিষ্পত্তি না হয়, অন্তর্বর্তী নির্দেশের জোরে প্রতীক ঝুলেই থাকে তাহলে না রহেগি বাঁশ, না বাজেগা বাঁশরি। বাংলার বিরোধী রাজনীতির পরিণতির কথা জানতে অপেক্ষা করা ছাড়া পথ নেই। মনে রাখতে হবে, ইতিহাসের মতোই রাজনীতিতে একই নির্মম স্ক্রিপ্ট কিন্তু ফিরে ফিরে আসে। আর সব হারানো দাম্ভিক শাসকের আর্তনাদ শোনে মন দিয়ে। বদলে যায় প্রেক্ষিত, স্থান বদল করে শুধু পাত্রপাত্রী কুশীলবরা। শিল্প হোক আর নাই হোক, রুটিরুজির সন্ধানে যুব সমাজের ভিনরাজ্যে পলায়ন সহজে বন্ধ হওয়ার নয় সবাই জানে। বিভাজনের সংস্কৃতিতে এর বেশি উদার প্রগতিশীলতা আশা করাও অন্যায়। তাহলে এতকিছুর পরও পড়ে রইল কী?
সম্ভবত সেই কারণেই জয় করেও ভয় কিছুতেই যাচ্ছে না নির্বাচিত শাসকের। সবটা চাই, প্রতিপক্ষ বলে কিচ্ছুটি থাকবে না। এটাই শাসকের শঙ্কা, কৈশোরের ভীরু প্রেমের মতোই ভোটে পাওয়া জনসমর্থনও যেন কাউকে কিছু না জানিয়েই চকিতে বাতাসে মিলিয়ে না যায়! সেই কারণেই হীনবল বিরোধীদের টুকরো টুকরো করার প্রক্রিয়াও শুরু হয় পরদিন থেকেই। নিন্দুকে বলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্গে দিল্লির বঙ্গভবনে শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যাহ্নের সেই নাটকীয় সাক্ষাতের অবসরেই নাকি চূড়ান্ত হয়েছিল তৃণমূল ভেঙে মমতাকে নির্বান্ধব করে জোড়াফুল প্রতীক কেড়ে নেওয়ার নির্মম ব্লুপ্রিন্ট। দীনদয়াল উপাধ্যায় ভবনের সেই আতঙ্ক থেকেই বিজেপির সিগনেচার টিউন বাজতে শুরু করেছে বাংলায়। রাজ্যে দখলদারি দীর্ঘস্থায়ী করতে শুধু ভোট জেতাই নয় প্রধান প্রতিপক্ষকে আড়াআড়ি ভেঙে দেওয়াও খুব জরুরি অনুষঙ্গ। আরও জরুরি দলীয় বিবাদের অজুহাতে জনপ্রিয় প্রতীকটাকেই ফ্রিজ করে দেওয়ার আদর্শ মহল তৈরি করা। অধিকাংশ আঞ্চলিক দল আজ ঘোর পারিবারিক কাঠামো থেকে উঠে আসা। উত্তর থেকে দক্ষিণ সর্বত্র এই একই জিনিস চলছে। মহারাষ্ট্রে উদ্ধবের বিরুদ্ধে একনাথ সিন্ধেকে শুধু লড়িয়ে দিয়েই বিজেপি শান্ত থাকেনি। তির ধনুক প্রতীকও উদ্ধব থ্যাকারের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। শারদ পাওয়ার বনাম প্রয়াত অজিত পাওয়ারের বিরোধের প্রধান লক্ষ্যই দু’টি দলের কোর ভোটব্যাংককে ধ্বস্ত করে দেওয়া। সেখানেও প্রতীক যুদ্ধের বলি বিরোধীরা। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গিয়েছে বিহারে চিরাগ পাসোয়ান বনাম পশুপতি কুমার পরশের লড়াইতেও। উত্তরপ্রদেশে অখিলেশের বিরুদ্ধে কাকা শিবরাজকে নামানোর চেষ্টাও হয়েছে বারবার। জরুরি অবস্থার পর গাই-বাছুর থেকে ইন্দিরা কংগ্রেসের প্রতীক বদলে হয় হাত। আজ সেটাই কংগ্রেসের প্রতীক।
তৎপরতা দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে, ভোটে অভাবনীয় সাফল্যের পরও মমতা ভীতি দূর হয়নি গেরুয়া নেতৃত্বের। তাঁরা জানে তৃণমূলের অপশাসন ও সীমাহীন লুটতরাজের বিরুদ্ধে রায় দিলেও রাজ্যের মানুষের মনের এই অবস্থা কতদিন স্থায়ী হবে বলা কঠিন। এর সবচেয়ে বড়ো কারণ প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার অদ্ভুত নেশা ও তার বিচিত্র চলন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটের যে সিংহভাগ গত নির্বাচনে বিজেপি ঘরে তুলেছিল তা কি পদ্মেই আটকে থাকবে, না সরবে? গেলে কোথায় যাবে? বিজেপি জানে যেসব প্রতিশ্রুতি ও উপর থেকে নীচ সুশাসনের কথা বলে দল ক্ষমতায় এসেছিল তা একশো শতাংশ পূরণ করা কঠিনই নয়, প্রায় অসম্ভব। মানুষ কিন্তু ঊনত্রিশ সালের লোকসভা ভোটেই হিসাবের খাতা মেলাতে বসবে। আর সোনার বাংলার গন্ধ আর অদ্ভুত সেই আলোর খোঁজ করবে।
একথা মানতেই হবে বিগত নির্বাচনে বাংলার মানুষ মমতাকে নানা কারণে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু তা বলে ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি ঘাসফুলের প্রতীককে সামনে রেখে বাংলার মাটিতে যে লড়াই দিয়ে গিয়েছেন, তা একটা ভোটে মিথ্যে হয়ে যায় না। আজকের মুখ্যমন্ত্রী ও তার পরিবারের উত্থান ও সাফল্যও ওই জোড়াফুল প্রতীককে অবলম্বন করেই। এ কথা অস্বীকার করবে কে? বলতেই পারেন তৃণমূলের জন্মের অনেক আগে থেকেই কাঁথির অধিকারী পরিবার রাজনীতিতে। কংগ্রেসের ছত্রছায়ায়। কিন্তু আপনাকে গেরুয়া নেতারা চিনেছে তৃণমূলের দাবাং নেতা এবং মমতার প্রধান সৈনিক হিসাবেই। ওই প্রতীকের জোরে মমতার রাজনৈতিক কেরিয়ার যেমন সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছায়, তেমনি শুভেন্দুও জাতীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সবিনয়ে প্রশ্ন করি, মমতাকে ফুলহারা করে দেওয়ার এই যন্ত্রণা কি শুধু কালীঘাটের টালির চালাতেই সীমাবদ্ধ। এ যন্ত্রণা কি কাঁথির অধিকারী পরিবারেও একবারও অনুরণন তুলবে না। একটা দীর্ঘশ্বাস! একবার মনে হবে না এতদ্বারা বাংলার রাজনীতিতে বিরোধী পরিসরটাকেই গোড়া থেকে উপড়ে ফেলার অধ্যায়ের শুরু হল।
এই প্রতীক হারানোর শূন্যতা কি ঋতব্রত শিবিরেও থমকে থাকা একটা গাছের পাতাকেও নড়াবে না? মাত্র গত এপ্রিলে জোড়াফুল প্রতীকেই এরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবং সিপিএম বহিষ্কার করার পর সেদিন মমতা জায়গা না দিলে কোথায় যেতেন তৃণমূল পরিষদীয় দল ভাঙার কেন্দ্রীয় চরিত্র বীর যোদ্ধা। আইনস্টাইনের কাছে? রাজনীতি বড়ো নিষ্ঠুর। মানবিকতা সৌজন্য গরম রক্ত এসব শরীরে থাকলে রাজনীতির হীন সংসারে তালি বাজে না!
বেশ বোঝা যাচ্ছে, বিজেপির টার্গেট ঊনত্রিশ সালের লোকসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে সিংহভাগ আসন দখল করা। সেক্ষেত্রে আর পাঁচটা রাজ্যে আসন কমলেও বাংলার সাফল্য ড্যামেজ কন্ট্রোলে সাহায্য করবে। অন্যদিকে তৃণমূল পুরোপুরি ডেসিমেটেড হয়ে গেলেও সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে যাবে তা নিঃসন্দেহে বড়ো প্রশ্ন। যদি টিএমসির দু’ভাগ, কংগ্রেস এবং সিপিএমের মধ্যে রাজ্যের ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হয় তার ফায়দা তুলবে বিজেপি। তাই ভোট ভাগের জন্য দল ভেঙে যত পারো টুকরো টুকরো করো।
মোদিজি ৭৫টা বসন্ত পার করে ৭৬-এ পা দিয়ে বিকশিত ভারত ২০৪৭’য়ের দিকে এগিয়ে চলেছেন দৃপ্ত ভঙ্গিতে। চার দিকে লক্ষ লক্ষ প্রদীপ। উন্নয়ন। কে না জানে চিরকাল প্রদীপের নীচেই নিকষ অন্ধকার। বেশ বোঝা যাচ্ছে বিকশিত ভারতের যাত্রাপথেও মূল বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে বহুধা বিভক্ত করাই আজ শাসকের প্রধান এজেন্ডা। তাই প্রদীপ প্রজ্বলনের রাতেই বাংলার প্রধান প্রতিপক্ষ প্রতীক হারিয়ে অসহায়!
ইতিহাসই বারবার শিখিয়েছে গণতন্ত্রে অসহায়তা থেকেই নতুন সম্ভাবনার জন্ম হয়। রাজনীতির নতুন বাঁকেই শাসক ও বিরোধীর আত্মপ্রকাশ কালের ধর্ম!