তন্ময় মল্লিক: উপনির্বাচন নিয়ে মানুষের সাধারণত তেমন কোনো আগ্রহ থাকে না। রাজ্যে যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের জয়ের সম্ভাবনাই সাধারণত বেশি থাকে। উলটোটা ঘটে না, তেমনটা নয়। তবে, সেটা ব্যতিক্রম বলেই ধরা হয়। এই উপনির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলার ক্ষমতা বদলাবে না। তবুও ‘খুঁটি’র নাকি ‘শিরদাঁড়া’ কার জোর বেশি তা দেখার জন্য আগ্রহ ছিল রাজ্যবাসীর। কিন্তু, নির্বাচন কমিশন ১৫ বছর রাজ্য শাসন করা তৃণমূল কংগ্রেসের জোড়াফুল প্রতীক ‘ফ্রিজ’ করে দিয়ে তাতে জল ঢেলে দিল। দেশের অধিকাংশ মানুষ ভোট দেয় প্রতীক দেখে। তাই নির্বাচনি লড়াইটা যত এক দলের সঙ্গে অন্য দলের, ঠিক ততটাই প্রতীকের সঙ্গে প্রতীকের। প্রতিষ্ঠিত দলের সেই প্রতীকই যদি কেড়ে নেওয়া হয় তাহলে নির্বাচনটা হয়, কিন্তু লড়াইটা থাকে না।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছিল বিজেপি। রাজ্যের ৪২টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছিল ১৮টি। তৃণমূল সংখ্যায় বেশি আসন পেলেও একুশে ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় অধিকাংশ নেতা ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতি বদলে দিয়েছিল তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন। একটি ছিল মহুয়া মৈত্রের ছেড়ে যাওয়া করিমপুর। অন্য দু’টি বিজেপির দখলে থাকা খড়্গপুর ও কংগ্রেসের জেতা উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ। উপনির্বাচনে তিনটিতেই জিতেছিল তৃণমূল।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, খড়্গপুর ও কালিয়াগঞ্জ আসনে তার আগে কোনো দিন তৃণমূল জেতেনি। ২০১৯ সালের উপনির্বাচনে তৃণমূল জেতায় শাসক দল পেয়েছিল একুশের নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ানোর অক্সিজেন। ১৬ হাজারে হারা আসনেও উপনির্বাচনে শাসক দলের ৬৫ হাজার ভোটে জেতার রেকর্ড আছে। আবার দখলে থাকা আসনে শাসকের পরাজয়ের নজিরও এই বাংলাতেই রয়েছে। সাগরদিঘি। তবে, ট্র্যাক রেকর্ডের নিরিখে সাগরদিঘিকে ‘ব্যতিক্রমী’ হিসাবে দেখা হয়। সাগরদিঘিতে শাসক দলকে হারাতে এককাট্টা হয়েছিল বিরোধীরা। কিন্তু, ৬ অক্টোবর হতে চলা উপনির্বাচনে হচ্ছে তার সম্পূর্ণ উলটো।
ছাব্বিশের নির্বাচনে মূল লড়াইটা ছিল তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে। ফলে শাসক বিরোধী ভোট খুব একটা ভাগাভাগি হয়নি। কিন্তু, নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরের উপনির্বাচনে বিরোধীরা বহুভাগে বিভক্ত। সিপিএম, কংগ্রেস তো আছেই। এছাড়াও নন্দীগ্রামে আছে আইএসএফ এবং রেজিনগরে হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি। উপনির্বাচনে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর কারা বেশি ভোট পেল, সেই নিয়েই ছিল আকর্ষণ। কিন্তু, প্রতীক ‘জোড়াফুল’ কেড়ে নেওয়ায় উপনির্বাচনটাই যেন ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে গেল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তৃণমূল কংগ্রেসের দুই শিবিরেরই নামও পরিবর্তন হয়ে গেল।
নন্দীগ্রাম আসনে লক্ষাধিক ভোটে বিজেপিকে জেতানোর ডাক দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একথা ঠিক, বিজেপির ‘অ্যাডভান্টেজ’ বেশি। বিপুল শক্তি নিয়ে ক্ষমতায় বসেছে বিজেপি। নন্দীগ্রামে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রায় সমস্ত পার্টি অফিস বন্ধ। এতদিন যাঁরা তৃণমূলের হয়ে ভোট করাতেন, তাঁদের প্রায় কেউই ময়দানে নেই। নন্দীগ্রামে তৃণমূলের মূল শক্তি সংখ্যালঘু ভোট। সেই ভোট ভাগাভাগি করার জোর চেষ্টা চলছে জোরকদমে। প্রার্থী দিয়েছে আইএসএফ। ‘ভালো’ তৃণমূলও সংখ্যালঘুকে প্রার্থী করেছে। জমি আন্দোলনের পীঠস্থান নন্দীগ্রামে অস্তিত্ব সংকটে ভোগা বামেরাও মাটি ফিরে পেতে চাইছে। ফলে বিরোধী ভোট ভাগাভাগির যাবতীয় উপাদান রয়েছে মজুত।
এই সমস্ত কারণে নন্দীগ্রামে বিজেপি অনেকটাই এগিয়ে। তবে যতটা ভোট পাবে বলে আশা করছে ততটা নাও হতে পারে। তার প্রধান কারণ জমি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার সুবাদে শুভেন্দু অধিকারী যে সুবিধা পেতেন এবার নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী সেটা পাবেন না। বিজেপি এবার দুষ্কৃতীদের গুলিতে মৃত চন্দ্রনাথ রথের মা হাসি রানি দেবীকে প্রার্থী করেছে। সন্তানহারা মা হিসাবে অবশ্যই তিনি সহানুভূতি পাবেন। কিন্তু, প্রতিবন্ধকতাও কম নেই। নন্দীগ্রামে প্রার্থীর দৌড়ে ছিলেন বিজেপির দু’ তিনজন দাপুটে নেতা। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব হাসি রানি দেবীকে চণ্ডীপুর থেকে তুলে এনে দাঁড় করানোয় তাঁদের বাড়া ভাতে ছাই পড়েছে। তারজন্য কেউ অবশ্য প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেননি। সেই পরিস্থিতিও নেই। কিন্তু, তাঁরা চাপ না খেলে এই নির্বাচনটা আন্তরিকভাবে করাবেন, এমনটা আশা করা বোধহয় ঠিক হবে না।
তবে, নন্দীগ্রাম নয়, উপনির্বাচনের মূল আকর্ষণ রেজিনগর। রেজিনগর হুমায়ুন কবীরের গড় বলে পরিচিত। মাত্র চার মাস আগে এই আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন হুমায়ুন। তিনি বিজেপি প্রার্থীকে ৫৮ হাজার ৮৭৬ ভোটে হারিয়েছেন। তৃণমূল তৃতীয় স্থানে। হুমায়ুনের সঙ্গে তৃণমূলের ভোটের ব্যবধান ছিল ৮১ হাজার ৮১৮টি। আর কংগ্রেস পেয়েছিল মাত্র ৪ হাজার ১০১টি ভোট। ব্যবধান ছিল ১ লক্ষ ১৯ হাজার ৪৩৫।
রাজ্যে পালা বদলের পর মুর্শিদাবাদ জেলার রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে যাওয়ায় পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদ স্তরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মুর্শিদাবাদ জেলার তিনজন সাংসদ তৃণমূল ছেড়ে দেওয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দিশেহারা। অনেকেই নিজেদের গদি বাঁচানোর জন্য কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। তাতে কংগ্রেস যেমন কিছুটা শক্তি অর্জন করেছে তেমনি দুর্বল হয়েছে তৃণমূল। ফলে এবারও রেজিনগরে মূল লড়াই হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টির সঙ্গে বিজেপির বলেই রাজনৈতিক মহল মনে করছে।
এবার এই আসনের উপনির্বাচনে হুমায়ুন কবীর তাঁর ছেলে গোলাম নবি আজাদকে প্রার্থী করেছেন। বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন প্রাক্তন জেলা সভাপতি শাখারভ সরকার। কালীঘাট তৃণমূল রবিউল আলম চৌধুরীকে ফের রেজিনগরে ফিরিয়ে এনেছে। ‘ভালো’ তৃণমূল প্রার্থী করেছে এনসিপিআই সাংসদ আবু তাহেরের ভাগ্নে সফিউজ্জামান শেখ ওরফে হাবিব মাস্টারকে। জেলায় ডাকাবুকো নেতা হিসাবে হাবিব মাস্টারের নামডাক আছে। শোনা যাচ্ছে, তিনি দাঁড়াতে চাননি। বাধ্য হয়েছেন। এই কেন্দ্রে আরও দু’ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী আছেন। কংগ্রেসের আবদুল্লাহিল কাফি। সিপিএমের মহম্মদ সৈয়দ। এখানেও শরিকি সংঘাত। বিকাশচন্দ্র মিশ্রকে প্রার্থী করেছে আরএসপি।
রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ভোটারের ৭২ শতাংশ সংখ্যালঘু। বাকি ২৮ শতাংশ হিন্দু ভোটার। এই কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত দলগুলি যাঁদের প্রার্থী করেছে তাঁদের মধ্যে মাত্র দু’ জন হিন্দু, বাকি সবাই মুসলিম। প্রায় প্রত্যেক সংখ্যালঘু প্রার্থীই জেলা রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবশালীও। ফলে সংখ্যালঘু ভোট ভাগের সম্ভাবনা প্রবল। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি করছেন শাখারভবাবু। বিশেষ পরিচিত মুখ। জেলা সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন। রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে হিন্দু ভোটের বড়ো অংশ তাঁর দিকেই যাবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। তবে, তাতেও বিজেপির জেতা কঠিন। কারণ সংখ্যালঘুরা বিজেপিকে ভোট দেবে, এমনটা বোধহয় তাঁরাও মনে করেন না। সেক্ষেত্রে বিজেপির জেতার একটাই রাস্তা হুমায়ুন কবীরের ভোট ব্যাংকে আঘাত হানা। সংখ্যালঘু ভোট টানা নয়, ভাঙাই বিজেপির টার্গেট।
একথা ঠিক, ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে বাবরি মসজিদকে ঘিরে সংখ্যালঘুদের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি হুমায়ুন প্রচার করেছিলেন, বিজেপি বা তৃণমূল যে দলই সরকার গড়ুক না কেন, তাঁর সাহায্য লাগবে। তাঁর দলের হাতেই থাকবে সরকার গড়ার চাবিকাঠি। সংখ্যালঘুদের অনেকে তা বিশ্বাসও করেছিলেন। সেই কারণে তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটের বড়ো অংশ হুমায়ুনের দিকে গিয়েছিল। তবে শুধু ছাব্বিশেই নয়, তার আগেও কয়েকটি নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে, রেজিনগরে হুমায়ুনের একটা নিজস্ব ভোটব্যাংক আছে। উপনির্বাচনে শাসক দল তার কতটা ভাঙতে পারবে, তার উপরেই নির্ভর করছে শাখারভের ভাগ্য।
অনেকে বলছেন, নির্বাচন কমিশন তৃণমূলের জোড়াফুল প্রতীক ‘ফ্রিজ’ করায় লাভ হল হুমায়ুনের। তৃণমূলের নাম নিয়ে যাঁরা দাঁড়িয়েছেন তাঁদের প্রতীক চেনাতে হবে। কিন্তু হুমায়ুন কবীরকে সেটা করতে হবে না। সেই কাজটা তিনি বিধানসভা নির্বাচনেই সেরে ফেলেছেন।
মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙা কেন্দ্রের মুসলিম ভোটার ৬২ শতাংশ। ছাব্বিশে এই আসনে জয়ী হয়েছে বিজেপি। তার কারণ সংখ্যালঘু ভোট বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে। সেইজন্য মাত্র ৩১ শতাংশ ভোট পেয়েও জয়ী হয়েছে বিজেপি। এবার বিজেপির টার্গেট ৭২ শতাংশ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রেজিনগর।
শুধু কৌশলের জোরে এই আসন জেতা প্রায় অসম্ভব। প্রয়োগ করতে হবে সব রকম শক্তি। সেই ক্ষমতা এখন বিজেপির আছে। মুসলিম অধ্যুষিত রেজিনগর জেতার জন্য বিজেপি কি সেই ঝুঁকি নেবে, নাকি বাংলায় অশান্তির ভোটের ট্র্যাডিশন বদলাতে সচেষ্ট হবে? তাই ভোটে হার-জিত নয়, এই উপনির্বাচনে বাংলার ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রথম ভোটে হবে তারই পরীক্ষা।