পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে বেশ কয়েকবার। বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসানের পর ২০১১ সালে আসে তৃণমূল কংগ্রেসের ‘পরিবর্তনের’ সরকার। মাঝে ১৫ বছরের ব্যবধান। আবার পালাবদল হয়েছে বঙ্গে। ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। শাসকের পতাকার রং বদলালেও, রাজ্যের শিক্ষাঙ্গন থেকে কি ‘দলতন্ত্রের’ অভিশাপ দূর হয়েছে? সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে উত্তর একটাই হতে পারে—‘না’। বামফ্রন্ট আমল থেকে শুরু করে তৃণমূল হয়ে বর্তমানে বিজেপির শাসনকাল—শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা একই ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে সুপরিকল্পিতভাবে দলীয়করণের সূচনা হয়েছিল বামফ্রন্ট আমলে। সেই সময় ‘অনিলায়ন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট-সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে প্রাথমিক স্কুলের পরিচালন সমিতি পর্যন্ত পার্টির ক্যাডার ও অনুগতদের বসানোর একটি সুচারু কাঠামো তৈরি করা হয়। ২০১১ সালে শাসনক্ষমতা পরিবর্তনের পর অনেকে ভেবেছিলেন, এবার বোধহয় দমবন্ধ করা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা মুক্তি পাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উলটো ছবি। পূর্বতন শাসকদল তৃণমূলের আমলে দলতন্ত্র শুধু বজায় থাকেনি, তা দুর্নীতি ও চরম বিশৃঙ্খলার রূপ নেয়। কলেজের গভর্নিং বডির প্রধান পদে বসানো হতে থাকে শাসক দলের সাংসদ, বিধায়ক থেকে শুরু করে প্রভাবশালী নেতাদের। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তি বা বিতর্কিত চরিত্রদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ দায়িত্বে বসানো হয়। ছাত্র ভরতি, শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল পরিচালনা— সর্বত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা ও দুর্নীতির প্রকাশ্য দাপট দেখেছে রাজ্যবাসী।
বর্তমানে বিজেপির জমানাতেও শিক্ষা ব্যবস্থাকে রাজনীতি-মুক্ত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তব চিত্র তার চেয়ে আলাদা। সম্প্রতি রাজ্যের ২৪৭টি কলেজের গভর্নিং বডি বা পরিচালন সমিতির তালিকা প্রকাশ হতেই ফের সেই পুরানো দলতন্ত্রের কঙ্কালসার রূপটিই প্রকাশ্যে এসেছে। দেখা যাচ্ছে, কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ, সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ফর উইমেন, নেতাজিনগর ডে কলেজ কিংবা সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের পরিচালন সমিতির প্রধান হিসাবে বসানো হয়েছে বিজেপির জেলা সভাপতি, পরাজিত প্রার্থী বা রাজ্য স্তরের সংগঠকদের। এমনকি জেলাগুলিতেও চিত্রটা এক—পূর্ব মেদিনীপুরের ১৬টি কলেজের মধ্যে ১৩টিতেই দলের বিধায়ক ও সাংসদদের সভাপতি করা হয়েছে। আবার নন্দীগ্রামের কলেজের দায়িত্ব পেয়েছেন স্থানীয় বিজেপি মণ্ডল সভাপতি। এই চরম দলীয়করণের সমর্থনে প্রশাসনের তরফ থেকে যে যুক্তি সামনে আনা হচ্ছে, তা আরও অদ্ভুত। উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য— ‘রাজনীতিকদের দিয়েই শিক্ষাঙ্গন রাজনীতিমুক্ত হবে’। এই কথাটি শুধুমাত্র একটি স্ববিরোধী বক্তব্য নয়, শিক্ষাঙ্গনের স্বাধিকারের উপর চরম আঘাতও বটে। দলের নেতা-মন্ত্রী বা মণ্ডল সভাপতিদের পরিচালন সমিতির মাথায় বসিয়ে ‘ক্যাম্পাস রাজনীতিমুক্ত’ করার এই তত্ত্ব আদতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ার এক কৌশল মাত্র। এই সর্বব্যাপী দলতন্ত্রের খেসারত দিতে হচ্ছে রাজ্যের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থাকে। একদিকে যেমন শিক্ষক-অধ্যাপকদের বদলি এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড সংক্রান্ত নতুন বিল (‘দি ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ কলেজেস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৬’ এবং ‘দি ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি লজ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল’) নিয়ে শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিগুলি লোকভবনের দ্বারস্থ হচ্ছেন এবং শিক্ষার উৎকর্ষ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের ছায়া পড়েছে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সরকারি স্কুলে প্রায় ৮০ লক্ষ পড়ুয়া কমে যাওয়ার মতো আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জেলায় জেলায় হাজার হাজার স্কুল আজ পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং মুক্ত চিন্তার বিকাশ। কলেজ বা স্কুলের পরিচালন কমিটিতে জনপ্রতিনিধিদের রাখার মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকার ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সংযোগ তৈরি করা, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার নয়। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে বাম, তৃণমূল থেকে বিজেপির রাজনীতি শিক্ষাঙ্গনকে শুধুমাত্র নিজেদের ক্ষমতা দখলের আখড়ায় পরিণত করেছে। শিক্ষাকে শাসক বা রাজনৈতিক দলের গ্রাস থেকে মুক্ত না করতে পারলে এই অবক্ষয় থামানো সম্ভব নয়। শিক্ষাঙ্গন থেকে অবিলম্বে দলীয় রাজনীতির অবসান এবং প্রতিষ্ঠানগুলির প্রশাসনিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত স্বতন্ত্রতা ফিরিয়ে দেওয়াই এখন সময়ের একমাত্র দাবি।