Bartaman Logo
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বঙ্গের বিশ্বকর্মা

শিল্পাচার্য্য মহাভাগ দেবানাং কার্য্যসাধক। /বিশ্বকর্ম্মন্ নমস্তুভ্যং সর্ব্বাভীষ্টপ্রদায়ক।’ আসি বিশ্বকর্মার কথায়।

বঙ্গের বিশ্বকর্মা
  • ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ডঃ সায়ন্তন মজুমদার: শিল্পাচার্য্য মহাভাগ দেবানাং কার্য্যসাধক। /বিশ্বকর্ম্মন্ নমস্তুভ্যং সর্ব্বাভীষ্টপ্রদায়ক।’ আসি বিশ্বকর্মার কথায়। কয়েকদিন পরেই মহিষাসুরমর্দিনীর পুজো, যাঁকে বিশ্বকর্মা কুঠার প্রদান করেছিলেন। হয়তো এই ঘোর কলিতে বিশ্বকর্মার কুঠারে আর সেরকম ধার নেই। তাই আজ বহু অসুরের হাতে নিপীড়িত হতে হয় অগণিত দুর্গাকে। এই সেই বিশ্বকর্মা যিনি দধীচি মুনির হাড় দিয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের কালান্তক বজ্র নির্মাণ করে দিয়েছেন। তৈরি করেছেন সকল দেবতার অস্ত্রশস্ত্র, জগন্নাথ মূর্তি, পুষ্পক রথসহ স্বর্গ ও যমপুরী। বিশ্বকর্মা বা ত্বষ্টা একাধারে স্থপতি ও শ্রমজীবী মানুষের উপাস্য। 

Advertisement

শ্রীকৃষ্ণের নতুন রাজধানী দ্বারকার নির্মাণকর্তাও তিনি। ১৪৭৩-৮০ খ্রিস্টাব্দের কালপর্বে গুণরাজ খাঁ ওরফে মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণ-বিজয়’ কাব্য সেই সাক্ষ্যই দেয়। কৃষ্ণ তাঁকে ইন্দ্রপুরীর থেকেও সুন্দর নগর নির্মাণ করতে বলেন। তখন বিষ্ণুপুরী বৈকুণ্ঠকে মনে রেখে দ্বারকা স্থাপনা করেন তিনি। তবে কবি ‘বিশ্বকর্মা’ বানান লিখনের মাধ্যমে নির্মাণদেবতারই যেন নবনির্মাণ করেছেন। ১৪৯৫ সালে মঙ্গলকাব্য ধারার বিশেষ কাব্য ‘মনসামঙ্গল’ রচনা করেন বিপ্রদাস পিপিলাই। সেখানে বিশ্বকর্মাকে দ্বিমুখী ভূমিকায় দেখতে পাই আমরা। পরস্পর শত্রু মনসা এবং চাঁদ সওদাগর উভয়ের জন্যই কাজ করেছেন তিনি। দ্বিতীয় পালায় সিজুয়া পর্বতে পদ্মা বা মনসার জন্য বিশাল সুরম্য পুরী বানান। নগরে প্রজা আনিয়ে বসানোর দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন। তাঁর বাহনরূপে হাতি নয়, দেখা যায় ভালুককে। আবার সাঁতালি পর্বতে চাঁদ সওদাগরের কথায় পুত্র লখিন্দরের জন্য লোহার বাসর ঘরও তৈরি করে দেন শিল্পাচার্য। কিন্তু মনসার ভয়ে ঘরে রেখে দিয়েছিলেন সুতো গলে যাওয়ার মতো একটি ছিদ্র। যা লখিন্দরের মৃত্যুর কারণ হয়। ঠিক এমনিভাবেই হয়তো এখনকার সমাজের সকল ব্যবস্থাতেই থেকে যায় সেই ভয়ংকর ছিদ্র, যার ফলে অসামাজিক কালনাগিনীদের হাতে প্রাণ হারাতে হয় সাধারণ মানুষকে। 
ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে মনসার সৎমাকে নিয়ে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী রচনা করেছিলেন ‘চণ্ডীমঙ্গল’। এই কাব্যেও বিশ্বকর্মার ‘বিশাই’ নামকরণ চোখে পড়ে। সেখানে অট্টালিকা-আয়ুধ নয় দেবী চণ্ডী বিশ্বকর্মাকে নিজের কাঁচুলি তৈরির ভার দিয়েছিলেন—‘বিচিত্র কাঁচুলী বিশাই দিল চণ্ডিকারে। /আশীর্বাদ পাইয়া বিশাই গেলা নিজ ঘরে।।’ অসংখ্য দুঃশাসনদের মাঝে বাংলার বোনদের সম্মান রক্ষা এখন খুবই প্রয়োজন।
বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ কাব্যধারায় রামায়ণের অনুবাদকরূপে আমরা পেয়েছি কৃত্তিবাস ওঝার ‘শ্রীরাম পাঁচালী’। সেখানে রামের সেতুবন্ধনের সহায়ক বিশ্বকর্মার পুত্র নলকে আমরা দেখেছি। কাশীরাম দাসের অনূদিত মহাভারতে আমরা দেবতাকুলের নয় দৈত্যকুলের বিশ্বকর্মারূপে খ্যাত স্থপতি ময়দানবকে পেয়েছি। তিনি ইন্দ্রপ্রস্থে পাণ্ডবদের রাজধানী তৈরি করে দেন। আত্মপরিচয়ে ময়দানব অর্জুনকে বলেন,‘দানবকুলের শ্রেষ্ঠ বিশ্বকর্মা আমি’।
আবার বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের শেষ ও আধুনিক যুগের লক্ষণ যার মধ্যে ধরা পড়ে তিনি হলেন রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়(মৃত্যু ১৭৬০)। মঙ্গলকাব্য ধারায় এক নতুন মঙ্গলরূপে তিনি রচনা করেছিলেন ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য। সময়টা ১৭৫২। এর প্রথম খণ্ডে শিব সেই ‘বাছা বিশাই’ বা বিশ্বকর্মাকেই কাশীতে দেবী অন্নপূর্ণার জন্য দেউল বা মন্দির তৈরি করে দিতে বলেন। বিশ্বকর্মা দেবীমূর্তি সহ দেবীর যে আলয় তৈরি করে দিয়েছিলেন তাতে বাঘছাল পরা শিব খুব খুশি হন—‘রতন দেউল     ভুবনে অতুল/কোটি রবি পরকাশ।/বিধির সন্ধান  অপূর্ব নির্মাণ/দেখি সুখী কৃত্তিবাস’। আবার এই কাশী সর্বোপরি শিবের প্রতিদ্বন্দ্বী মহামুনি বেদব্যাস কাশীর পরপারে দ্বিতীয় কাশী নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলে তাঁরও বিশ্বকর্মার কথাই মনে পড়ে। তাঁকে ডেকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়ে ব্যাস বলেন, ‘তুমি বিশ্বকর্ম জানো বিশ্বমর্ম/তোমাতে বিশ্ব প্রকাশ।।’ কিন্তু বিশ্বকর্মা শিবের পক্ষে কথা বলায় ব্যাস শেষ পর্যন্ত তাঁকে দূর করে দেন।
বঙ্গসাহিত্যের মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ১৮৬০ সালে প্রকাশিত হয় অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত তাঁর প্রথম কাব্য ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’। তাতে বিশ্বকর্মা করিৎকর্মা ও সম্মানজনক স্থান দখল করে আছেন। সুন্দ-উপসুন্দ নামে দুই দানবের অত্যাচারে তখন স্বর্গ হতে বিতাড়িত দেবতারা। তাঁদের উদ্দেশে ঘোষিত দৈববাণীতে বলা হয়েছিল যে বিশ্বকর্মাকে দিয়ে তিলোত্তমাকে সৃষ্টি করাতে হবে। তাঁকে খবর দিতে গিয়ে পবনদেব বিশ্বকর্মার হাতে তৈরি ব্রহ্মপুরী দেখে মোহিত হয়ে যান। উত্তর মেরুতে বসবাস করতেন বিশ্বকর্মা। বিশ্বের নানা বস্তু হতে তিল তিল পরিমাণ উত্তম বস্তু নিয়ে তিনি গড়েছিলেন তিলোত্তমাকে—‘অমৃত সঞ্চারী তবে দেব-শিল্পী-পতি/জীবাইলা কামিনীরে’। 
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘ধর্মতত্ত্ব’ গ্রন্থের ‘খ’ নং ক্রোড়পত্রে বিশ্বকর্মার কথা লিখেছেন। তাঁর মতে ঋকবেদে প্রাচীনের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত নতুন মন্ত্রগুলিতে বিশ্বকর্মার নাম দেখতে পাওয়া যায়। 
আসি রবীন্দ্রনাথের কথায়। ১৯১৮ সালে বিশ্বকর্মা পূজার ষোলো দিন পরে ১৬ আশ্বিন বালিকা রাণুকে একটি চিঠি লেখেন ভানুদাদা। এই রাণু অধিকারীই পরবর্তীতে শিল্প সমালোচক লেডি রানু মুখোপাধ্যায় হন। ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’তে অপৌত্তলিক, একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মধর্মভুক্ত হয়েও বিশ্বকবি বিশ্বকর্মার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করেছেন। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘বিশ্বকর্মার কাজে আমরা যখন যোগ দিই তখন যে-পরিমাণে তাঁর সঙ্গে মিল রেখে, ছন্দ রেখে চলি সেই পরিমাণে আমাদের কাজ অক্ষয়কীর্তি হয়ে ওঠে, যে-পরিমাণে বাধা দিই সেই পরিমাণে আমরা প্রলয়কে ডেকে আনি’। আবার ১৯২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর ‘খ্রিস্টোৎসব’ প্রবন্ধে বিশ্বকর্মার উল্লেখ করে তিনি যেন দুই ধর্মকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানেও কিন্তু পাঁচ বছর আগে লেখা চিঠির ভাবটি যেন ফিরে এসেছে— উপরের সঙ্গে নীচের যে মিলন বিশ্বকর্মার কর্মের সঙ্গে ক্ষুদ্র আমাদের কর্মের যে মিলন, বিশ্বে নিরন্তর তারই লীলা চলছে। তার দ্বারা সব পূর্ণ হয়ে রয়েছে।’ কবির স্বপ্নভূমি বোলপুরের শ্রীনিকেতনে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন পালিত হয় শিল্পোৎসব।
বিশ্বকর্মা পুজো মানেই ঘুড়ি ওড়ানো অর্থাৎ মাটিতে লাটাই হাতে রেখে অনেক উপরে উঠতে পারার, ভাসতে পারার ইচ্ছাকে পূরণ করা। তাই তো ‘গল্পগুচ্ছ’-র ‘ছুটি’ গল্পে মহানগরীতে বন্দি হয়ে যাওয়া ফটিক চক্রবর্তীর ছুটিকামী মনে ভেসে ওঠে গ্রামের স্মৃতি— ‘প্রকাণ্ড একটা ধাউস ঘুড়ি লইয়া বোঁ বোঁ শব্দে উড়াইয়া বেড়াইবার সেই মাঠ’। বিষয়টি খুব সুন্দর ভাবে উঠে এসেছে বাংলার ত্রিকোণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সব থেকে বয়সে বড়ো বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিধু মাস্টার’ গল্পে। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত ‘কিন্নরদল’ গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ছিল এটি। গল্পে স্বয়ং লেখক গৃহশিক্ষক বিধু মাস্টারের ছাত্ররূপে উপস্থিত রয়েছেন। এক বিশ্বকর্মা পুজোর সময় লেখক সহ অন্যান্য ছাত্ররা মাস্টারমশাইয়ের কাছে ঘুড়িলাটাইয়ের আবদার করে বসে, বাড়ির লোকদের লুকিয়ে। মাস্টারমশাই তখন ছাত্রদের কলকাতার সেন্ট জেমস স্কোয়ারের দক্ষিণ কোণের একটা মণিহারী দোকান থেকে এক টাকার ঘুড়িলাটাই কিনে দিয়েছিলেন। বিশ্বকর্মা পুজোর প্রায় চার দিন পরে মাস্টারমশায়ের বাড়ি যান ছাত্রটি। এর কয়েকদিন পরেই পুজো বা উৎসবের মুখে লেখকের সেজোকাকার দ্বারা চাকরি হারাতে হয় বিধু মাস্টারকে। 
যাই হোক, এবার আসি পরশুরাম রাজশেখর বসুর কথায়। তাঁর উপর স্বয়ং বিশ্বকর্মা মানহানির মামলা করে দিতেই পারেন। আজ থেকে একশো বছর আগে ১৯২৬ সালে তিনি একটি গল্প লিখেছিলেন, ‘কচি-সংসদ’। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার পৃথিবী নির্মাণের প্রাকমুহূর্তকে গল্পকার ময়দামাখা, ‘ময়দা-ঠাসা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। একজন কুমোর আঙুলের সাহায্যে মাটির নানা অলংকরণ করে ফেলেন। তেমনি কামারদের দেবতা বিশ্বকর্মার ‘দশ আঙুলের গাঁট্টার ছাপ এখনো রহিয়া গিয়া স্থানে স্থানে পর্বত উপত্যকা নদী জলধি সৃষ্টি করিয়াছে’। ভারতমুকুট হিমালয় পর্বতমালাকে পরশুরাম বিশ্বকর্মার ‘একটি বিরাট চিমটির ফল’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
সৈয়দ মুজতবা আলী প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার চিল্কা উপহ্রদে জলবিহারের সময় স্মরণ করেছেন বিশ্বকর্মাকে। সহচরী ভাগ্নী কৃষ্ণার চোখে চিল্কার মাধুরী লক্ষ করে বলেছিলেন, ‘চোখের চতুর্দিকে স্বয়ং বিশ্বকর্মা এঁকে দিয়েছেন কৃষ্ণাঞ্জনো’ একথা জেনে বিশ্বকর্মার গায়ে পুলক লাগাটাই স্বাভাবিক। 
এবার পৌরাণিক বা সাহিত্যপাতার বিশ্বকর্মা নন, সাক্ষাৎ জীয়ন্ত বিশ্বকর্মাদের কথা পাড়ি। কলকাতার বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে একটি মোটরমেরামতির কারখানার মালিক ছিলেন তিনি। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তাঁর হাতে তৈরি মোটরগাড়ি গত শতকের প্রথমার্ধে পাড়ি দিয়েছিল কাশী থেকে গোয়ালিয়র। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির সেই গাড়িটি ব্যবহার করতেন প্রতিষ্ঠাতা মদনমোহন মালব্য, ভারতবর্ষের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর পিতা মতিলাল নেহেরু। কলকাতার বিশ্বকর্মা বলে পরিচিত সেই বিপিনবিহারী দাসের তৈরি গাড়ির অন্যতম খদ্দের ছিল কলকাতা পৌরসভা। উপরোক্ত রাণু মুখোপাধ্যায়ের শ্বশুরমশাই মিস্টার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ও এক অর্থে বিশ্বকর্মা। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের স্থপতি ছিলেন তিনি। আবার কলকাতা থেকে শ্রীরামপুরে গেলে আমরা পেয়ে যাব হুগলির বিশ্বকর্মাকে। দুশো বছরেরও আগে তিনি সেখানে বসে বাংলা ও নাগরী অক্ষর তৈরি করেছিলেন। আরো উত্তরে এগোলে চলে যাওয়া যাবে একদা নবাবরাজধানী মুর্শিদাবাদ জেলায়। খ্যাতনামা লৌহশিল্পী বিশ্বেশ্বর কর্মকার ১৯০৮ সালে জন্মসূত্রে ছিলেন সাগরদিঘি থানার দোহালি গ্রামের। নবাবী জেলার বিশ্বকর্মারূপে খ্যাতি ছিল তাঁর।
বিশ্বজুড়ে কর্ম হোক, কিন্তু তা সুকর্ম কিংবা হিন্দি ভাষা অনুসারে দুনিয়ার কাম হতেই পারে। একমাত্র ভালো কাজই বিশ্ববাসীর মন থেকে প্রথম রিপু কামের বিবেকহীন ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়াকে দূর করতে পারে। বিশ্বকর্মা হউন তার সহায়।
 লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ