Bartaman Logo
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি...

জিডিপি ৭.৮ নিয়ে এখনও বিতর্ক অব্যাহত। দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য নিয়ে শাসক একরকম বলে, তো তার উলটোটা বলে বিরোধীরা

মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি...
  • ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

জিডিপি ৭.৮ নিয়ে এখনও বিতর্ক অব্যাহত। দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য নিয়ে শাসক একরকম বলে, তো তার উলটোটা বলে বিরোধীরা। এই তরজা উপভোগ করা যায় কিন্তু পেট ভরে না। কারণ জিনিসের দাম ঊর্ধ্বমুখী। খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে টান পড়ে পেটে। চাল, ডাল, সবজি, তেল, নুন কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব। ওষুধের দামও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। সাধারণ লোকজন বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের অবস্থা শোচনীয়। জিডিপি তাঁদের কাছে অর্থহীন বাকোয়াস ছাড়া কিছু নয়! মাত্র গতকালই যে রিপোর্ট সামনে এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে পাইকারি ও খুচরো দুই প্রকার বাজারেই মূল্যবৃদ্ধির সূচক লাফিয়ে বাড়ছে। নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। 

Advertisement

রিজার্ভ ব্যাংক থেকে শুরু করে সরকারের অন্যান্য স্তর থেকে সতর্ক করা হচ্ছে আসন্ন উৎসব মরশুমে নিত্যপণ্য বিশেষত খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়বে। বাঙালির উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গই হচ্ছে কেনাকাটা আর ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়া। সেই কারণে মূল্যবৃদ্ধি উৎসবের মৌতাতে বিঘ্ন ঘটায়। অর্থনীতির স্বার্থে মন্ত্রীসান্ত্রিরা সোনা কেনা কমানো এবং বিদেশযাত্রায় রাশ টানার নিদান দেন। এটাই নাকি সময়ের দাবি। ওতে অযথা ডলার খরচ বাড়ে, দুর্বল হয় অর্থনীতির ভিত। আমির লোকেদের বিদেশে গিয়ে বিয়েতেও আপত্তি জানিয়েছেন মোদিজি। ‘আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও’ আপ্তবাক্যে আজকালকার নেতানেত্রীরা বিশেষ আমল দেন না। সেই কারণেই মধ্যবিত্ত সোনা কিনলে ডলার খরচের দায়ে ভিলেন। আর আট মাসে প্রায় দেড় ডজন দেশঘুরে রাষ্ট্রনেতা জনগণের নয়নের মণি! রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, কূটনীতি এবং অর্থনীতি একসুরে বাঁধা থাকলেও ‘রাষ্ট্রবাদী’ এই দেশে সব ব্যাপারেই শেষ কথা বলেন রাজনীতির লোকেরাই। এটাই এদেশের জনগণের অদৃষ্টের অদ্ভুত লিখন! 
দাম বাড়লে তার প্রভাব তো শুধু অর্থনীতির পক্ষেই ভয়ংকর হবে না, মন্দার আঁচ সাধারণ মানুষের উপরও পড়তে বাধ্য। নিত্যপণ্যের বাজারে তার কম্পন সামাল দেওয়া সরকারের পক্ষে সহজ হবে না। নতুন করে সংকটে পড়বে অর্থনীতি। মূল্যবৃদ্ধিকে অস্বীকার করলে জিডিপি’র বৃদ্ধিও তো অর্থহীন হয়ে পড়ে। আর পেট্রপণ্যের বিপুল আমদানির খরচ? চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে লাফিয়ে বেড়েছে। বজ্রআঁটুনি সত্ত্বেও বেড়ে গিয়েছে প্রায় ৫৬-৫৭ শতাংশ। কে এই খরচ বহন করবে? গত এক সপ্তাহ ধরে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে একটা মাত্র সরল সংখ্যা। ৭.৮।  তার সঙ্গে যুক্ত হল মূল্যবৃদ্ধির সূচক। ওই সরল সংখ্যায় তো আমার আপনার পেট ভরবে না, বেকারের চাকরি হবে না, বাজারে নিত্যপণ্যের দামও কমবে না। ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিটের সুদ বাড়বে না। রুগ্ন সংস্থা চাঙ্গা হওয়ার বিশেষ আশাও নেই। রাস্তাঘাট সড়ক ব্যবসা-বাণিজ্য বিক্রিবাটা কমা-বাড়ারও সম্পর্ক নেই। তাহলে ওই একগুচ্ছ সংখ্যা নিয়ে মিছিমিছি ছায়াযুদ্ধ কেন? আমরা সাধারণ মানুষ জিডিপি বুঝি না। পণ্ডিতে বলে ওটা নাকি বৃদ্ধির হার। আমাদের দেহে যেমন সুগার কোলেস্টেরল কিডনির অবস্থা দেখে ডাক্তাররা সুস্থ অসুস্থ ঠিক করেন তেমনি জিডিপি বৃদ্ধির হারের ওঠানামার দিয়ে দেশের অর্থনীতি কতটা সচল, বৃদ্ধি হচ্ছে না সংকুচিত হচ্ছে তার ইঙ্গিত মেলে। সেই হিসাবে ৭.৮ যথেষ্ট ইতিবাচক বৃদ্ধির হার বলতেই হবে। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্নগুলোকেও এড়িয়ে যাওয়া কি সম্ভব। যাঁরা তোপ দেগেছেন তাঁদের একজন প্রাক্তন অর্থসচিব এবং মোদিজির প্রাক্তন আর্থিক উপদেষ্টা সুভাষ গর্গ এবং রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন। এঁদের হেলাফেলা করা যায় না। সরকার বলছে, আগের ও বর্তমান হিসাবের ভিত্তিবর্ষ এবং পদ্ধতি এক নয়, নতুন হিসাবের কাঠামো কার্যকর হওয়ায় সরাসরি এমন তুলনা নাকি বিভ্রান্তিকর। এই যুক্তি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ঠিক সেই কারণেই সরকারের দায়িত্ব আরও বেশি। কোন পদ্ধতিতে অঙ্ক তৈরি হল? পুরানো প্রথা সংশোধন করা হল কীভাবে? মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাদ গেল কোন জাদুতে? নাকি পুরোটাই কষ্টকল্পিত ম্যানিপুলেশন! প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজনের প্রশ্নগুলি আরও মৌলিক। অর্থনীতি যদি এতই শক্তিশালী, তবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ছবিটা উজ্জ্বল নয় কেন? শিল্প বিনিয়োগের জোয়ার কোথায়? এসব তো বিরোধী পক্ষের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্ন বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এ তো অর্থনীতির স্বাস্থ্যের স্বাভাবিক পরীক্ষার ফল। ওই যে বললাম একটা বা দুটো সংখ্যার জাদুতে গরিবের ঘরে আলো জ্বলতে পারে না। হাতে কাজ, পাতে ভাত, আর শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে না পারলে বৃদ্ধি কিংবা উন্নয়নের দ্যুতিও শুধু মুখের কথায় ছড়িয়ে পড়তে পারে না। দাম কমাতে হবে এবং চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। পরিকাঠামো বাড়াতে হবে। যে অর্থনীতি সাধারণের স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির বদলে শুধুই পরিসংখ্যানের ভারে মানুষকে সম্মোহিত করতে চায় তার পরিণাম ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের পক্ষে ভালো হতে পারে না। পরিসংখ্যান যতই অর্থনীতির সমৃদ্ধির সুখচিত্র তুলে ধরুক, বাস্তবের সঙ্গে মেলাতে না পারলে  মানুষ উচ্ছ্বসিত হতে পারবেন না। দাম কমানো তাই সর্বাগ্রে সময়ের দাবি। চাকরি দিতে পারেন না, কিল মারার গোঁসাই হয়ে মন জিততে পারবেন?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ