কলহার মুখোপাধ্যায়: সকাল সাড়ে আটটা। শিয়ালদহমুখী লোকাল ঢুকতেই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো মানুষের ঢেউ একসঙ্গে নড়ে উঠল। দরজার সামনে ব্যাপক ধাক্কাধাক্কি। কেউ উঠতে পারলেন। কেউ পারলেন না, ছিটকে গেলেন। যাঁরা উঠলেন, তাঁদের অধিকাংশের বসা তো দূরের কথা দু’পা মাটিতে রাখার জায়গাটুকুও জুটল না। অনেকে বিপজ্জনকভাবে ঝুলতে থাকলেন। দরজার কাছে ঝুলতে ঝুলতে এবার শুরু হল গোটা একটা দিনের কর্মযাত্রা।
এ রাজ্যের লোকাল ট্রেন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনরেখা। কলকাতা ও শহরতলির বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অফিসযাত্রী, ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমিক, ব্যবসায়ী সহ অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন রেলের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ভিড়, ট্রেন লেট, নিরাপত্তার অভাবের কারণে সে রেলযাত্রাই যাত্রীদের কাছে হয়ে উঠেছে প্রবল উৎকণ্ঠার, ভয়ঙ্কর ক্লান্তিকর, কারণ যাত্রাপথের গোটাটাই অনিশ্চয়তায় ঠাসা। ট্রেনে যাতায়াতের নিত্য দুর্ভোগ কোনো অতিরঞ্জিত অভিযোগ নয়। কাগজ খুললে বা টিভি চালালে একের পর এক ঘটনা চোখে পড়েই। যাত্রী সমস্যার ভিত গভীর পর্যন্ত ছড়িয়ে। বাংলার লোকাল ট্রেন নির্ভর নাগরিক জীবনের একটি কঠিন বাস্তব ছবি রোজই উঠে আসে সামনে, যা বাস্তবিকই শিহরন জাগানোর মত। সমস্যার অন্যতম হল ভিড়।
শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার নিত্যযাত্রীদের যেমন অভিযোগ, কোভিডের সময় ট্রেনের সংখ্যা কমানো হয়েছিল। তারপর সেগুলি আর চালু করা হয়নি। ফলে ভিড় আরও বেড়েছে। আগেও ঠাসা ভিড় হত। এখন তা মাত্রাছাড়া চেহারা নিয়েছে। এছাড়া লাস্ট ট্রেনের সময় এগিয়ে আনা হয়েছে। ফলে যাঁদের একটু বেশি রাতে বাড়ি ফিরতে হয়, তাঁদের পড়তে হচ্ছে ভয়ানক সমস্যার মুখে। ওভারব্রিজ নিয়েও একাধিক সমস্যা। ফলে মানুষ ট্রেন লাইন দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে বাধ্য হন। স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, ফুটব্রিজ, প্রবেশ ও বেরনোর পথ নিয়েও রয়েছে সমস্যা। এছাড়া রোজই অভিযোগ ওঠে, ট্রেনে সমাজবিরোধীদের উৎপাত বেড়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা বৃদ্ধির দিকে নজর দেয় না রেল কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তাজনিত কিছু বিষয় আরও আছে। ভিড়ের মধ্যে দরজায় ঝুলে যাতায়াত। চলন্ত ট্রেনে ওঠানামা। প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত চাপ। এ সবই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। রেলপথের নিরাপত্তা শুধু ট্রেনের গতি বা সিগন্যাল ব্যবস্থার প্রশ্ন নয়, স্টেশন, লেভেল ক্রসিং এবং যাত্রী ব্যবস্থাপনাও যে তার অবিচ্ছেদ্য অংশ তা অধিকাংশ সময়ই ভুলে যায় রেল কর্তৃপক্ষ। মুর্শিদাবাদে একটি স্কুলভ্যান ও সাইকেলকে ধাক্কা দিয়েছিল ট্রেন। প্রাণহানি হয়েছিল। তদন্তে উঠে এসেছিল, লেভেল ক্রসিংয়ের গেট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুতর গাফিলতি ছিল। এই ঘটনা
প্রমাণ করে রেলযাত্রার নিরাপত্তা কেবল ট্রেনের কামরার ভিতরই সীমাবদ্ধ নয়। তা বাইরের অংশের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।
ব্যান্ডেল লাইনের যাত্রীদের সঙ্গে কথা বললে জানা যাবে, ট্রেন রোজই লেটে চলে। ফলে প্রবল সমস্যায় পড়তে হয় মানুষকে। কিন্তু সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগই নেয় না রেল। সমস্যা আরও আছে। ট্রেনের পাদানির সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের দূরত্ব বেশি। ফলে উঠতে গিয়ে হোঁচট খাওয়ার আতঙ্ক নিয়েই ট্রেনে ওঠেন যাত্রীরা। প্রবীণ এবং মহিলাদের সমস্যায় পড়তে হয় বেশি। এ বিষয়টি সাধারণ নয়। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবনহানির
আশঙ্কা। উঠতে গিয়ে কেউ পড়ে গেলে এবং সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন চলতে শুরু করলে প্রাণহানি অবশ্যম্ভাবী। তবুও মানুষ নিরুপায়। প্রাণ হাতে নিয়েই তাঁদের উঠতে হয় ট্রেনে।
হাওড়া, বর্ধমান লাইনের যাত্রীরা যেমন বলেন, কোনোদিনই ট্রেন সময়ে চলে না। দুপুরে এই সমস্যা মারাত্মক আকার নেয়। মানুষের প্রয়োজনীয় কাজে যাওয়ার সময় যায় পেরিয়ে। গন্তব্যে সময়মতো পৌঁছনোই হয় না। লোকাল ট্রেনের যাত্রীদের কাছে পাঁচ-দশ মিনিট দেরি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা তখনই গুরুতর হয়ে ওঠে যখন সেই দেরি নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে দীর্ঘ হয়ে ওঠে। প্রায়শই দেখা যায়, লাইন ফাঁকা না থাকায় একের পর এক ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়েছে। একটি ট্রেন দেরি করলে তার পিছনের ট্রেনও আটকে যায়। কোথাও সিগন্যাল সমস্যা, কোথাও লাইন পরিবর্তন, কোথাও অন্য ট্রেনকে অগ্রাধিকার, ক্রমে তৈরি হয় দীর্ঘ বিলম্বের শৃঙ্খল। বছরখানেক আগে সাঁতরাগাছি ইয়ার্ডে সিগন্যাল সংক্রান্ত সমস্যার জেরে হাওড়া স্টেশনে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। বহু দূরপাল্লার ট্রেন ছয় থেকে দশ ঘণ্টা পর্যন্ত দেরিতে চলেছিল। হাজার হাজার যাত্রীকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল বলে অভিযোগ। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন বা ইয়ার্ডে প্রযুক্তিগত সমস্যা কীভাবে গোটা পরিষেবাকে বিপর্যস্ত করতে পারে।
একজন নিত্যযাত্রীর কাছে এর অর্থ শুধু ট্রেনের দেরি নয়। অফিসে পৌঁছতে দেরি, গুরুত্বপূর্ণ মিটিং মিস, পরীক্ষার হলে সময়মতো পৌঁছতে না পারা, হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পিছিয়ে যাওয়া, রেলের অনিয়মের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।
আরও কিছু সমস্যা আছে যা শুনতে হয়তো খুবই সামান্য কিন্তু তার সঙ্গে মানুষের জীবন, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা, পঙ্গু হওয়ার আতঙ্ক জড়িয়ে। কিন্তু রেল এইসব বিষয়কে গুরুত্বই দেয় না। ফলে তা বাড়তেই থাকে। বেড়েই চলে। সরকার চোখ এবং কান বন্ধ করে সেগুলি সযত্নে এড়িয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনের মেঝেতে বসানো হয়েছে ব্ল্যাক স্টোন। সে পাথরে জল পড়লেই তা হয়ে ওঠে ভয়ানক পিচ্ছিল। পা পিছলে যাওয়ার মারাত্মক আশঙ্কা। মানুষের অঙ্গহানি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। বর্ষায় সমস্যা মাত্রাছাড়া হয়। কিন্তু কে কার কথা শোনে। পিছল পাথরেই পা রেখে হাঁটতে হয় মানুষকে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থেকে অসুস্থ, শিশু থেকে মহিলা, সবাই সমস্যায় পড়েন। কিন্তু রেলের চোখ বন্ধই থাকে। এছাড়া বড়ো সমস্যা হল, ঘোষণা ব্যবস্থার কার্যত দফারফা অবস্থা। কোন ট্রেন কখন আসবে তা জানতে পারা যায় না। গ্যালপিং ট্রেনের খবর মেলে না। ট্রেন আসতে দেরি হলেও খবরও পান না যাত্রীরা। ফলে ট্রেন দেরি করলে প্ল্যাটফর্মে যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়। আবার একসঙ্গে একাধিক ট্রেনের সময় বদলে গেলে পরিস্থিতি যায় জটিল হয়ে। যাত্রীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত ঘোষণা না হওয়ায় বিভ্রান্ত হতে হয়। অনুসন্ধান কাউন্টারে ভিড় জমে। যদিও ট্রেন কখন ছাড়বে, তার স্পষ্ট তথ্য বেশিরভাগ সময়ই পাওয়া যায় না। তথ্য ব্যবস্থার গুরুত্বহীন দশা প্রকট হয়। ট্রেন দেরি করতেই পারে, প্রযুক্তিগত ত্রুটি হতেই পারে, কিন্তু যাত্রীকে যদি সময়মতো সঠিক তথ্য দেওয়া যায়, দুর্ভোগের বড়ো অংশ কমানো সম্ভব। কিন্তু তা করা হয় না। এর পাশাপাশি বর্ষা এলে আর একটি আশঙ্কা সামনে আসে, জল জমে রেললাইন যায় অচল হয়ে। যেমন শিয়ালদহ ও হাওড়ার কাছে রেললাইনে জল জমে একাধিক শাখায় পরিষেবা ব্যাহত হয়।
অভিযোগ পরিচ্ছন্নতা নিয়েও। বহু স্টেশনে বাথরুমে কল থেকে অবিরাম জল পড়ে। অপচয় হয়। শৌচালয় অপরিষ্কার। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হল, টিকিট বুক করার অনলাইন কাউন্টার খোলার সঙ্গে সঙ্গে যায় বন্ধ হয়ে। মানুষকে টিকিট না পেয়ে হতাশ হতে হয়। এতসব ঘটনা একদিন ঘটে না। দিনের পর দিন এভাবেই চলছে। আর ভুগেই চলেছে অসংখ্য নাগরিক।
সমাধানের উপায় কি নেই? পশ্চিমবঙ্গের রেল পরিষেবার সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। যাত্রীসংখ্যা বাড়ছে, শহরতলি ক্রমশ দূরে ছড়িয়ে পড়ছে, অথচ বহু গুরুত্বপূর্ণ রুটে একই পরিকাঠামো। ফলে ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হচ্ছে। সমাধানের জন্য প্রয়োজন, ব্যস্ত সময় আরও ট্রেন চালানো। যাত্রী সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কামরা বাড়ানো-কমানোর পরিকল্পনা। সিগন্যাল ও রেল পরিকাঠামোর নিয়মিত আধুনিকীকরণ। বর্ষায় জল জমার স্থায়ী সমাধান। রেলের তরফে একটা অভিযোগ আসে, স্থানীয় প্রশাসনের সহযোহিতার অভাবের কারণে পরিষবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করা সম্ভব হয় না। যাত্রীদের বক্তব্য, এখন রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার। ফলে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা পাওয়া নিশ্চয় যাবে। ফলে দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশায় সকলে। এর পাশাপাশি স্টেশনে যাত্রীদের তথ্য দিতে উন্নত মানের ব্যবস্থা তৈরি করা। ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার জন্য কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি। লেভেল ক্রসিং ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কঠোর নজরদারি। যে কোনো অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি যাত্রীদের।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে ট্রেন শুধুমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অপরিহার্য ব্যবস্থা। প্রতিদিন ভোরে যে মানুষটি ভিড় ঠেলে ট্রেনে ওঠেন, তিনি কোনো বিলাসিতা চান না। তিনি চান নির্দিষ্ট সময়ে একটি ট্রেন আসুক। নিরাপদে ওঠার মতো জায়গা
মিলুক। পরিষ্কার কামরা থাকুক। কোনো সমস্যা হলে সঠিক তথ্য দিক কর্তৃপক্ষ। রেলকে দ্রুত, আধুনিক করার পাশাপাশি অসংখ্য যাত্রীর সময়, নিরাপত্তা এবং নাগরিক মর্যাদাকে পরিষেবার মাপকাঠি হিসাবে গণ্য করতে হবে। ট্রেনের জানলার বাইরে দৃশ্য বদলায়, শহর থেকে মফস্সল, মফস্সল থেকে গ্রাম। কিন্তু কামরার ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটির প্রশ্ন একই থাকে, কবে একটু স্বস্তিতে যাতায়াত করতে পারব?