Bartaman Logo
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি!

বাংলায় দুর্গোৎসব শুরু হতে মাসখানেক বাকি। এরই মধ্যে মধ্যপ্রদেশের এক বাবা কলকাতায় এসে পুজোর সময় বাঙালিকে নিরামিষ খাওয়ার নিদান দেওয়ায় জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে।

চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি!
  • ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বাংলায় দুর্গোৎসব শুরু হতে মাসখানেক বাকি। এরই মধ্যে মধ্যপ্রদেশের এক বাবা কলকাতায় এসে পুজোর সময় বাঙালিকে নিরামিষ খাওয়ার নিদান দেওয়ায় জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই নিয়ে প্রবল অস্বস্তিতে থাকা রাজ্যের শাসকদলের মাথারা ‘বাবা’র ব্যক্তিগত মত বলে বিষয়টিকে যখন ধামাচাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তখনই দেখা গেল নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে আগত বিশ্বনেতাদের নৈশভোজের পাতে জায়গা পেয়েছে শুধুই নিরামিষ পদ। চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের আমিষাশী রাষ্ট্রনেতা ও প্রতিনিধিরা হাসি হাসি মুখে সেসবই গলাধঃকরণ করেছেন। বলা ভালো, করতে হয়তো বাধ্য হয়েছেন। এমন নয় যে মোদি জমানায় বরাবর বিদেশি অভ্যাগতদের মধ্যাহ্নভোজ বা নৈশভোজের পাতে একমাত্র নিরামিষ পদই দেওয়া হয়। কয়েক বছর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সফরের সময় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নৈশভোজের প্লেটে মাছের ডিমের বা ‘ক্যাভিয়ার’-এর সাহায্যে তৈরি একটি পদ পরিবেশন করা হয়েছিল। ২০১৯-এর মহাবলীপুরমে চীনের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির বৈঠকের মেনুতেও ছিল চিংড়ি মাছ, মাটন ও মুরগির পদ। ভারতে যে বেশিরভাগ মানুষ আমিষভোগী এমনকি হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আমিষাশী—সেই তথ্য ও পরিসংখ্যান যুগ যুগ ধরে উঠে এসেছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সমীক্ষা রিপোর্টে। কিন্তু এই তথ্যকে মান্যতা দেওয়া দূরে থাক, আরএসএস তথা বিজেপি বোধহয় মনে করে, সরকারি নীতিতে নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস তুলে ধরা উচিত। এই কারণে খাদ্যের সঙ্গে ধর্ম সম্পর্কহীন বলে লোকদেখানো কথা শোনা গেলেও তথাকথিত ‘সনাতনীদের’ অনেকে ধর্মীয় উৎসব–ব্রত-উপবাসের সময় মাংস বিক্রি বা খাওয়ার উপর ফতোয়া জারি করতে চায়। নবরাত্রির সময় বা শ্রাবণ মাসে মাছ-মাংস খাওয়া বা তার ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া ‘মুঘলদের মানসিকতা’ বলে মনে করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। এমনকি ভারতে তৈরি কিছু ক্যাপসুলের খোল (জিলেটিন) প্রাণীর দেহাবশেষ দিয়ে তৈরি হয় বলে ওষুধের ক্ষেত্রেও আমিষ-নিরামিষ তত্ত্ব নিয়েও মোদি জমানায় তোলপাড় শুরু হয়েছিল একসময়।

Advertisement

বিজেপি-আরএসএস এই নিরামিষ খাদ্য সংস্কৃতি যতই চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক, তার সামনে বড়োসড়ো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিভিন্ন পরিসংখ্যান। কেন্দ্রের রেজিস্ট্রার জেনারেল অফ ইন্ডিয়ার স্যাম্পেল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম বেসলাইন সমীক্ষার তথ্য বলছে, দেশের ১৫ বছরের বেশি বয়সি মানুষের প্রায় ৭১ শতাংশ আমিষাশী। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভেও বলছে, দেশে ১৫-৫৪ বছর বয়সি পুরুষদের ৮৩.৪ শতাংশ এবং ১৫-৪৯ বছর বয়সি মহিলাদের ৭০.৬ শতাংশ আমিষ খান। আবার আমেরিকার গবেষণা সংস্থা ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’-এর মতে, ভারতে হিন্দুদের মধ্যে নিরামিষ খান ৪৪ শতাংশ। প্রাপ্তবয়স্কদের ৩৯ শতাংশের খাদ্যাভ্যাসও নিরামিষ। বাংলার ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান মোদিবাহিনীর জন্য আরও পীড়াদায়ক। এ রাজ্যে ১৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষের সাড়ে ৯৮ শতাংশ মাছ-মাংস খান। সংগত কারণেই ব্রিকসের নৈশভোজের মেনুতে সবই নিরামিষ পদ থাকায় মোদি সরকারকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। প্রশ্ন হল, যে দেশের অধিকাংশ মানুষ আমিষাশী, সেখানে বিশ্বমঞ্চে নিরামিষের প্রতি এমন পক্ষপাতিত্ব দেখিয়ে সরকার কি নিরামিষকে প্রচারের আলোয় আনতে চাইল? দেখাতে চাইল এটাই ভারতবাসীর মূল খাবার!
কে কী পরবে, কে কী খাবে—এদেশের সংবিধান অনুযায়ী তা হল ব্যক্তি মানুষের নিজস্ব অধিকার। অথচ সেই অধিকারে নিজেদের পছন্দ চাপিয়ে দিতে চাইছে মোদি সরকার ও শাসক দল, এই অভিযোগ উঠছে। এই চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না আন্তর্জাতিক স্তরের অতিথিরাও। নৈশভোজ বিতর্ক ধামাচাপা দিতে এক কেন্দ্রীয়মন্ত্রী দাবি করেছেন, বিদেশি অতিথিরা ভারতের ঐতিহ্যবাদী নিরামিষ খাবার উপভোগ করেছেন। প্রশ্ন হল, তাঁদের কাছে আমিষ খাদ্য উপভোগ করার বিকল্প সুযোগ ছিল কি? ঘটনা হল, যে হিন্দুদের শিখণ্ডী করে চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে চাইছে শাসকগোষ্ঠী, সেই হিন্দুদের খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র একরৈখিক নয়। যুগ যুগ ধরে ধর্মীয় সামাজিক জীবনে আমিষ-নিরামিষ হাত ধরে রক্ষিত হয়েছে। হিন্দুদের শক্তি পূজায় দেবীকে আমিষ ভোগ দেওয়ার রীতি শাসকগোষ্ঠীর অজানা নয়। সর্বোপরি দেখা গিয়েছে, একই ধর্মাবলম্বী মানুষ দেশের উত্তরাংশের পুজো-উৎসবে নিরামিষ খাচ্ছেন, কিন্তু পূর্বে মাছ-মাংসের স্বাদ নিচ্ছেন। বিবিধের মাঝে এই মিলন আপনা-আপনি চলে এসেছে। এ জন্য কোনো সরকারি ফতোয়ার প্রয়োজন পড়েনি। এমন বৈচিত্রের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভারতে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠের রীতি পছন্দকে দূরে ঠেলে ‘নিরামিষ রাষ্ট্র’ তৈরির চেষ্টা চলছে! ভাবতে অবাক লাগে, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মঞ্চেও সেই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে! নবরাত্রিতে যাঁরা আমিষ খান, তাঁদের ‘ভণ্ড’ বলেছেন এক বাবা! ঈশ্বর বা ভক্তির নামে এই চাপিয়ে দেওয়া ‘ভণ্ড-সংস্কৃতি’-র রমরমা দেখে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সেই অমৃতকথা স্মরণযোগ্য ‘তোর যা প্রাণে চায় তাই খাবি। ঈশ্বরের তাতে কিছু এসে যায় না। ভগবান কি তোর পেটের মধ্যে ঢুকে দেখবেন সেখানে গোরু আছে না শুয়োর আছে নাকি শাকপাতা আছে?’ রাষ্ট্রক্ষমতার ‘স্বঘোষিত’ অধীশ্বররা একথা হয়তো মাথাতেই রাখেন না!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ