রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবি নতুন নয়। নতুনও নয় সেই দাবির পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সোচ্চার হওয়া। কিন্তু এবার ব্রিকসের মঞ্চে, চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিংয়ের সামনেই নরেন্দ্র মোদির ‘আর দেরি নয়’ উচ্চারণটির রাজনৈতিক তাৎপর্য অবশ্যই আলাদা। কারণ, ভারতের এই দাবির পথে সবচেয়ে বড়ো প্রাতিষ্ঠানিক বাধা সেই চীনই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের পক্ষে মত জানিয়েছে, অথচ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো-ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ রাষ্ট্রের অন্যতম চীন আপত্তি জানিয়ে গেলে সংস্কারের দরজা বন্ধই থাকে। ফলে ‘বিশ্বগুরু’র আসনে বসার প্রচার যতই ঢাকঢোল পিটিয়ে করা হোক, বাস্তবের কূটনীতি সেই প্রচারের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে কই? বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি, পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, বৃহত্তম জনসংখ্যার বাজার—এতকিছুর পরেও রাষ্ট্রসংঘের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী মঞ্চে ভারতের স্থায়ী আসন নেই। বিষয়টি নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। আরও অস্বস্তিকর হল, দীর্ঘ বারোবছর ক্ষমতায় থাকার পরেও সেই অপ্রাপ্তির অবসান ঘটাতে পারেনি মোদি সরকার। বিদেশ সফরের বিপুল আয়োজন, রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে করমর্দন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে সদর্প ভাষণ—সবই যদি শেষপর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল আহরণে পর্যবসিত হয়, তবে তাকে কূটনৈতিক সাফল্যের পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান বলা কঠিন। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কার প্রয়োজন—একথা সত্য কিন্তু শুধু দাবি জানালেই সংস্কার হয় না। তার জন্য দরকার দীর্ঘস্থায়ী, সূক্ষ্ম, কঠিন কূটনৈতিক দর-কষাকষি এবং বিশেষত চীনের আপত্তি কাটানোর বাস্তব কৌশল।
এই জায়গাতেই মোদি সরকারের আত্মপ্রচারের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাকটি প্রকট হয়ে ওঠে। ভারত যদি সত্যিই নিজের ‘প্রাপ্য অধিকার’ আদায় করতে চায়, তবে প্রশ্ন উঠবেই—এত বছর ধরে চীনকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে সাফল্য কোথায়? একই প্রশ্ন নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ নিয়েও। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের ওজন বেড়েছে, অর্থনৈতিক শক্তি বেড়েছে, কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে—কিন্তু তার প্রতিটি বৃদ্ধি এখনো কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদায় রূপান্তরিত হয়নি। ফলে বিরোধীরা যখন বলেন, ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার এত প্রচার সত্ত্বেও রাষ্ট্রসংঘে স্থায়ী আসন অধরা কেন, তখন সেই প্রশ্নকে নিছক রাজনৈতিক কটাক্ষ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ব্রিকস মঞ্চে পহেলগাঁও-সহ সীমান্তপারের সন্ত্রাসের নিন্দা, যৌথ ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত করতে পারাটা নিঃসন্দেহে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য। পাকিস্তানকে, এবং পরোক্ষে তার ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনকেও, সেই ভাষা মেনে নিতে হয়েছে। কিন্তু একটি ঘোষণাপত্রে কূটনৈতিক জয় আর নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কার—দুটিকে এক পাল্লায় মাপলে ভুল হবে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতীকী সাফল্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকস মঞ্চে আমেরিকা-বিরোধী তীব্র অবস্থান না নিয়ে বরং আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (আইএমএফ), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লুটিও)-সহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কারের দাবি তোলা তাই বাস্তববাদী পদক্ষেপ। ভারত এখন এমন এক অর্থনৈতিক শক্তি, যার বাজারকে উপেক্ষা করা সহজ নয়। বিপুল জনসংখ্যা, দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং সম্ভাব্য পাঁচ লক্ষ কোটি ডলারের জিডিপি ভারতকে দর-কষাকষির শক্তি দিয়েছে। কিন্তু বাজার বড়ো হলেই দুনিয়া-শাসনের আসরে একটি গৌরবের আসন অটোমেটিক বরাদ্দ হয় না।
অতএব মোদি সরকারের সামনে এখন আসল পরীক্ষা ভাষণের নয়, ফলের। ‘আর দেরি নয়’—এই ঘোষণা শুনতে দৃপ্ত কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির নির্মম বাস্তবতা হল, অধিকার ঘোষণা করে আদায় লাভ হয় না, তার জন্য জরুরি শক্তির সুষম ব্যবহার, মিত্রতা, সমঝোতা এবং প্রয়োজনমতো চাপসৃষ্টির যোগ্যতা। চীনের সঙ্গে একদিকে প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে ব্রিকসের মতো মঞ্চে সহযোগিতা—এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই নিজের সড়ক নির্মাণ করতে হবে ভারতকে। পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টাও চলবে কিন্তু ভারতের প্রধান বাধা পাকিস্তান নয়—নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো এবং বিশেষত চীনের একবগ্গা ভেটো। তাই ‘পথের কাঁটা’ চীনকে শুধু প্রকাশ্য মঞ্চে আক্রমণ করে নয়, তার কৌশলগত স্বার্থের হিসাব বুঝে, প্রয়োজনমতো সমঝোতার দরজা খুলেই মোকাবিলা করতে হবে। একইসঙ্গে ভারতের উচিত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকা-সহ বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমর্থনকে আরও সুসংহত করা। লর্ড পামারস্টনের কথাটি এই মুহূর্তে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা বিশেষ জরুরি—আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই, স্থায়ী হল স্বার্থ। ফলে ‘বিশ্বগুরু’ তকমা নয়, প্রয়োজন হল—বিশ্বশক্তির মতো ফল দেখানো। ইতিহাস ভাষণের শব্দসংখ্যা গণনা করে না, গোনে অর্জন। মোদি সরকার যদি সত্যিই মনে করে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ ন্যায্য অধিকার, তবে এখন সময় সেই অধিকারকে স্লোগান থেকে সাফল্যে রূপান্তরিত করার।