শান্তনু দত্তগুপ্ত: আপনি কি কোভিড তাড়াতে থালা বাজিয়েছিলেন? বাজাননি? আমাদের প্রণম্য প্রধানমন্ত্রী বলার পরও না? তাই জন্যই তো কোভিড এত দেরিতে গিয়েছে। এত মানুষের প্রাণ নিয়েছে। পরের বছর ফিরেও এসেছে। উচিত ছিল আপনার... থালা বাজানো। বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বারান্দা নেই? তাহলে প্রতিবেশীর বারান্দায় গিয়ে বাজানো উচিত ছিল। ফুটপাতে থাকলে, সামনের হাইরাইজের কোনো একটা ঘরে। তাঁরা সাদরে খুলে দিতেন বারান্দার দরজা। যাই হোক, তখন না করলে এবার করুন। আরও একটা সুযোগ আসছে আপনার জন্য। প্রায়শ্চিত্ত করে নিন। আমাদের সবার ‘প্রণম্য’ মোদিজির জন্মদিন। এবার প্রদীপ জ্বালান। ঘরে ঘরে। গোটা দেশ আলোকিত করুন। মহারাজের... মহামানবের জন্মদিনে। ২৫ বছর ধরে তিনি প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে রাজ্য-কেন্দ্র সামাল দিয়ে চলেছেন। এর একটা সেলিব্রেশন হবে না? হতেই হবে। তাই তো দেশজুড়ে প্রদীপ জ্বলবে। আপনিও জ্বালাবেন। রাষ্ট্রগুরুর দীর্ঘায়ু প্রার্থনায়। তিনি হাজার বছর ধরে আমাদের মাথার উপর থাকুন। আচ্ছে দিনের স্বপ্ন দেখান। তাই তো প্রদীপ জ্বলবে! রাজ্যে রাজ্যে নির্দেশ চলে গিয়েছে। এই বাংলাতেও তোড়জোড় চলছে পুরোদমে। কুছ করকে দিখানা হ্যায়... তাই রাজ্য সরকারও নেমে পড়েছে দিয়ার তেলে সাঁতরাতে। আপনি কী ভাবছেন? কওসর আলির কথা? ভাবছেন, হকার উচ্ছেদের তাড়নায় তার রুজিরুটি বন্ধ। চাল কেনার টাকা নেই... প্রদীপ কিনবে কোথা থেকে? ভাববেন না। তাঁর স্ত্রী কি অন্নপূর্ণার টাকা পেয়েছেন? তাহলে প্রশাসনই ব্যবস্থা করবে প্রদীপের। নিয়েও আসবে ‘অকুস্থলে’। সব বেনিফিশিয়ারি একসঙ্গে জ্বালাবে। সব বিধানসভা এলাকায়। নির্দেশ চলে গিয়েছে, প্রত্যেক বিধানসভা এলাকায় ৫০ হাজার প্রদীপ জ্বলবে। ও হ্যাঁ, এই ৫০ হাজার প্রদীপ স্রেফ সরকারি উদ্যোগে। বিজেপির অ্যাসাইনমেন্ট আলাদা। দলের কর্মীরা নিজেদের মতো আলোয় সাজাবে রাজ্য... দেশ। রাজ্যের ও কেন্দ্রের প্রকল্পের সুবিধা যাঁরা পাচ্ছেন, তাঁদের নিয়ে আসা হবে। তাঁরা হাততালি দেবেন। গান গাইবেন... ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে’।
দুরন্ত পরিকল্পনা। দুরন্ত আবহ। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। ছোট্ট চার টাকার প্রদীপ। কিন্তু তারই রোশনাইয়ে ঝলমল করবে গোটা দেশ। উপগ্রহ চিত্রে দেখা যাবে সেই আলোর ছটা। গিনেজ বুকে নাম উঠবে। আহা... চার টাকার হিসাব কষছেন কেন? এমন কত চার টাকার প্রদীপ গোটা দেশে জ্বলবে ভেবেছেন একবারও? বাংলাতেই তো শুধু সরকারি উদ্যোগে প্রায় ১৫ লক্ষ প্রদীপ জ্বলবে। দলীয় উদ্যোগ এবং ভক্ত উদ্যোগ ফাউ। ড্রোন শটে ছবি হবে। রাষ্ট্রগুরুর কাছে সেই ছবি পৌঁছে যাবে। তিনি বলবেন, করেছ কী হে নন্দলাল! আমরাও গদগদ হয়ে যাব আনন্দে। এমন অ্যাপ্রিসিয়েশন পাওয়াও যে ভাগ্যের ব্যাপার! কিছু ‘টুকরে টুকরে’ আছে বটে, এর মধ্যেও প্রদীপের নীচে অন্ধকার খুঁজবে। বলবে এসআইআরে নাম খোয়ানো সেই লোকগুলোর কথা, যারা ট্রাইবুনালে ছুটে ছুটে জুতোর সুকতলা ক্ষয়ে ফেলেছে। তারা বলবে সেই লোকগুলোর কথা... ভোট দেওয়ার পরও যাদের ঠাঁই হয়েছে হোল্ডিং সেন্টারে। যে কোনো দিন পুশব্যাকের আশঙ্কা তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাদের। এদের মার্ক করা উচিত। শেখানো উচিত। কীভাবে জলের মধ্যে থেকে তেলটুকু ছেঁকে নিতে হয়। কীভাবে অন্ধকার অবজ্ঞা করে আলোয় ফোকাস করতে হয়। ভালো ভাবুন, ভালো দেখুন... এটাই শেখাতে হবে এদের। আমাকে-আপনাকেও সেই দায়িত্ব নিতে হবে। প্রদীপ জ্বালতে হবে। আলোটুকুই শুধু দেখতে হবে। জয়গান গাইতে হবে।
কী ভাবছেন? এই মেগা আয়োজনের খরচ কত? অযোধ্যার হিসাবে ভাববেন না কিন্তু! ওখানে দিয়া প্রজ্বলনের জন্য ডোনেশন নেওয়া হয়। আপনি একটি প্রদীপের জন্য ৫১ টাকা দিতে পারেন, আবার প্যাকেজও আছে। এখানে প্রদীপ পিছু ৫১ টাকা ধরলে দরজা খুলে বেরতে পারবেন না। সব সময় দেখবেন, লাঠিসোঁটা হাতে কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে। আপনি খুব বেশি হলে ভাবুন প্রদীপ, সলতে, আর সরষের তেল মিলিয়ে প্রদীপ পিছু খরচ ১০ টাকা। তাহলে ১৫ কোটি টাকার মধ্যে সরকারি কারবার মিটে যাবে। এই রাজ্যে। দেশের হিসাব হচ্ছে না কিন্তু। ভেবে দেখুন, আমাদের বাংলায় এত বড়ো আয়োজন মিটে যাবে মাত্র ১৫ কোটি টাকায়! রাজ্যের কত নাম হবে! হলই বা আপনার-আমার করের টাকায় প্রদীপ উৎসব। বিশ্বগুরুর জন্য এতটুকু আমরা করতে পারব না? সে সব না করে এখন আপনারা হিসাব কষতে বসেছেন? মাথাপিছু মিড ডে মিলে ১০ টাকা খরচ হলে এই ১৫ কোটি টাকায় দেড় কোটি ছেলেমেয়ের একবেলা পেটের ভাত হত! কেউ আবার বলছে, গ্রাম সড়ক যোজনায় প্রতি কিলোমিটারে ৬৮ লক্ষ টাকার মতো খরচ হয়। এই ১৫ কোটি টাকায় গ্রামে ২২ কিমি রাস্তা হয়ে যেত। সত্যি এদের খেয়েদেয়ে কাজ নেই। সরকার কি মিড ডে মিল দিচ্ছে না? নাকি রাস্তা তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রী টাকা দিচ্ছেন না? তাহলে এত খোঁচাখুঁচি কেন? বড্ড বেশি ভাবছেন না? ভাববেন না। ভাবা বারণ। দুর্গাপুজো আসছে। শারদোৎসব নয়। সে নিয়ে ভাবুন। কখন অঞ্জলি দিতে যাবেন, কবে কবে আমিষ খাবেন না, কীভাবে শুদ্ধ হয়ে মণ্ডপে যাবেন... এসব ভাবুন। কেন সরকারের পিছনে পড়েছেন? কবে যে আপনাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে? বুঝি না বাপু। পারলে ১৭ তারিখ ছেলেমেয়েকে নিয়ে পৌঁছে যান প্রদীপ জ্বালাতে। যদি স্কুল থেকেই তাদের নিয়ে যায়, তাহলে আলাদা ব্যাপার। সন্ধ্যা সাতটার সময় তারা ইউনিফর্ম পরে পৌঁছে যাবে দীপোৎসবে। আপনিও যান। আনন্দ করুন। বিশ্বগুরুর জন্য প্রার্থনা করুন।
রবি ঠাকুর সেই কবে লিখে গিয়েছেন, ‘অকারণে তাই প্রদীপ জ্বালাই আকাশপানে... যেখান হতে স্বপ্ন নামে প্রাণে।’ স্বপ্ন নেমে আসছে... বিকশিত ভারতের স্বপ্ন। আচ্ছে দিনের স্বপ্ন। অপেক্ষা চলছে ২০৪৭ সালের। সরকারি নীতি আসছে... জঙ্গলের অধিকার নতুন করে লেখা হচ্ছে। মহার্ঘ পেট্রলে ইথানল মিশিয়ে সস্তা করা করা হচ্ছে। ভোজ্য তেল-চিনির দাম বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তা আপনার-আমারই ভালোর জন্য। আমরা জানতেই পারছি না, এমন উদার রাষ্ট্রশক্তি না থাকলে দাম আরও হয়তো বেড়ে যেত। মহামহিম আমাদের উপর করুণা বর্ষণ করছেন। তাই আমরা বেঁচেবর্তে আছি। তা সত্ত্বেও কিছু লোক রাষ্ট্রের সমালোচনা করে যাচ্ছে। এটাই নেওয়া যায় না। কত সুন্দরভাবে এখন হিন্দু, অহিন্দু, সেকু, মাকু ভাগ করা চলছে। যিশুর ছবি দেওয়ালে ভাবছে, এইবার নেমে পড়লেই হয়। না হলে কোনো না কোনো কট্টরপন্থী ভক্ত এসে হুমকি দেবে। শ্রীরামকৃষ্ণকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিম হবে। গেরুয়া উত্তরীয় উড়িয়ে, মাথায় তিলক কেটে যে কেউ এসে দাবি করবে... আমিই আসল হিন্দু। আপনি নন। ও নয়। উদার মানসিকতার বার্তা দেওয়া কেউ নয়। যদি নিজেকে সনাতনী হিসাবে প্রমাণ করতে হয়, স্বামী বিবেকানন্দকে মেনে চললে হবে না। সারদা মায়ের কথা মনে পড়লেও চলবে না। ময়দানে নামতে হবে। প্রদীপ জ্বালাতে হবে। প্রমাণ করতে হবে, আপনি বিশ্বস্ত। রাষ্ট্রের প্রতি। রাষ্ট্রগুরুর প্রতি। তার জন্য কোনো প্রশ্ন করলে চলবে না। যা নির্দেশ আসবে, সেটাই মেনে চলতে হবে। এটাই ভবিতব্য। এটাই যথার্থ নাগরিক হওয়ার শর্ত। এসব ছেড়ে কি না আপনারা কাঁইকিচির করে যাচ্ছেন। কোনো মানে হয়?
বাংলায় এই প্রথম ডবল ইঞ্জিন বিজেপি সরকার। তাই তো রাজ্য ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তোলাবাজি, দুর্নীতি, দাদাগিরির অভিযোগ থালায় বেড়ে কাঁদবেন না। সরকার থাকলে এটুকুও থাকে। শমীকবাবু বলে দিয়েছেন, ওরা কেউ বিজেপির নয়। অন্য কেউ এসব করছে। হয়তো তৃণমূলই। আর কিছু লোকজন কি না বিজেপিকে দুষছে। বালখিল্য আচরণ! সেবা সপ্তাহ শুরু হচ্ছে দেশজুড়ে। প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন বলে কথা। এই মুহূর্তকে সাক্ষী রেখে চলুন আমরা সবাই চোখ-কান বন্ধ করে ফেলি। মস্তিষ্কে খানিক মডিফিকেশন করে নিই। আমাদের প্রমাণ করতে হবে, আমরা দিমাগি নকশাল নই। আমরা সনাতনী। চলুন যাই... প্রদীপ জ্বালাই। গোটা বাংলাকে আলোয় ঝিকমিক করে তুলি। রবি ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে...’। আজ তিনি থাকলে হয়তো লিখতেন, এত আলো জ্বালিয়েছ এই বিকশিত অঙ্গনে...। এটাই হোক স্লোগান। নতুন ভারতের। সেখানে বিবেক, বিবেচনা, বিশ্লেষণ স্রেফ অবাঞ্ছিত। শেষ কথা একটাই—ভক্তি। অন্ধভক্তি।