১০ বছর আগে নোটবাতিলের যন্ত্রণা দিয়ে তামাম দেশবাসীকে ডিজিটাল পেমেন্টের দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল মোদি সরকার। ‘ভবিষ্যতের ভারত’-এর মশাল বানানো হয়েছিল ইউপিআইকে। দোকানের সামনেই কিউআর কোড। মোবাইল বের করুন আর টাকা মিটিয়ে দিন—মাশুল নেই, ঝামেলা নেই। এখন সেই পেমেন্ট থেকেই মোদি সরকার মাশুল আদায় করতে চলেছে। আগামী ১৫ অক্টোবর, অর্থাৎ দুর্গাপুজোর চতুর্থীই সেই শুভক্ষণ। বড়ো ব্যবসায়ী ও সংস্থায় ২০০০ টাকার উপরে কেনাকাটা করলেই কার্যকর হবে ০.৪ শতাংশ এমডিআর বা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট। এই রেট অনুযায়ী ৭৫ হাজার টাকা বা তার ঊর্ধ্বে সর্বোচ্চ মাশুল ৩০০ টাকা। কিন্তু কে সেই টাকা দেবে? সরকার বলছে, বড়ো ব্যবসায়ী বা সংস্থাগুলিকেই তা দিতে হবে। টাকা ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া যাবে না। আত্মীয়-বন্ধু পরিচিতকে ইউপিআইতে টাকা দিলে কোনো চার্জ দিতে হবে না। ছোটো ব্যবসায়ী, রাস্তার বিক্রেতা এবং ২,০০০ টাকার কম লেনদেনও থাকছে ছাড়ের আওতায়। আর রেল, পেট্রল-ডিজেল, বিমা ইত্যাদি নির্দিষ্ট কিছু জরুরি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ টাকার ফ্ল্যাট এমডিআর থাকবে। কিন্তু বড়ো ব্যবসায়ীর ঘাড়ে খরচ চাপলে তার অভিঘাত শেষ পর্যন্ত ক্রেতা বা সাধারণ গ্রাহকের পকেটে পড়বে না? নাকি সমাজ আবার নগদ লেনদেনের দিকে ফিরে যাবে? এটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।
একে এটিএম-ব্যাংকে টাকা তোলার সর্বোচ্চ সীমা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকে গচ্ছিত নিজের টাকা মাসে পাঁচবারের বেশি তুলতে গেলে জরিমানা দিতে হয়। তার উপর এই পদক্ষেপ গোদের উপর বিষফোঁড়া! সরকারের অবশ্য যুক্তি, এমডিআর কোনো কর নয়, এই টাকা ব্যাংক, পেমেন্ট পরিষেবা সংস্থা এবং ইউপিআই অ্যাপগুলির মধ্যে ভাগ হবে। দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ ইউপিআই লেনদেনেই ২০০০ টাকার কম। ফলে নতুন মাশুলে তেমন কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু অর্থনীতির কাগুজে হিসাব যতই সুন্দর হোক, বাজারের বাস্তব অঙ্কটা সর্বদা অন্য রকম। ব্যবসায়ীর খরচ বাড়লে তার প্রতিক্রিয়া কোথাও না কোথাও পড়বেই। বর্তমানে কার্ডে দামি জিনিস কিনতে গেলে বহু ক্রেতাই শুনেছেন—‘কার্ডে দিলে ২ শতাংশ টাকা বেশি লাগবে।’ ব্যবসায়ী পিওএস ব্যবহারের খরচের কথা বলেন, আর ক্রেতা বাড়তি টাকা দেন। আশঙ্কাটা এখানেই। পণ্যের দাম, পরিষেবার চার্জ, ডিসকাউন্টের হিসাব—এই সব জায়গায় সেই খরচ ঢুকে পড়বে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? কাল পর্যন্ত যে দোকানদার বলতেন, ‘ইউপিআই করলে অতিরিক্ত টাকা লাগবে না’, তিনিই যদি আগামী দিনে পণ্যের দামে সামান্য বাড়িয়ে দেন, ক্রেতার কী আর করতে পারবেন? তার উপর ছোটো ব্যবসায়ী কারা, সেই সংজ্ঞাও দিয়েছে সরকার। তা হল কিউআর কোডে মাসে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় হলে, তাঁদের এমডিআর দিতে হবে না। কিন্তু রোজগার মাসে এক লক্ষ টাকা পেরিয়ে গেলে? তখন তিনি নিজের ব্যক্তিগত ইউপিআই ব্যবহার করবেন নাকি এমডিআর দেবেন? আর এখানেই প্রশ্নটা শুধু ০.৪ শতাংশের নয়। চলতি বছর আগস্টেই দেশজুড়ে ২৪৫০ কোটি ৯৬ লক্ষ ডিজিটাল পেমেন্ট হয়েছে। লেনদেনের মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ২৯ লক্ষ ৮২ হাজার কোটি। এত বিপুল লেনদেনে সামান্য খরচও শেষ পর্যন্ত সামান্য থাকে না। বিশেষ করে যে ব্যবসায়ীদের লাভের মার্জিন কম, তাঁদের কাছে প্রতিটি শতাংশের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।
উঠছে আরও একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। কংগ্রেসের অভিযোগ, আমেরিকার চাপেই ভারত ফ্রি ইউপিআই নীতি থেকে সরে আসছে। বাণিজ্য চুক্তিতেই এমন শর্ত রাখা হয়েছিল ট্রাম্প সরকারের তরফে। মোদি সরকার নতজানু হয়ে পড়েছে মার্কিন চাপের মুখে। সরকারের অবশ্য বক্তব্য, এসব বাজে কথা! নতুন এই মাশুলের লক্ষ্য ইউপিআই ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা। যুক্তি সঠিক। কিন্তু সেই টেকসই ব্যবস্থা যদি শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়? সাধারণ মানুষ এমডিআর কী, পিএসপি কী, সেটলমেন্ট কী—এসব বোঝেন না। তিনি শুধু বুঝবেন, গত মাসে যে জিনিসের দাম ৫০০০ টাকা ছিল, তা এমডিআর চালুর পর ৫০৪০ টাকা হল কি না। শেষ পর্যন্ত ইউপিআইয়ের আসল পরীক্ষা সেখানে। পরীক্ষা সরকারেরও। ক্রেতার পকেট থেকে টাকা না কেটেই চালু রাখতে হবে ডিজিটাল পেমেন্ট!