Bartaman Logo
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কেন চীন কোনো যুদ্ধ করে না?

সুপার পাওয়ার মানেই তো মাঝেমধ্যে বিভিন্ন দেশকে হুমকি হুঁশিয়ারি দেবে। তারা অসীম শক্তিধর এবং তাদের নির্দেশিকা ও ইচ্ছা মেনেই অন্য কিছু প্রতিস্পর্ধী দেশকে চলতে হবে, এরকম একটি পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ মনোবাসনা থাকে সুপারপাওয়ারদের।

কেন চীন কোনো যুদ্ধ করে না?
  • ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: সুপার পাওয়ার মানেই তো মাঝেমধ্যে বিভিন্ন দেশকে হুমকি হুঁশিয়ারি দেবে। তারা অসীম শক্তিধর এবং তাদের নির্দেশিকা ও ইচ্ছা মেনেই অন্য কিছু প্রতিস্পর্ধী দেশকে চলতে হবে, এরকম একটি পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ মনোবাসনা থাকে সুপারপাওয়ারদের। শক্তি আছে অথবা শক্তির প্রদর্শন করছি না, এরকম সংযম রক্ষা করা কঠিন এবং আধুনিক কূটনীতিতে সেটা সর্বদা গ্রহণীয় নয়। একটু আধটু চোখ না রাঙালে আমাকে সমীহ করবে কেন?  পরবর্তী ধাপ হল, আমার বিরুদ্ধাচারণ করলে, আমার নির্দেশ অমান্য করলে, কোনো দেশকে আমার অধীনে নিয়ে আসার ইচ্ছা হলে আমি তখন আর আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মানব না। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করব। আমেরিকা এবং রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই মনোভাব এবং প্রবণতা হামেশাই দেখা যায়। বিগত ৫০ বছর ধরে আমেরিকা এবং রাশিয়া মাঝেম঩ধ্যেই কোনো না কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া আমেরিকার তো প্রায় নিত্য-নৈমিত্তিক শখে পরিণত হয়েছে। সাদ্দাম হোসেন অথবা খামেনেই। আইসিস কিংবা তালিবান। আমেরিকার শুধু অজুহাত চাই একটির পর এক যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করার। 

Advertisement

আমেরিকা এ পর্যন্ত আধুনিক বিশ্বে কত যুদ্ধ করেছে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, গ্রানাডা, পানামা, পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ, বলকান যুদ্ধ, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে আক্রমণ, ইরাক আগ্রাসন। এরপর থেকে লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরান। অন্তহীন যুদ্ধ। 
রাশিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া, আফগানিস্তান, চেচনিয়া, জর্জিয়া, সিরিয়া, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। এই মুহূর্তে আমেরিকা ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে। রাশিয়া প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ করছে ইউক্রেনের সঙ্গে। 
অথচ বিস্ময়কর এক অবস্থান নিয়ে অন্যতম সুপারপাওয়ারের অবস্থান গ্রহণ করেও চীন গত ৪৭ বছরে একটিও প্রত্যক্ষ যুদ্ধ করেনি। সামরিক অভিযান বলতে যা বোঝায়, সরাসরি আকাশ, স্থল অথবা নৌবাহিনী কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে চরম অস্ত্র নিক্ষেপে জড়িয়ে পড়েছে এরকম পরিস্থিতি চীন তৈরিই করেনি। 
তার অর্থ এই নয় যে, চীন খুব শান্তিপ্রিয়, নিরীহ, কম আগ্রাসী কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র। বরং চীন অবশ্যই প্রবলভাবে সাম্রাজ্যবাদী। তাইওয়ান হোক অথবা জাপান। ভারত কিংবা ফিলিপাইনস। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা ব্রুনেই। এই সকল দেশের মনে চীন সম্পর্কে রয়েছে সন্দেহ, রাগ এবং  তীব্র এক বিরক্তি। ভারতের সঙ্গে মূলত সীমান্ত সমস্যা। ভারত বিশ্বাস করে না চীনকে পূর্ণাঙ্গভাবে। করা উচিতও নয়। এছাড়া এই তালিকায় বাকিদের সিংহভাগের সঙ্গেই বিরোধের ভরকেন্দ্র দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আধিপত্যবাদ। তাইওয়ানকে পৃথক অস্তিত্ব মানতেই চায় না চীন। জাপানের সঙ্গে দীর্ঘকালের বিরোধ সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে।
দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের  কেন এই আগ্রাসন? এর নাম গ্রে জোন ট্যাকটিক্স। নৌবাহিনী মোতায়েন করে সিংহভাগ সমুদ্ররুট ও এলাকা নিজের দখলে রাখা। আবার পাশাপাশি স্থলপথে বেল্ট অ্যান্ড রোড করিডর তৈরি করে এশিয়া থেকে ইওরোপ পর্যন্ত নিজের বাণিজ্য আধিপত্যকে সুনিশ্চিত করা। 
চীনের সবথেকে বড়ো উদ্বেগ হল, মালাক্কা প্রণালী। প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও ২০০৩ সালে যাকে আখ্যা দিয়েছিলেন, মালাক্কা ডায়ালেমা। মালাক্কা দ্বিধা।  চীনের ৮০ শতাংশ অশোধিত তেল এবং সিংহভাগ বাণিজ্য পরিবহণের রুট এই প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত প্রণালী। শুনতে এক হাজার কিলোমিটার বিরাট প্রশস্ত মনে হলেও সমুদ্রপথে এটা অত্যন্ত সংকীর্ণই বলা যায়। যে কোনো বৃহৎ যুদ্ধে চীন অবতীর্ণ হলে বা জড়িয়ে পড়লে এই মালাক্কা প্রণালী প্রতিপক্ষরা বন্ধ করে দিতে পারে। আর তাহলেই চীনের সর্বনাশ হবে। তাই চীনের সারাক্ষণ ভারত মহাসাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের  সংযোগকারী এই প্রণালী নিয়ে চিন্তা। 
বহু দেশের সঙ্গে  সংবৎসরের  মনস্তাত্ত্বিক, কূটনৈতিক এবং সীমান্ত দখলের সংঘাত থাকলেও বিগত ৪৭ বছর ধরে কোনো যুদ্ধ করেনি চীন। প্রশ্ন হল কেন? সবরকম আগ্রাসী মনোভাব নীরবে দেখিয়ে যাব, কিন্তু যুদ্ধ করব না। এই কৌশলের কারণ কী? জিওপলিটিক্সে এই মনস্তত্ত্ব এক রহস্য সৃষ্টি করেছে। নিজের বন্ধুরাষ্ট্র কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে গেলে চীন পিছন থেকে মদত এবং সামরিক সাহায্য দেবে। যেমন অতি সাম্প্রতিক অপারেশন সিন্দুরজনিত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। চীনের ফাইটার জেট, চীনের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, চীনের ড্রোন, চীনের মিসাইল ব্যবহার করেছে পাকিস্তান। কিন্তু চীন একবারও প্রকাশ্যে আসেনি। একবারও ভারতকে সরাসরি হুঁশিয়ারি, হুমকি দেয়নি যে, তারা পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করবে। 
শেষ কবে চীন যুদ্ধ করেছে? ভিয়েতনামে তারা শেষবার আগ্রাসী অভিযান চালিয়ে প্রবেশ করেছিল ১৯৭৯ সালে। ১৯৪৯ সালে চীনের বিপ্লবের পর থেকে কোরিয়া, ভারত এবং রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সরাসরি যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ১৯৭৯ সালের পর থেকে চীন যুদ্ধনীতিকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছে। আর যুদ্ধ করেনি। 
আমেরিকা এই সময়কালে ৮ লক্ষ কোটি ডলার ব্যয় করেছে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধ’ নামক প্রকল্পে। রাশিয়ার পুঁজির বিপুল অংশ খরচ হয়েছে এবং হয়ে চলেছে যুদ্ধে। কিন্তু চীন নিজের সম্পদকে সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ লগ্নিতে ব্যবহার করেছে। চীন  অস্ত্র নির্মাণে প্রায় আত্মনির্ভর। যদিও হাই এন্ড জেট ইঞ্জিন অথবা এয়ার ডিফেন্স কিংবা কিছু মেরিটাইম ইঞ্জিন ফ্রান্স ও রাশিয়া থেকে ক্রয় করে চীন। কিন্তু সেসব সামান্য। সুতরাং প্রতিরক্ষা ক্রয়ে বিরাট কোনো লগ্নি নেই। যে লগ্নি হয়, সেই অর্থ  নিজের দেশেই থেকে যায়।
চীন মনে করেছে সামরিক অভিযানের থেকেও বাণিজ্য অভিযান বেশি কার্যকরী। বিশ্বের বহু দেশকে লোন দিয়ে, প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে, রাস্তা, বন্দর, এয়ারপোর্ট, হাইওয়ে, এসইজেড ইত্যাদি নির্মাণে আর্থিক ঋণ ও অনুদান ও টেকনিক্যাল সহায়তা দিয়ে সেইসব দেশকে কৃতজ্ঞতা ও ঋণপাশে আবদ্ধ করে রাখা যাবে। বিশ্ব ঘটনাপঞ্জির আড়ালে চীন এই নীতিকে অনুসরণ করে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বহু দেশকে ঋণ, আর্থিক অনুদান এবং পরিকাঠামো সহায়তার জালে আটকে ফেলেছে। এইসব দেশ কোনো বড়োসড়ো ইস্যুতে চীনের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করতে পারে না। 
পৃথিবীতে ভবিষ্যতে কী কী পণ্য, পরিষেবা এবং প্রযুক্তি সবথেকে বেশি  আসতে চলেছে ও তার দখলদারি আগেভাগেই নিয়ে নিতে হবে, এই অঙ্ক সর্বাগ্রে করে আমেরিকা এবং চীন। সেই কারণেই এআই, সেমিকন্ডাকটর, রেয়ার আর্থ, ক্রিটিকাল মিনারেলস, কোবাল্ট, তেল, মহাকাশ এই 
প্রত্যেকটি সেক্টরকে সবথেকে আগে হস্তগত করা ও গবেষণা শুরু করে দিয়েছিল এই দুই দেশ। আর নিজেদের ভাণ্ডার পূর্ণাঙ্গ করে ফেলেছে। এই দূরদৃষ্টি ও ভিশন অন্য উন্নত ও উন্নতশীল দেশগুলি দেখাতে পারছে না। আমেরিকা পাশাপাশি প্রচুর গুলি, মিসাইল, টোমাহক নিক্ষেপ করেছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। কিন্তু চীন যুদ্ধে একটিও গুলি খরচ করেনি আজ পর্যন্ত বিগত ৪৭ বছরে। যা হয়েছে সবই সীমান্তে সংঘাত। খুবই সামান্য তার আর্থিক বোঝা। 
প্রশ্ন হল, এই যুদ্ধনীতির সবটাই কি চীনের পক্ষে মুনাফাজনক? কোনো নেতিবাচক প্রভাব কি নেই? আছে। সেটাকে আন্তর্জাতিক সামরিক রণকৌশলের পরিভাষায় বলা হয় ‘পিস ডিজিজ’। অর্থাৎ শান্তিজনিত অসুস্থতা। দীর্ঘকাল ধরে কোনো রাষ্ট্র কোনো যুদ্ধ না করলে মাঠে নেমে যুদ্ধের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সেই দেশের সামরিক বাহিনীর কোনো অভিজ্ঞতা তৈরি হয় না। যতই প্রবল শক্তিসম্পন্ন আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জাম থাকুক, সেগুলির পরীক্ষা হয়েছে সবই দেশের মধ্যে। যুদ্ধের সময় তো হয়নি। আদৌ ওইসব অস্ত্র যুদ্ধের সময় প্রতিপক্ষের সামনে কতটা কার্যকরী, সেটার প্রমাণ হয়নি। 
এই ‘পিস ডিজিজ’ প্রকৃত যুদ্ধের সময় বহু দেশকে ইতিহাসে পরাজিত করে দিয়েছে। রাশিয়া, আমেরিকা কিন্তু লাগাতার যুদ্ধ করেই চলেছে। তাদের ভুল হচ্ছে। সাফল্যও আসছে। অন্যতম একটি কারণের কথা বলা হয় চীনের যুদ্ধবিমুখতা নিয়ে। সেটি হল, যদি কোনো একটি সংঘাতে চীনের সামরিক বাহিনী ধাক্কা খায় কিংবা পরাজিত হয়, তাহলে চীনের রাজনীতিতে তোলপাড় হয়ে যাবে। কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ যে সংঘাত, সেটি প্রকট হয়ে বিরোধী শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে জি জিনপিংদের সরিয়ে দেবে! সেই ঝুঁকি নিতে চায় না চীনের কোনো শাসক। 
যদিও এটা নিয়েও সন্দেহ নেই যে, যুদ্ধে না জড়িয়ে চীনের সম্পদবৃদ্ধি, জিডিপির পরিমাণ এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বহুগুণ বেড়েছে বিগত ৪৭ বছরে। আবার এটাও ঠিক যে, অবিরত যুদ্ধ করে হয়তো আমেরিকা অনেক বেশি যুদ্ধ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফেলেছে। সেটা কালক্রমে সুবিধাজনক হয়ে যেতে পারে।
প্রশ্ন হল, চীন কতদিন এই যুদ্ধ না করার নীতি নিয়ে অগ্রসর হবে? চীনের বিখ্যাত যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ সান জুর দর্শন ছিল, লড়াই না করে জয়। সেই দর্শনকে বলা হয়, উইনিং উইদাউট ফাইটিং! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ