স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: বাঙালির মস্ত দোষ সে তার আপনার লোককে চিনতে পারে না। এ কথা শিল্পী, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র পরিচালক সবার ক্ষেত্রেই প্রায় সত্যি। যতক্ষণ না পর্যন্ত কেউ বিদেশে স্বীকৃতি পাচ্ছেন, ততক্ষণ আমাদের কাছে যেন তাঁর কদর নেই। রবীন্দ্রনাথ নোবেলে না পেলে এ দেশে তাঁকে নিয়ে এত হইচই হত কি না সন্দেহ আছে। সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘পথের পাঁচালী’ বিদেশে পুরস্কৃত না হলে এ দেশের সমালোচক মহলের একাংশের মধ্যে তা কতটা সাড়া ফেলত সেটাও ভাববার বিষয়। আর কেউ জনপ্রিয় হলে তো কথাই নেই। আমাদের সমালোচক মহলের কেউ কেউ তাঁকে আবার সস্তা বলে ধরে নেয়। এত জনপ্রিয় হলেও যে কারণে বোধহয় জীবিত অবস্থায় উত্তমকুমারের অভিনয় প্রতিভা আজকের মতো এতখানি স্বীকৃতি পায়নি বোদ্ধাদের কাছে! এই বিড়ম্বনা জুটেছিল দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কপালেও। না হলে ৩১ ভাদ্র তাঁর জন্মের সার্ধশত বর্ষের সূচনা হলেও চারিদিক নিঃঝুম। কোথাও তেমন কোনো অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা কিছুই প্রায় নেই!
আমরা যেন ধরেই নিয়েছি যে, তিনি জনপ্রিয়, অতএব তিনি আমাদের এত কাছের যে এ সব না করলেও চলবে। তাই অন্য সাহিত্যিকদের নিয়ে যত মাতামাতি হয় আমাদের দেশে, শরৎচন্দ্রের ভাগ্যে তার ছিটেফোঁটাও জোটে না। অথচ তাঁর জীবিতকালে এবং মৃত্যুর পর আজ পর্যন্ত শরৎ সাহিত্যের যে তুমুল জনপ্রিয়তা, তা যে কোনো সাহিত্যিকের কাছে ঈর্ষণীয়। আশা ভোঁসলে তাঁর এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে, তাঁরা বড়ো হয়েছেন দু’ জন সাহিত্যিকের লেখা পড়ে। তার মধ্যে একজন অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ, আর দ্বিতীয়জন হলেন শরৎচন্দ্র। অবাক করার মতো ব্যাপার হল, শরৎচন্দ্রের সব উপন্যাস, ছোটো গল্প আশাজির প্রায় মুখস্থ ছিল। মারাঠি ভাষায় অনুদীত শরৎচন্দ্রের গল্প, উপন্যাস ছোটোবেলাতেই পড়ে ফেলেছিলেন তিনি। তাঁর মুখেই শোনা, তখন মহারাষ্ট্রে বাসিন্দাদের অনেকের মনেই এই ভুল ধারণা ছিল যে, শরৎচন্দ্র বোধহয় মারাঠি লেখক, এবং এই ধারণা বহুদিন পর্যন্ত চলেছিল। দক্ষিণ ভারতেও সবকটি ভাষাতেই শরৎচন্দ্রের লেখার অনুবাদ হয়েছে। সম্ভবত শরৎচন্দ্রই এ দেশের একমাত্র সাহিত্যিক যাঁর সাহিত্য অবলম্বনে ভারতের বিভিন্ন ভাষায় প্রায় ৪০টি সিনেমা তৈরি হয়েছিল। তার মধ্যে ‘দেবদাস’-ই হয়েছিল ১৯ বার। শুধু ভারতেই নয়, পাকিস্তানে এবং বাংলাদেশে দু’ বার করে তৈরি হয়েছিল ‘দেবদাস’। মালয় ভাষাতেও তৈরি হয়েছিল শরৎচন্দ্রের কম বয়সে লেখা এই ‘ইমমর্যাল’ সাহিত্যটি। অনেকেই জানেন না, শরৎচন্দ্র একটি ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারও পেয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে বাসু চট্টোপাধ্যায়ের ছবি ‘স্বামী’-র কাহিনিকার হিসাবে মরণোত্তর ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার জুটেছিল তাঁর কপালে। ভারতীয় সাহিত্যিকদের মধ্যে এত জনপ্রিয়তা আর কেউ পেয়েছিলেন কি না জানা নেই। তবে এখনও শরৎচন্দ্র আধুনিক চলচ্চিত্র পরিচালকদের পছন্দের সাহিত্যিক। না হলে অনুরাগ কাশ্যপ, সঞ্জয়লীলা বনশালি, প্রয়াত প্রদীপ সরকার থেকে হালের সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় কেন শরৎচন্দ্রকে বারে বারে সিনেমার পর্দায় নিয়ে আসবেন।
কিন্তু শুধুমাত্র জনপ্রিয়তা দিয়ে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকে বিচার করলে ভুল হবে। তাঁর প্রতিটি উপন্যাস, ছোটো গল্পে তিনি তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগাতে চেয়েছেন। যা এক সময়ে রাশিয়ায় করেছিলেন আন্তন চেকভ, ম্যাক্সিম গোর্কির মতো সাহিত্যিকরা। তাঁর লেখায় সে সময়ের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, জাতপাতের বিচার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও নারীদের উপর সমাজের অবিচারের নানা কাহিনি উঠে এসেছে। তাঁর সুনিপুণ লেখনীর গুণে সেই পুরানো, পচাগলা মূল্যবোধের বিরুদ্ধে পাঠকের মধ্যে ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর সাহিত্যে কোথাও সেভাবে সরাসরি কোনো মেসেজ বা বা বার্তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা করেননি। বরং শিল্পী হিসাবে তাঁর সমাজ সম্পর্কিত চিন্তাভাবনাকে শৈল্পিক উপায়ে এমন ভাবে উপস্থিত করেছেন যে, তাতেই মানুষের মনে যে ডঙ্কা বাজানোর দরকার ছিল, তা বেজে উঠেছে। এটাই তো প্রকৃত শিল্পীর কাজ।
উদাহরণ হিসাবে তাঁর বহুপঠিত একটি উপন্যাস ও একটি ছোটো গল্পের কথা এ প্রসঙ্গে আনা যায়। উপন্যাসটি হল ‘দেবদাস’। যাঁকে তিনি নিজে কাঁচা বয়সের অপরিণত লেখা বলে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিলেন। তিনি যখন এটি লিখেছিলেন তখন তাঁর বয়স কুড়ি পেরোয়নি। প্রায় ১৬ বছর ধরে এটি অপ্রকাশিত অবস্থায় পড়ে থাকার পর ১৯১৭ সালে গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স এটি প্রকাশ করে এবং প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া পড়ে যায় পাঠক মহলে। শরৎচন্দ্র যে লেখাকে অপরিণত বয়সের ফসল বলে বর্ণনা করেছিলেন, সেই উপন্যাসেই দেখা যায় অর্থনৈতিক অসাম্যকে কীভাবে ভিলেন করেছেন তিনি উপন্যাসে। দেবদাস ও পার্বতীর বিয়ে হয় না স্রেফ দুই পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে। যদিও দেবদাসের চারিত্রিক দুর্বলতাও অন্যতম কারণ ছিল। কিন্তু একটি প্রেমের করুণ পরিণতির পিছনে শরৎচন্দ্র মূলত আর্থিক অসাম্যকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন এই উপন্যাসে। অন্যদিকে ছোটো গল্প ‘মহেশ’ ধর্মীয় গোড়ামির মূলে কুঠারাঘাত করে। গরিব চাষি গফুর তাঁর গোরুটিকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। কিন্তু জমিদারের খাজনা মেটাতে গিয়ে তাদের নিজেদেরই খাওয়া জোটে না। তা সত্ত্বেও গোরুর খাবার জোগাড় করতে সে জমিদারের হাতেপায়ে ধরতে বাকি রাখে না। কিন্তু নিষ্ঠুর জমিদারের মন তাতেও গলে না। শেষে পরিস্থিতির চাপে রাগের মাথায় প্রাণাধিক প্রিয় মহেশের মৃত্যু হয় গফুরের হাতে। গোরুকে মারার দায় চাপে গরিব চাষির কাঁধে। এ গল্প একদিকে দেখায় মুসলমান হয়েও গোরুর প্রতি ভালোবাসা গফুরের কোনো হিন্দুর চেয়ে কম ছিল না। অন্যদিকে হিন্দু জমিদারের চাপে সে গোরুকে খেতে দিতে পারে না। শেষে দশচক্রে ভগবান ভূত হয়ে যায়। শরৎচন্দ্রের প্রতিটি গল্প, উপন্যাসেই এইরকম সামাজিক অন্যায়, অসাম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে। যা কখনোই সোচ্চার নয়, বরং ফল্গুধারার মতো অন্তর্লীন। বিশেষত বাংলার মা, বোনেদের প্রতি সমাজের অন্যায্য আচরণ শরৎচন্দ্রকে সবচেয়ে বেশি ব্যথিত করেছে। যার ফলে তাঁর হাতে সৃষ্টি হয়েছে, বিরাজ বৌ, রামের সুমতি, চরিত্রহীন, পরিণীতার মতো সাহিত্য।
জনপ্রিয় হলেই যে সেই শিল্পীর সৃষ্টিতে গভীরতা থাকবে না, এ ভাবনা অর্থহীন। এ দেশে সেই ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেয় শরৎচন্দ্র রচিত সাহিত্য। শেক্সপিয়রের নাটকও ইংল্যান্ডে প্রভূত জনপ্রিয় ছিল, আছে ও থাকবে। কিন্তু তার জন্য ইংল্যান্ডের সাহিত্য ও শিল্পের সমালোচকরা তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখেননি। বরং শেক্সপিয়রের নাটকের মাহাত্ম্য তাঁরা তুলে ধরেছেন। চার্লি চ্যাপলিনও গোটা বিশ্বে প্রবল জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু তার জন্য তাঁর সিনেমাকে মার্কিন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা কোনোদিন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেননি। উলটো প্রথা দেখি আমাদের দেশে। এখানে যাঁর শিল্প যত অবোধ্য হয়, সাধারণ মানুষের থেকে শতহস্ত দূরে থাকে, ততই তাঁর শিল্পের কদর বাড়ে। এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আশা করি আমাদের শিল্প সমালোচকরা বেরিয়ে আসবেন। মুম্বইয়ে অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে ডক্টরেট করেন গবেষকরা। কিন্তু আমাদের রাজ্যে শরৎচন্দ্র ব্রাত্য থেকে যান।