Bartaman Logo
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

তেল ক্রয়ে ভারতের স্বাধীনতা

সস্তার তেল কিনবে ভারত—এই ঘোষণার মধ্যে শুধু জ্বালানি আমদানির হিসাব নেই, আছে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নটিও। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে পাশ হয়েছে লিন্ডসে গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬।

তেল ক্রয়ে ভারতের স্বাধীনতা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সস্তার তেল কিনবে ভারত—এই ঘোষণার মধ্যে শুধু জ্বালানি আমদানির হিসাব নেই, আছে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নটিও। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে পাশ হয়েছে লিন্ডসে গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬। বিলটি প্রেসিডেন্টকে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড়ো ক্রেতা দেশগুলির পণ্যে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিতে পারে। তবে বিল মোতাবেক এই সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতা ট্রাম্পের একান্ত। এর লক্ষ্য যে ভারত ও চীন, তা একদম স্পষ্ট। মার্কিন সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল সরাসরি বলেছেন, ভারত ও চীনকে রাশিয়ার বাইরে থেকে তেল ও গ্যাস কিনতে হবে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক চাপসৃষ্টির মাধ্যমে ইউক্রেন-যুদ্ধে রাশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি খর্ব করাই ওয়াশিংটনের কৌশল। এই যুক্তির আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন যেটাই হোক, ভারতের সামনে প্রশ্নটি আরও সরল—দেড়শো কোটি মানুষের জ্বালানি-নিরাপত্তা কি অন্য দেশের বিদেশনীতির বিষয় হয়ে থাকবে? মার্কিন চাপ, শুল্ক-হুমকি এবং বাণিজ্যিক দরকষাকষির আবহে নয়াদিল্লির তুলনামূলক সংযত অবস্থানের পরে এবার বিদেশ মন্ত্রকের বার্তা যথেষ্ট সাহসী: ভারতের জাতীয় স্বার্থই অগ্রাধিকার, এবং সেই স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক পথ খোলা থাকবে। কথাটা শুনতে যতটা স্বাভাবিক, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার তাৎপর্য ততটাই ইন্টারেস্টিং। কারণ এতদিন ধরে কৌশলগত অংশীদারিত্বের অভিধানে ভারত-মার্কিন সম্পর্কের জন্য যতই মধুর কিছু শব্দ সজ্জিত থাক, তার চূড়ান্ত অর্থ দাঁড়াত—স্বার্থ।

Advertisement

আর তারই কেন্দ্রে এখন খনিজ তেল। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রাশিয়া থেকে ভারত প্রায় ৪০.৮ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেল কিনেছে, যা ছিল এই পণ্যটির‌ মোট আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশ। গত জুলাই মাসে রাশিয়ার অংশ প্রায় ৫১ শতাংশে পৌঁছেছিল। এগুলি কেবল পরিসংখ্যান নয়—ভারতের শিল্প, পরিবহণ, বিদ্যুৎ, কৃষি এবং নাগরিকের জীবনযাত্রার খরচের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। রাশিয়ার তেল সস্তায় মিললে ভারত তা কিনবে—এতে আপত্তির কী আছে? যে-দেশ নিজের স্বার্থে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, সে-দেশই যদি চায় অন্য সার্বভৌম রাষ্ট্র তার জ্বালানি-সরবরাহের উৎসও তার নির্দেশমতো বেছে নিক, তাহলে সেটি সহযোগিতা নয়, একতরফা আনুগত্যের প্রত্যাশা। আরও মজার বিষয় হল, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ-অনিশ্চয়তা বাড়লে তেলের দাম বাড়ে, আর ভারতকে তখন বলা হয়—‘সস্তা’ রুশ তেল ছেড়ে অন্য জায়গা থেকে কেনো। ভারতের অর্থনীতি কি কোনো পরীক্ষাগারের গিনিপিগ? তার উপর সাগরপারের ‘মহান’ নীতিনির্ধারকদের উপর্যুপরি পরীক্ষা চালাবার সুযোগ সৃষ্টি করে দেব আমরা! রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ভারতের নিজস্ব সিদ্ধান্ত—এ যেমন সত্য, তেমনই সত্য যে অতিরিক্ত একক-নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ভারতের নীতি হওয়া উচিত, উৎসের বৈচিত্রসন্ধান, কিন্তু সেটিও হবে অবশ্যই নিজ প্রয়োজন এবং বাজারনির্দিষ্ট, কোনো মাতব্বরের ভ্রূকুটির ভয়ে নয়। ট্রাম্প সাহেব যদি শুল্কের লাঠৌষধি দেখান, মোদিও যে তখন নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থকে ঢাল করে দাঁড়াতে পারেন—বিদেশ মন্ত্রকের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই বার্তাই স্পষ্ট।
এই সত্যটিও মানতে হবে যে, আবেগসর্বস্ব আত্মমর্যাদার ভাষণে অর্থনীতির অঙ্ক মেলে না। ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার মার্কিন মুলুক। তাই ১০০ শতাংশ পর্যন্ত সম্ভাব্য শুল্কের হুমকি নিছক কূটনৈতিক শব্দব্রহ্ম নয়, ভারতীয় এক্সপোর্টারদের জন্য বাস্তব অনিশ্চয়তা। একইসঙ্গে অন্য উৎস দিয়ে রাশিয়ার তেলের বিপুল জোগান রাতারাতি পুষিয়ে নেওয়া সহজ নয়। সরবরাহ, দাম, পরিশোধন-উপযোগিতা প্রভৃতি অনেক কিছুই হিসাবের মধ্যে রাখতে হচ্ছে। অতএব নয়াদিল্লির সামনে কাজটি ‘আমেরিকা না রাশিয়া’ বেছে নেওয়ার মতো অতিসরল নয়, সমস্যাটি জ্বালানি-কূটনীতি নির্মাণের এবং তা যথেষ্ট কঠিন। কেননা, ভারত কোনো গোষ্ঠীর স্থায়ী সদস্য নয়, নিজের প্রয়োজনের স্থায়ী প্রতিনিধি। রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল পাওয়া গেলে কেনা হবে, সাড়া দেওয়া হবে পশ্চিম এশিয়ার প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ প্রস্তাবে এবং অবশ্যই বিবেচ্য হবে আমেরিকার লাভজনক অফার। কিন্তু ‘আমার তেল কিনবে, আমারই শর্তে কিনতে হবে’—এই উদ্ভট দাদাগিরি মেনে নেওয়ার কিছু ঘটেনি। ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে এখন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাব্য অস্ত্র এসেছে, কিন্তু সেটি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত এখনো অনিবার্য নয়। ফলে দিল্লির তরফেও এমন কূটনৈতিক পদক্ষেপ করতে হবে যে, সব কুল রক্ষা পায় একত্রে। এতদিন কৌশলগত সম্পর্কের নামে যদি কোথাও অতিরিক্ত নরম হওয়ার অভিযোগ উঠে থাকে, এবার তার বিপরীতে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি প্রদর্শনও সমান অনাবশ্যক। ভারতের প্রয়োজন বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃঢ়তা ও বন্ধুত্ব অক্ষত রাখার কূটনীতি এবং সেই স্বাধীনতা যা তেলের দামটিও বিস্মৃত নয়। ভারতের জ্বালানি-নীতি ওয়াশিংটনের পছন্দে নয়, ভারতের প্রয়োজনেই নির্ধারিত হবে, এটাই মোদ্দা কথা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ