Bartaman Logo
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্রদীপের নীচে এত আঁধার

এ যেন এক আকাশের নীচে দুই পৃথিবীর গল্প! একদিকে সরকারি উদ্যোগে চোখ ধাঁধানো আলোর রোশনাই, অন্যদিকে অন্ধকারের ছবি। এদেশে প্রাচীনকালে সম্রাট বা রাজাদের ঘটা করে জন্মদিন পালনের কথা শোনা যেত।

প্রদীপের নীচে এত আঁধার
  • ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

এ যেন এক আকাশের নীচে দুই পৃথিবীর গল্প! একদিকে সরকারি উদ্যোগে চোখ ধাঁধানো আলোর রোশনাই, অন্যদিকে অন্ধকারের ছবি। এদেশে প্রাচীনকালে সম্রাট বা রাজাদের ঘটা করে জন্মদিন পালনের কথা শোনা যেত। সেই শুভদিনে গরিব প্রজাদের অকাতরে দানধ্যান করা হত। এখন দেশে রাজতন্ত্র নেই। সম্রাটদের জায়গা হয়েছে ইতিহাসের পাতায়। তা বলে সনাতনী পরম্পরা তো থেমে থাকতে পারে না। তাই গত ১৭ সেপ্টেম্বর শাসক দল তো বটেই, সেইসঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার ও মূলত ডাবল ইঞ্জিনের শাসনে থাকা ২১ রাজ্যের সরকার স্বঘোষিত ‘বিশ্বগুরু’র ৭৬তম জন্মদিন পালন করল মহাসমারোহে। দেশের ১৪০ কোটি জনগণের প্রধান সেবক ‘ফকির’(নিজে দাবি করেন) প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনায় কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকারি কোষাগার থেকে ঠিক কত শত কোটি টাকা খরচ হল, হয়তো কোনোদিনই তার সঠিক তথ্য জানা যাবে না। কিন্তু একটা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তির জন্মদিন পালন ব্যক্তিগত বা দলীয় স্তর ছাপিয়ে যে সরকারি উৎসবের চেহারা নিতে পারে, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী না থাকলে বোধহয় তা অজানাই থেকে যেত। তবে এ শুধু একদিনের উৎসব নয়, আগামী এক মাস ধরে তার রেশ চলবে। মোদিজির সাফল্য গাথা প্রচারে কলেজে কলেজে মঞ্চস্থ হবে ‘নমো সেবা’ নামে নাটক। শোনা যাবে, ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানও। 

Advertisement

দেশের প্রধান রাষ্ট্রনায়কের জন্মদিন উদযাপনের নামে বর্ণাঢ্য ও বৈভবের আলোর রোশনাই ছড়িয়ে অন্ধকারকে আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাতে সত্য ও বাস্তব চাপা থাকছে না। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সরকারেরই দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রিজার্ভ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রাকে ছাপিয়ে আগস্ট মাসে খুচরো বাজারে মূল্যবৃদ্ধি পৌঁছেছে প্রায় ৫ শতাংশে, পাইকারি বাজারে প্রায় ১০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে খাদ্যপণ্যে, ৫.৯৫ শতাংশ। হোটেল-রেস্তরাঁয় খাবারের দাম বেড়েছে ৮.৩৮ শতাংশ, ব্যক্তিগত পরিচর্যা সংক্রান্ত পণ্যের দাম বেড়েছে ১৫.১৭ শতাংশ। এই সময়ে খনিজ তেল ও পেট্রলিয়ামজাত পণ্যের দাম বেড়েছে ৩৮.৪৮ শতাংশ। অপরিশোধিত পেট্রলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে ৩৪.৪১ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় ১০৮ ডলার। যেহেতু অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয় ভারতকে, ফলে এই তেলের দাম বাড়লে পেট্রল-ডিজেল কেনার খরচ বাড়বে। এর ফলে সাধারণ ও পণ্য পরিবহণের খরচ আরও বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল। সেই বাড়তি খরচে বোঝা শেষপর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উপর পড়তে বাধ্য। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো আমেরিকা শুল্কের হার ১০০ শতাংশ করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে বাধ্য। আশঙ্কা হল, মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে সুদের হার বাড়াতে পারে রিজার্ভ ব্যাংক। এর অর্থ, আগামীতে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মাসিক কিস্তির অঙ্ক বাড়বে। তাতে পরিবারের উপর নতুন চাপ তৈরি হবে। এই পরিস্থিতিতে উচিত ছিল সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা। কিন্তু সেসব ভুলে প্রধানমন্ত্রীর জাঁকজমকপূর্ণ জন্মদিন উদযাপনে মেতে উঠেছে দেশ শাসক! 
খবরে প্রকাশ, জন্মদিনের দিনটিকে আলোকিত করে রাখতে গোটা দেশে ১৭ সেপ্টেম্বর ৭০ লক্ষ প্রদীপ জ্বালানো হয়েছে। শুধুমাত্র মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে ৩৩ লক্ষ প্রদীপ জ্বালাতে খরচ করা হয়েছে ৪৫ হাজার লিটার তেল! অথচ আমেরিকা ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষিতে পেট্রল ডিজেলের সঙ্গে তেলও সাশ্রয়ের পরামর্শ দিয়েছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই। যে দেশে এক লিটার ভোজ্য তেলের দাম প্রায় ২০০ টাকা, সেখানে দেখা যাচ্ছে ক্ষুধার জ্বালায় ধ্বস্ত খুদেরা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে ব্যবহৃত প্রদীপের তলানিতে থাকা তেল যত্ন সহকারে সংগ্রহ করে বোতলে ভরছে। এই উচ্ছিষ্ট তেল দিয়ে বোধহয় রান্না হবে! বিজেপি শাসিত বিহারের ১৫টি জেলায় ৫০ লক্ষের বেশি মানুষ বন্যার কবলে। তাদের কাছে সরকারি ত্রাণ ঠিকমতো না পৌঁছলেও সে রাজ্যে ২০ লক্ষের মতো প্রদীপ জ্বালানোর কৃতিত্ব দাবি করেছেন বিজেপি নেতারা। একই পরিস্থিতি এই বাংলায়। মালদহের ভুতনির চরে বন্যাদুর্গত মানুষেরা চরম অসহায়তার মধ্যে দিন কাটালেও এ রাজ্যের শাসক দল লক্ষ প্রদীপ জ্বালানোর আনন্দে আত্মহারা। প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন পালনে যেন রাজ্যে রাজ্যে চলেছিল প্রদীপ জ্বালানোর প্রতিযোগিতা! সকলেই চায়, প্রধানমন্ত্রী সুস্থ থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন। কিন্তু এসব দেখে শুনে প্রশ্ন জাগে, জন্মদিনে এত ঘটা হলেও প্রদীপের নীচে এই অন্ধকার কাটবে কবে? 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ