বেদান্তকে ঠিকমতো বুঝতে না পারা বা তার নানা অপব্যাখ্যার কারণ বেদান্তের মধ্যেই নিহিত। বেদান্তের পথ সৃষ্টিছাড়া। আর আমরা সৃষ্টির বন্ধনে আবদ্ধ জীব। একমাত্র যাঁরা ‘শ্রমণা ঊর্ধ্বমন্থিনঃ’, যাঁরা ‘আবৃত্তচক্ষু’, দৃষ্টি যাঁদের সৃষ্টির মূলের দিকে ঘুরে গিয়েছে, সেই পরমহংস পরিব্রাজকেরাই বেদান্তের যথার্থ অধিকারী। অন্য সব দর্শন বা সাধনের ধারা সৃষ্টির মধ্যেই চেতনার আলোকে ধরার চেষ্টা করেছেন। আর ঔপনিষদী ধারা বা যাজ্ঞবল্ক্যের ধারায় সৃষ্টির বাইরে গিয়ে সে আলোকে তার স্বকীয় রূপে, যাকে পারিভাষিকভাবে বলা হয় নিরুপাধিকরূপে অর্থাৎ কোনো উপাধি বা আনুষঙ্গিক কিছুর সঙ্গে যুক্ত না করেই বিশুদ্ধ স্বরূপে পাওয়ার প্রয়াস। ‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে’। তাই এখানে নিরন্তর ‘নেতি নেতি’র ধুয়া।
যন্ত্রের চেয়ে এখানে যন্ত্রীর দিকেই প্রথম থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিসের দৌলতে, কার প্রেরণায় যন্ত্রটি চলছে দেখো, খোঁজো। চোখের দর্শন, কানের শ্রবণ, জিহ্বার আস্বাদন, নাসিকার আঘ্রাণ, মনের মনন—এ সব চলছে কার দ্বারা? আমরা মূঢ়তায় মনে করি চোখই দেখে, কানই শোনে, মনই বুঝি চিন্তা করে, কিন্তু কার আলোয় চোখ দেখে, মন ভাবে, তার ভাবনা করি না। একটি উপনিষদের নামই তাই ‘কেন’। আরম্ভই তার এই ‘কেন’র ধুয়া দিয়ে, কিসের দ্বারা বা কার দ্বারা সব চলছে তাকে খোঁজা।
‘কেনেষিতং পততি প্রেষিতং মনঃ
কেন প্রাণঃ প্রথমঃ প্রৈতি যুক্তঃ।
কেনেষিতাং বাচমিমাং বদন্তি
চক্ষুঃ শ্রোত্রং ক উ দেবো যুনক্তি ’
কে সেই দেবতা, যার ত্রষণায় বা ইচ্ছার প্রেরণায় মন ধেয়ে চলে? কার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে প্রাণের প্রথম অভিসার? কার ইচ্ছার ইঙ্গিতে এই বাগ্বিলাস, কথার ফুলঝুরি ঝরে পড়ে নিঃশব্দ নীলিমায়? চোখ-কানকেই বা কে ঠিকমতো খাটিয়ে রেখেছেন এই দেহযন্ত্রে রূপগ্রহণ ও শব্দগ্রহণের জন্য? খুঁজলে দেখতে পাবে তিনিই চোখের চোখ, কানের কান, প্রাণের প্রাণ, মনের মন। তাঁকে এইভাবে সব থেকে মুক্ত করে, আলাদা করে সবের পিছনে সক্রিয়কে ধরতে বা জানতে পারলেই এই দুনিয়ার উপরে তুমিও উঠে যাবে, হয়ে যাবে অমৃতস্বরূপ।
শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং মনসো মনো যৎ
বাচো হ বাচং স উ প্রাণস্য প্রাণঃ।
চক্ষুষশ্চক্ষুরতিমুচ্য ধীরাঃ
প্রেত্যাস্মাল্লোকাদমৃতা ভবন্তি
উপনিষদের এই উদ্ঘোষণে কিন্তু আমাদের এই ইন্দ্রিয়ের রাজ্যকে, প্রত্যক্ষ জগৎকে বাতিল করে দেওয়া হয়নি, উড়িয়ে দেওয়া হয়নি মিথ্যা বলে। জগৎ সত্য, কিন্তু সে নিজের অধিকারে সত্য নয়। তার সত্যতা আপেক্ষিক, নির্ভরশীল তার পিছনে যে পরম সত্য রয়েছেন তার উপর।
গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়ের ‘‘চেতনার আরোহিণী’’ থেকে