জীবনে এমনভাবে তাঁকে গ্রহণ করতে হবে যাতে জীবন তাঁর ভাবে ভাবিত, রূপায়িত হয়। আমরা সকলকে শেখাতে, সংশোধন করতে যাই, জগতের সংস্কার করতে যাই কিন্তু যে মন নিয়ে আমরা এসব কাজ করব সে মনের শুদ্ধি-পবিত্রতা কতটুকু সেটা আগে দেখতে হবে। স্বামীজীর কথায়, সরষের ভেতরে ভূত থাকলে তা দিয়ে ভূত তাড়াব কি করে? বাইবেলে একটি কথা আছে—যীশুখ্রীষ্ট বলছেন, লোকের চোখে কোথায় একটু কুটো পড়েছে তুমি তা দূর করতে যাচ্ছ, তোমার চোখে যে একটা কড়িকাঠ পড়ে আছে। আগে তোমার নিজের চোখকে মুক্ত কর, শুদ্ধ পবিত্র কর, তবে তুমি কার কি ত্রুটি ভাল করে দেখতে পাবে, তারপর সেটি দূর করতে পারবে। এ না করলে সংস্কারের প্রয়াস, জীব উদ্ধার সব ব্যর্থ হবে।
অতএব আমরা যখন শ্রীরামকৃষ্ণকে যুগাবতার বলি, পরমকল্যাণময়রূপে আবির্ভূত হয়ে আমাদের কল্যাণ করছেন বলি তখন আমাদের অন্ততঃ এইটুকু দেখার প্রয়োজন যে আমরা তাঁর সেই কল্যাণময় বাণী গ্রহণ করবার উপযুক্ত হয়েছি কিনা। তাঁর নাম নেবার জন্য, তাঁর মন্ত্রে দীক্ষিত হবার জন্য দলে দলে লোক আসে, তাদের যখন বলি তোমরা কথামৃত পড়েছ? তখন চুপ করে থাকে। সমস্ত জগতের অধ্যাত্মজ্ঞান-পিপাসু ব্যক্তিদের যে গ্রন্থ আকর্ষণ করছে, সাধারণ মানুষের উপযোগী সুবোধ্য ভাষায় যা পরিবেশিত হয়েছে, সে বইখানিও আমরা ভাল করে পড়ি না। হয়তো ঘরে তাঁর ছবি রাখি সেখানে ফুলও দিই কিন্তু তিনি কি করতে বলছেন তার সন্ধান রাখি না। তাঁর উপদেশ পড়িই না, পালন করা তো বহুদূরের কথা। পালন করতে বললে বলে, আমরা সংসারী জীব, আমরা কী ওসব পালন করতে পারব? তা যদি না-ই পারব তাহলে তাঁর ভক্ত হব কেমন করে? কথামৃত পড়া আছে কিনা সে প্রশ্নের উত্তরে শুনি, কত কাজ সময় পাই না। সব করবার সময় আছে আর সদ্গ্রন্থ পড়বার, সৎচিন্তা করবার সময় নেই। ঠাকুর গাইতেন, ‘রোগে বাঁচি কি না বাঁচি তন্নামে অরুচি’—আমাদেরও সেইরকম তাঁর নামে অরুচি। নাম বলতে কেবল ‘শ্রীরামকৃষ্ণ’ শব্দটি নয়, সেই নাম যে ভাবের প্রতীক তার সঙ্গে পরিচয় চাই। একজন ঠাকুরকে বলছে, আমি শ্রদ্ধাভক্তি চাই, জ্ঞান চাই না। ঠাকুর বললেন, যাঁকে ভক্তি করবি তাঁকে না জানলে কি করে ভক্তি করবি? অন্ততঃ তাঁর সম্বন্ধে একটা ধারণা না হলে আমরা ভক্তি করব কাকে? শ্রীরামকৃষ্ণ নামটি মাত্র আমরা জানি আর জানি যে অনেক লোক তাঁর নাম করছে, নামে আকৃষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তাতে আমার জীবনে কি লাভ হয়েছে? এই কথা ভাবতে হয়।
আমরা নানা স্থানে যাই যেখানে বহুলোক আসেন দীক্ষা গ্রহণের জন্য। যাঁরা আসেন তাঁদের ভেতরে কয়জন শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবের সঙ্গে পরিচিত? তাঁর বই পড়েছ জিজ্ঞাসা করলে কেউ বলে, ‘পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ’ পড়েছি যা উপন্যাসের মতো করে লেখা। অথচ যাঁকে অবলম্বন করে এই বহুল প্রচারিত গ্রন্থ রচিত সেই ব্যক্তির সম্বন্ধে আর কিছু জানবার কৌতূহল বা প্রবৃত্তি হল না।
স্বামী ভূতেশানন্দের ‘শরণাগতি’ থেকে