সাধুদের সুন্দর জীবন। সুতরাং সাধুসঙ্গে শান্তিলাভ হয়। সেজন্য সেই সাধুসঙ্গ করার কথা শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব প্রায়ই বলতেন। সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীদের সংস্পর্শে এসে সাধারণ সংসারজ্বালাপীড়িত মানুষ শান্তি আশা করেন। সন্ন্যাসীদেরও সেজন্য সেদিকে সদা সতর্ক থাকতে হয়, যাতে তাঁদের পবিত্র জীবনে কোন কালিমা দেখা দিতে না পারে।
শ্রীমা শ্রীঠাকুরের কাছে “রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ” স্থাপনের জন্য যে প্রার্থনা করেছিলেন তাতে এই সব ইঙ্গিত রয়েছে। মায়ের প্রার্থনা: “কাশী-বৃন্দাবনে দেখেছি, অনেক সাধু ভিক্ষে করে খায়, আর গাছতলায় ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। সেরকম সাধুর তো অভাব নেই। …আমার প্রার্থনা, তোমার নামে যারা বেরুবে, তাদের মোটা ভাত-কাপড়ের অভাব যেন না হয়। ওরা সব তোমাকে, আর তোমার ভাব উপদেশ নিয়ে একত্রে থাকবে। আর এই সংসারতাপদগ্ধ লোকেরা তাদের কাছে এসে তোমার কথা শুনে শান্তি পাবে।”
শ্রীমা বলতেন: “ঠাকুরের ভক্তেরা জ্ঞানী সন্ন্যাসী। জ্ঞানীর সন্ন্যাস হতে পারে। এই যে গৌরদাসী, গৌরদাসী কি মেয়ে? ও তো পুরুষ। ওর মতো ক’টা পুরুষ আছে? ঠাকুর বলতেন, ‘মেয়ে যদি সন্ন্যাসী হয়; সে কখনও মেয়ে নয়—সে-ইতো পুরুষ।” সন্ন্যাসীদের সৎ ও সুন্দর চরিত্র চোখের সামনে আদর্শ হিসেবে ধরে রাখার জন্য জননী সারদাদেবী বেলুড় মঠের মহারাজদের সম্পর্কে সম্যকরূপে বলেছেন: “জীবের মুক্তির চাবি এদের হাতে আছে। আর কি কেবল এখানেই মন্ত্র নেওয়া? মঠে সব ছেলেরা আছে। তাদের কাছে মন্ত্র নিতে পারে না? তাদের কি শক্তি নেই? সব্বাই আমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এই রাখাল-টাখাল এই সব ছেলেরা রয়েছে, এরা কি কম!”
এক ভক্তকে আবার আরও বলছেন শ্রীমা: “দেখছ না, রাখালের (স্বামী ব্রহ্মানন্দের) কেমন বালকভাব, এখনও যেন ছোট ছেলেটি! শরৎকে (স্বামী সারদানন্দকে) দেখ না, কত কাজ করে, কত হাঙ্গামা পোহায়—মুখটি বুজে থাকে। ও সাধু মানুষ, ওর এত সব কেন? ওরা ইচ্ছা করলে দিনরাত ভগবানে মন লাগিয়ে বসে থাকতে পারে। কেবল তোমাদের মঙ্গলের জন্যে এদের নেমে থাকা। এদের চরিত্র চোখের সামনে ধরে রাখবে।”
স্বামী প্রেমানন্দের মৃত্যুতে মা বলেছিলেন: “বাবুরামের দেহেতে আর কিছু ছিল না, কেবল কাঠামোখানি ছিল। যতবড় মহাপুরুষই হোক, দেহধারণ করে এলে দেহের ভোগটি সবই নিতে হয়। তবে তফাৎ এই—সাধারণ লোক যায় কাঁদতে কাঁদতে আর ওঁরা যান হেসে হেসে—মৃত্যুটা যেন খেলা! আজ বাবুরাম আমার চলে গেল। সকল হতে চক্ষের জল পড়ছে।” মায়ের মতে, “যাদের খুব উঁচু ঘর, তারাই সাধু হয়ে সর্ব বন্ধনমুক্ত হয়ে যায়। এক ভগবানই সত্য, তাঁকে ডাকতে পারলেই ভাল। দেহ ধরলেই নানা উপসর্গ।”
সাধুসঙ্গে মানুষের মলিনতা মুছে যায়। তাই শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সারদাদেবীও সুর মিলিয়ে আরও একটু জোর দিয়ে, এমনকি একথাও বললেন: “যেখানে সাধুরা শৌচাদি করে, সেখানেও যদি সংসারীরা যায়, সেই বাতাসে তাদের মনের মলিনতা কেটে যায়।” সাধুদের সুন্দর নিশ্চিন্ত জীবনের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে শ্রীমা তাঁদের বলতেন: “বাবা, সংসার কর নাই, ঘুমিয়ে বাঁচবে।”
পরিমল চক্রবর্তী ও অপর্ণা চক্রবর্তীর ‘শ্রীশ্রীমা সারদা কথামৃত’ থেকে