Bartaman Logo
১৫ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অমৃতকথা

আহা, দেশে গরিব-দুঃখীর জন্য কেউ ভাবে না রে! যারা জাতির মেরুদণ্ড, যাদের পরিশ্রমে অন্ন জন্মাচ্ছে, যে মেথর-মুদ্দাফরাশ একদিন কাজ বন্ধ করলে শহরে হাহাকার রব ওঠে— হায়!

অমৃতকথা
  • ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আহা, দেশে গরিব-দুঃখীর জন্য কেউ ভাবে না রে! যারা জাতির মেরুদণ্ড, যাদের পরিশ্রমে অন্ন জন্মাচ্ছে, যে মেথর-মুদ্দাফরাশ একদিন কাজ বন্ধ করলে শহরে হাহাকার রব ওঠে— হায়! তাদের সহানুভূতি করে, তাদের সুখে-দুঃখে সান্ত্বনা দেয়, দেশে এমন কেউ নেই রে! এই দেখ্‌ ঩না—হিন্দুদের সহানুভূতি না পেয়ে মাদ্রাজ-অঞ্চলে হাজার হাজার পারিয়া কৃশ্চান হয়ে যাচ্ছে। মনে করিসনি কেবল পেটের দায়ে কৃশ্চান হয়, আমাদের সহানুভূতি পায় না বলে। আমরা দিনরাত কেবল তাদের বলছি— ‘ছুসনে’। 

Advertisement

দেশে কি আর দয়াধর্ম আছে রে বাপ্‌! ঩কেবল ছুৎমার্গীর দল! অমন আচারের মুখে মার ঝাটা, মার লাথি। ইচ্ছা হয়, তোর ছুঁৎমার্গের গণ্ডি ভেঙে ফেলে এখনি যাই—‘কে কোথায় পতিত-কাঙাল দীন-দরিদ্র আছিস’ বলে তাদের সকলকে ঠাকুরের নামে ডেকে নিয়ে আসি। এরা না উঠলে মা জাগবেন না....দে সকলে মিলে এদের চোখ খুলে। আমি দিব্য চোখে দেখছি, এদের ও আমার ভেতর একই ব্রহ্ম— একই শক্তি রয়েছেন, কেবল বিকাশের তারতম্য মাত্র সর্বাঙ্গে রক্তসঞ্চার না হলে কোন দেশে কোনও কালে কোথায় উঠেছে দেখেছিস? একটার অঙ্গ পড়ে গেলে, সবল থাকলেও ঐ দেহ নিয়ে কোন বড় কাজ আর হবে না— এ নিশ্চয় জানবি।... আমি এত তপস্যা করে এই সার বুঝেছি যে, জীবে জীবে তিনি অধিষ্ঠান হয়ে আছেন; তা ছাড়া ঈশ্বর-ফিশ্বর কিছুই আর নেই।—‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’। আমাদের এই দেশে—বেদান্তের এই জন্মভূমিতে সাধারণ লোককে বহু শতাব্দী যাবৎ এইরূপ মায়াচক্রে ফেলিয়া ভ্রমণ হীনভাবাপন্ন করিয়া ফেলা হইয়াছে। তাহাদের স্পর্শে অশুচি, তাহাদের সঙ্গে বসিলে অশুচি! তাহাদিগকে বলা হইতেছে, ‘নৈরাশ্যের অন্ধকারে তোদের জন্ম— থাক চিরকাল এই নৈরাশ্যের অন্ধকারে।’ ফল এই হইয়াছে যে, সাধারণ লোক ক্রমশঃ ডুবিতেছে, গভীর হইতে গভীরতর অন্ধকারে ডুবিতেছে, মনুষ্যজাতি যতদূর নিকৃষ্ট অবস্থায় পৌঁছিতে পারে, অবশেষে ততদূর পৌঁছিয়াছে। কারণ এমন দেশ আর কোথায় আছে, যেখানে মানুষকে গো-মহিষাদির সঙ্গে একত্র বাস করিতে হয়? আর ইহার জন্য অ­­পর কাহারও ঘাড়ে দোষ চাপাইও না—অজ্ঞ ব্যক্তিরা যে ভুল করিয়া থাকে, তোমরা সেই ভ্রমে পড়িও না। ফলও হাতে হাতে দেখিতেছ, তাহার কারণও এইখানে বর্তমান। বাস্তবিক দোষ আমাদেরই। সাহস করিয়া দাঁড়াও, নিজেদের ঘাড়েই সব দোষ লও, অন্যের স্কন্ধে দোষারোপ করিতে যাইও না, তোমরা যে-সকল কষ্ট ভোগ করিতেছ, সেগুলির জন্য তোমরাই দায়ী। ‘ছুঁয়ো না, ছুঁয়ো না’ করে ছুঁৎমার্গীর দল দেশটাকে ঝালাপালা করেছে। তাও ভালমন্দ লোকের বিচার নেই; গলায় একগাছা সুতো থাকলেই হলো, তার হাতে অন্ন খেতে ছুঁৎমার্গীদের আর আপত্তি নেই।
স্বামী বিবেকানন্দের ‘জাতি সংস্কৃতি ও সমাজতন্ত্র’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ