ভাবনা, শক্তি, সত্তা, তত্ত্ব সবই শূন্য ছাঁচ, যদি ভগবৎ-আনন্দের ধারায় তাদের পূর্ণ না করা হয়। এ সব জিনিষই প্রতিরূপ বটে, কিন্তু সারা বিশ্বই একটা প্রতিরূপ। বস্তু-বিচ্ছিন্ন তত্ত্ব দেয় ভাগবত সত্যের বিশুদ্ধ ধারণা, প্রতিরূপ দেয় তাদের জীবন্ত বাস্তবতা। ভাবনা শক্তিকে আলিঙ্গন ক’রে লোকরাজির জন্ম দিয়েছে, আনন্দময় সত্তা আবার জন্ম দিয়েছে ভগবানকে। অসীম অনন্ত আপন গর্ভে অগণিত আনন্দধারা ধারণ করেছিল বলেই তো জগৎ ব্রহ্মাণ্ড সব সৃষ্টি হয়েছে। সত্তার চেতনা আর সত্তার আনন্দ হল আদি জনক-জননী। তারাই আবার অন্তিম পারান্তর। মাঝখানে অচেতনা হল চেতনার একটা সাময়িক মূর্ছা বা তমসাচ্ছন্ন সুপ্তি। বেদনার, আত্মবিলোপের অর্থ আনন্দ-ময় সত্তার নিজের কাছ থেকে নিজেকে অপসৃত করা, উদ্দেশ্য অন্যস্থানে বা অন্যভাবে আবার নিজেকে লাভ করা। সত্তার আনন্দ কালে সীমাবদ্ধ নয়—তার আদিও নাই, অন্তও নাই। জিনিষের এক রূপের ভিতর থেকে ভগবান বাহির হয়ে আসেন আর-এক রূপের মধ্যে প্রবেশ করবার জন্য।
ভগবান সত্যই তবে কি? চিরন্তন এক শিশু, চিরন্তন এক কুঞ্জবনে এক চিরন্তন লীলায় মগ্ন। ভগবান প্রকৃতির দিকে নিরন্তর আনত না হয়ে থাকতে পারেন না, মানুষও ভাগবত সত্তার দিকে ঊর্দ্ধমুখী হয়ে না চলে থাকতে পারে না। অনন্তের সঙ্গে সান্তের এই হল চিরন্তন সম্বন্ধ। যখন মনে হয় তারা দুটিতে দুদিকে চলেছে, তখন তার অর্থ নিবিড়তর মিলনের জন্যই তারা পরস্পর হতে দূরে সরে দাঁড়িয়েছে। মানুষের মধ্যে জগৎ-প্রকৃতি পুনরায় সচেতন হয়েছে যাতে সে তার ভাগবত ভোক্তার অভিমুখে দ্রুততর বেগে চলে আসতে পারে। এই ভোক্তা-পুরুষকেই নিজের অজ্ঞাতসারে সে ধারণ করে আছে, জীবন-ধারা আর ইন্দ্রিয়-বৃত্তিও একেই ধারণ করে আছে অথচ অস্বীকার করছে, অস্বীকার করছে বলে আবার অনুসন্ধান করছে। জগৎ-প্রকৃতি ভগবানকে জানে না, এই জন্য যে সে নিজেকে জানে না—যখন নিজেকে জানবে, তখনই তার শুদ্ধ আনন্দময় পুরুষের জ্ঞান হবে।
রহস্য হল একত্বের মধ্যে প্রাপ্তি, একত্বের মধ্যে বিলুপ্তি নয়। মানুষ ও ভগবান, লোক ও লোকাতীত এক হয়ে যায়, যখন উভয়ে উভয়কে জানে। উভয়কে বিচ্ছিন্ন করলেই, তার ফল অজ্ঞান, আর অজ্ঞানের ফল দুঃখ কষ্ট। মানুষ প্রথম অন্ধভাবে অন্বেষণ করে, তখন সে জানেও না যে সে তার আপন ভাগবত আত্মাকে অন্বেষণ করছে। কারণ জড়প্রকৃতির অপ্রকাশ দিয়ে তার যাত্রারম্ভ; আর যখন তার দৃষ্টি খুলতে থাকে তখন হতে অনেক দিন পর্যন্ত তার ভিতরে ক্রমবর্দ্ধমান আলোকের তেজ তাকে অন্ধই করে রাখে।
শ্রীঅরবিন্দের ‘চিন্তা-কণা দৃষ্টি-নিমেষ’ থেকে