Bartaman Logo
১ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্ক্রিনের ওপারে যুদ্ধ

নাইজেরিয়ায় তখন রাত। বাইরে অন্ধকার। দূরে কোথাও গুলির শব্দ। একটি ছোটো ঘরের ভিতরে তখন অন্য ধরনের যুদ্ধ চলছে

স্ক্রিনের ওপারে যুদ্ধ
  • ১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: নাইজেরিয়ায় তখন রাত। বাইরে অন্ধকার। দূরে কোথাও গুলির শব্দ। একটি ছোটো ঘরের ভিতরে তখন অন্য ধরনের যুদ্ধ চলছে। ঘরে কয়েকজন মানুষ। সামনে ল্যাপটপ। স্ক্রিনে জ্বলছে একটি চ্যাটবটের উইন্ডো। কেউ একজন টাইপ করছে। একের পর এক প্রশ্ন। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা। তারপর উত্তর। স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে ঘরের মানুষগুলি। এই দৃশ্যটি কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার নয়!

Advertisement

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বোকো হারামের দু’টি উপদলের সদস্যরা যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেছে। যে প্রযুক্তি তৈরি হয়েছিল মানুষের কাজ সহজ করার জন্য, সেটিই ঢুকে পড়েছে যুদ্ধের অন্ধকার জগতে। চ্যাটজিপিটি। ক্লদ। জেমিনাই। গ্রক। মেটা এআই। ডিপসিক...
একসময় যুদ্ধের পরিকল্পনা হতো মানচিত্রের উপর। এখন সেই পরিকল্পনার পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে একটি চ্যাটবটের স্ক্রিন। আর এখান থেকেই শুরু হচ্ছে গল্পটি। কেমব্রিজের গবেষকরা কথা বলেছেন বোকো হারামের দু’টি উপদলের ২৭ জন প্রাক্তন সদস্যের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে ছিল ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স আইএসডব্লিউএপি এবং জামাত আহল আস-সুন্নাহ লিদ-দাওয়াহ ওয়াল-জিহাদ বা জেএএসের প্রাক্তন সদস্যরা। সাক্ষাৎকারগুলিতে উঠে এসেছে একটি অস্বস্তিকর ছবি!
এআই তাঁদের কাছে শুধুই তথ্য খোঁজার যন্ত্র ছিল না। হামলার আগে। হামলার সময়। এমনকি হামলার পরেও— চ্যাটবটের কাছে ফিরে যেত তারা। এক প্রাক্তন কমান্ডারের কথাটি যেন গোটা গবেষণার সবচেয়ে ভয়ংকর সারাংশ: ‘এমন কোনো প্রশ্ন নেই, যার উত্তর আমরা এআইয়ের কাছে পাইনি।’ এই একটি বাক্যই হয়তো বোঝায়, কতটা বদলে গিয়েছে রণকৌশল। সন্ত্রাসবাদের চরিত্র!
কল্পনা করুন একটি ঘর। জানালার বাইরে অগ্নিগর্ভ এলাকা। ভিতরে বসে আছে কয়েকজন জঙ্গি। সামনে ল্যাপটপ। এক পাশে প্রজেক্টর। দেওয়ালে বড়ো পর্দা। গবেষণায় উদ্ধৃত এক প্রাক্তন কমান্ডারের বর্ণনা অনুযায়ী, কিছু বিদেশি প্রশিক্ষক এসে তাঁদের এআই ব্যবহারের পদ্ধতি শেখাতেন। কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়। কীভাবে তথ্য খুঁজতে হয়। কোন প্রশ্নে চ্যাটবট উত্তর দিতে অস্বীকার করে। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ শুধু এআই ব্যবহার শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমা কোথায়— সেটিও বোঝার চেষ্টা চলছিল।
কিছু জঙ্গি সদস্যকে দেওয়া হয়েছিল ল্যাপটপ। ব্যবস্থা করা হয়েছিল একাধিক এআই প্ল্যাটফর্মের অ্যাকাউন্ট। ছিল অর্থের বিনিময়ে নেওয়া সাবস্ক্রিপশন। ছিল গোপনীয়তা ও এনক্রিপশনের সরঞ্জাম। আর ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল এমন 
একটি ব্যবস্থা, যেখানে যুদ্ধের বিভিন্ন সমস্যার উত্তর খোঁজা যায় একটি স্ক্রিনের ওপারে। এরপর ঘটনাটি আরও এক ধাপ এগোয়। গবেষণার ভাষ্য অনুযায়ী, আইএসডব্লিউএপি ও জেএএসের মধ্যে বিশেষ এআই ইউনিট গড়ে ওঠে। এখানে শুধু সাধারণ সদস্যরা ছিল না। ছিল ইঞ্জিনিয়ার। অস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান থাকা ব্যক্তিরা। বিস্ফোরক নিয়ে কাজ করা কারিগররা। এক প্রাক্তন জঙ্গি-কমান্ডার জানিয়েছে, জেএএসের এমন একটি ইউনিটে ২৩ জন সদস্য ছিল। সৌরবিদ্যুৎ-চালিত একটি রুমে বসে তারা ল্যাপটপ ঘিরে কাজ করত। প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। তথ্য বিশ্লেষণ। শীর্ষ জঙ্গি-কমান্ডারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
ভাবুন দৃশ্যটি। একটি যুদ্ধক্ষেত্র। কোনো সামরিক সদর দপ্তর নয়। কোনো আধুনিক কমান্ড সেন্টার নয়। অথচ সেখানে বসেই মানুষ ও মেশিন মিলে তৈরি করছে সিদ্ধান্তের একটি নতুন কাঠামো। কেমব্রিজের গবেষক আন্তোনিয়া জুয়েলিশ জানিয়েছেন, সাক্ষাৎকার দেওয়া ২৭ জনের মধ্যে প্রায় ১০ জন বিস্ফোরক তৈরির ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছে। কখনো বিস্ফোরকের কার্যকারিতা বাড়ানোর চেষ্টা। কখনো হাতে থাকা উপকরণ নিয়ে প্রশ্ন। কখনো সামরিক সরঞ্জাম থেকে বিস্ফোরক উপাদান সংগ্রহের চেষ্টা।
কিন্তু গবেষকদের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, অস্ত্র সম্পর্কে অনেক তথ্য আগেই বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে। আসল পরিবর্তনটা অন্য জায়গায়। এআই প্রশ্নের সঙ্গে পরিস্থিতিকে মিলিয়ে উত্তর দিতে পারে। অর্থাৎ সাধারণ একটি তথ্যের বদলে নির্দিষ্ট সমস্যাকে সামনে রেখে কথোপকথন চালানো যায়। একজন মানুষ প্রশ্ন করছে। চ্যাটবট উত্তর দিচ্ছে। তারপর সেই উত্তরের ভিত্তিতে আবার প্রশ্ন। এভাবেই তৈরি হচ্ছে একটি ধারাবাহিক কথোপকথন। একজন বিশেষজ্ঞকে হয়তো পাওয়া যাবে না সবসময়। 
কিন্তু চ্যাটবট? দিন-রাত সে আপনার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাবে।
ক্যামেরা চলে যাচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে। একজন যোদ্ধার বুকে বাঁধা ক্যামেরা। সে এগিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে সংঘর্ষ। ক্যামেরা থেকে ছবি পাঠানো হচ্ছে ঘাঁটিতে। সেখানে একজন কমান্ডার ছবিগুলি দেখছে। তারপর সেই ছবি আপলোড করা হচ্ছে এআইতে। বোকো হারামের প্রাক্তন সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, এভাবেই যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সম্মুখসারির সন্ত্রাসবাদীদের নতুন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এআই তখন আর শুধু তথ্যের ভাণ্ডার নয়। সে হয়ে উঠছে যুদ্ধক্ষেত্রের চোখও। ভাবুন, একটি ক্যামেরা ছবি পাঠাচ্ছে। একটি কম্পিউটার সেই ছবি বিশ্লেষণ করছে। আর দূরে বসে থাকা একজন কমান্ডার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। মানুষ। মেশিন। ক্যামেরা। তিনটি জিনিসের মধ্যে তৈরি হচ্ছে নতুন এক সামরিক চক্র।
যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিগুলির একটি হল অপরিচিত অস্ত্রের মুখোমুখি হওয়া। গবেষণায় এমন একটি ঘটনার কথাও উঠে এসেছে। একদল জঙ্গির হাতে নতুন অস্ত্র এসেছে। কীভাবে সেটি ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন। তাঁরা দলের এআই বিশেষজ্ঞের কাছে জানতে চাইল। উত্তর এল, ‘গ্রককে একবার জিজ্ঞাসা করো।’ একটি সাধারণ বাক্য। কিন্তু এর ভিতরে লুকিয়ে আছে প্রযুক্তির সঙ্গে যুদ্ধের সম্পর্ক কতটা বদলে গিয়েছে তার ইঙ্গিত। যেখানে আগে দরকার ছিল একজন অভিজ্ঞ অস্ত্রবিশেষজ্ঞ, সেখানে এখন প্রশ্ন চলে যাচ্ছে একটি এআই চ্যাটবটের কাছে।
আরেকটি ঘটনা। কোনো সরকারি বাহিনী নিজেদের ঘাঁটির চারপাশে পরিখা খনন করেছে। উদ্দেশ্য— মোটরসাইকেলে চালানো হামলা ঠেকানো। সামনে গভীর খাদ। তার ওপারে প্রতিরক্ষা। কীভাবে বাধা অতিক্রম করা যায়? প্রাক্তন এক জঙ্গি কমান্ডারের দাবি, সিনেমায় মোটরসাইকেলকে বাধা পেরিয়ে লাফ দিতে দেখে তাঁরা সেই কৌশল নিয়ে এআইয়ের পরামর্শ নিয়েছিল। তারপর শুরু হয় অনুশীলন। কিন্তু প্রশিক্ষণেই কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটে। শেষ পর্যন্ত কয়েকজন সেই কৌশল আয়ত্ত করে ফেলে। পরে একটি হামলার সময় তা প্রয়োগও করা হয়।
একবার সন্ত্রাসবাদীদের একটি অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। প্রায় ২০০ জন যোদ্ধা পাঠানো হয়েছিল। ফিরে আসে অনেক কম। প্রাক্তন জঙ্গি সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, ৬০ জন প্রাণ হারিয়েছিল। তারপর শুরু হল বিশ্লেষণ। কেন এত ক্ষতি হল? আরও ছোটো দল কি বেশি কার্যকর হতে পারে? কীভাবে সমন্বয় বাড়ানো যায়? এই প্রশ্নগুলিও এআইয়ের কাছে তোলা হয়েছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ যুদ্ধের হিসাবও এখন শুধু কমান্ডারদের 
মাথায় নেই। যুদ্ধের পরের বিশ্লেষণেও ঢুকে পড়েছে মেশিন। কিন্তু একটি অভিযান শেষ হলেই যুদ্ধ শেষ হয় না। সদস্যরা ফিরে এসে এআইকে জানাত কী হয়েছিল। কোথায় ভুল হয়েছিল। কেন পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছিল। পরবর্তী অভিযানে কী বদলানো দরকার। অভিযানের ভিডিয়ো ফুটেজও বিশ্লেষণের জন্য এআইতে আপলোড করার কথা জানিয়েছে ওই প্রাক্তন জঙ্গি সদস্যরা।
একটি হামলা। তারপর বিশ্লেষণ। তারপর নতুন পরিকল্পনা। তারপর আবার হামলা। এ যেন যুদ্ধের একটি স্বয়ংক্রিয় ফিডব্যাক লুপ। আর সেই লুপে যত বেশি তথ্য ঢুকছে, তত বেশি নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা চলছে পরবর্তী সিদ্ধান্তের।
কেমব্রিজের গবেষণা এখানেই থেমে থাকেনি। টেক এগেইনস্ট টেররিজমের গবেষকরা ইসলামিক স্টেট (আইএস) পন্থী একটি অনলাইন প্রযুক্তি ফোরামে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। সেখানে দেখা যায়, শুধু এআই ব্যবহার নয়— এআইয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা কীভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায়, সেটিও শেখানো হচ্ছে। প্রযুক্তির ভাষায় যার নাম— জেলব্রেক। চ্যাটবট বিপজ্জনক প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। তাহলে প্রশ্নটিকে কীভাবে অন্যভাবে করা যায়? কীভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পাশ কাটানো যায়? কীভাবে মডেলকে এমনভাবে প্রশ্ন করা যায় যাতে সেটি নিজের তৈরি সীমারেখা অতিক্রম করে? এক আইএস সমর্থক এই প্রক্রিয়ার তুলনা করেছিল গাড়ির গতিসীমা সরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে। গাড়ি একই। কিন্তু আর সীমা নেই।
টেক এগেইনস্ট টেররিজমের অফিসার লুকাস ওয়েবার একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, যা তথ্য হাতে এসেছে তা ‘হিমশৈলের চূড়ামাত্র।’ হিমশৈলের ভয়ংকর অংশটি থাকে জলের নীচে। দেখা যায় না। কতগুলি গোষ্ঠী ইতিমধ্যে এআই ব্যবহার করছে? কতগুলি শুধু পরীক্ষা করছে? কতগুলি নিরাপত্তাব্যবস্থা ভাঙার চেষ্টা করছে? কতগুলি ক্ষেত্রে তা সফল হয়েছে? এই প্রশ্নগুলির অনেকগুলির উত্তর এখনও অজানা।
একসময় যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিত মানুষ। আজ সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যোগ হয়েছে মেশিন। কিন্তু সবচেয়ে বড়ো প্রশ্নটি, প্রযুক্তি কতটা শক্তিশালী হয়েছে, তা নয়। প্রশ্ন হল, মানুষ যখন যুদ্ধের সমস্যার উত্তর খুঁজতে একটি মেশিনের দিকে তাকায়, তখন সেই মেশিনের উত্তরের সীমা কোথায়? আর যদি সেই সীমা ভেঙে দেওয়া যায়? যুদ্ধের মাঠে এখন আর নতুন যোদ্ধা যোগ দেয় না। যোগ দেয় এমন এক ‘সহকারী’, যে ঘুমায় না, ক্লান্ত হয় না, একই প্রশ্নের উত্তর বারবার দিতে পারে এবং মুহূর্তের মধ্যে বিশাল তথ্যভাণ্ডার ঘেঁটে ফেলতে পারে। এই কারণেই কেমব্রিজের গবেষণার সবচেয়ে অস্বস্তিকর বার্তাটি হয়তো বোমা, বন্দুক কিংবা ড্রোন নয়। বরং একটি সাধারণ স্ক্রিন।
কারণ যুদ্ধের ভবিষ্যৎ হয়তো আর শুধু বন্দুকের নলের সামনে লেখা হচ্ছে না। কখনো কখনো একটি কীবোর্ডের কয়েকটি বোতাম চাপার পরও লেখা হচ্ছে সেই ভবিষ্যৎ!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ