পশ্চিম এশিয়ায় চলা যুদ্ধের আঁচ কি এবার ভারতের রান্নাঘরেও? সত্যিই খাদ্যসংকটের আশঙ্কা আর উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি এখন আর কেবল ফাইলে বন্দি নেই। সামান্য অর্থনীতিবিদ বা কৃষিবিশেষজ্ঞ নয়, সতর্কবার্তা এসেছে স্বয়ং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকরের মুখ থেকে। তাও আবার দেশের কোনো মঞ্চে না, একেবারে মার্কিন মুলুকে। নিউ ইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির অনুষ্ঠানে এসে তিনি সরাসরি বলেছেন, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালীর অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ববাণিজ্যের টানাপোড়েনে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ, যুদ্ধ শুধু রণক্ষেত্রের মধ্যে সীমিত থাকে না। তার অভিঘাত খুব দ্রুত পৌঁছে যায় জ্বালানি মার্কেটে, সার সরবরাহে, পরিবহণ খরচে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ে এবং শেষ পর্যন্ত আম জনতার বাজারের থলিতে। সেদিক থেকেই আগামী মাসগুলিতে বড়ো ধরনের খাদ্যসংকটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মোদি সরকারের বিদেশমন্ত্রী সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন এই সংকটের ভরকেন্দ্রকে। চারটি ‘এফ’— ফুয়েল, ফার্টিলাইজার, ফিনান্স এবং ফুড। জ্বালানি, সার, অর্থনীতি এবং খাদ্য। ভারতের উদ্বেগের মূল জায়গা। একদিকে রাশিয়া বনাম ইউক্রেন যুদ্ধ বছরের পর বছর ধরে চলছে। সাম্প্রতিক ইরান বনাম মার্কিন-ইজরায়েল জোটের যুদ্ধের জেরে গোটা পশ্চিম এশিয়া বিপর্যস্ত। সর্বোপরি হরমুজ প্রণালীর রুট নিয়ে অনিশ্চয়তার জেরে সংকট ক্রমেই আরব সাগর পেরিয়ে এগিয়ে আসছে রান্নাঘরের দিকে।
এই সমস্যার ভয়াবহতা বুঝতে অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সোজা ভাষায়, জমিতে ফসল ফলাতে শুধু বীজ লাগে না। কৃষকের কাছে অত্যন্ত জরুরি সার, সেচ, ডিজেল, বিদ্যুৎও। সারের দাম বা সরবরাহে ধাক্কা এলে উৎপাদন খরচ বাড়ে। জ্বালানির দাম বাড়লে সেই খরচ আকাশের দিকে ধাবমান হয়। কারণ, পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পায়। তারপর প্রাকৃতিক কোনো কারণে কম উৎপাদন হলে বাজারে সরবরাহ কমে এবং দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। এই মুহূর্তে ভারতের জন্য উদ্বেগের জায়গা আরও বড়ো। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে কেন্দ্রীয় সরকার খাদ্যশস্য উৎপাদনের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে ৩৭৩.৯৩ মিলিয়ন টন। ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে খাদ্যশস্যের প্রকৃত উৎপাদন প্রায় ৩৭৬.৫৬ মিলিয়ন টনের কাছাকাছি ছিল। অর্থাৎ, চলতি অর্থবর্ষে উৎপাদন সামান্য কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরপর রয়েছে সার নিয়ে জটিল সমীকরণ, যা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সার্বিক সার উৎপাদনে যতটা সক্ষম, কাঁচামাল ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সারের ক্ষেত্রে ততটাই আন্তর্জাতিক বাজারের উপর নির্ভরশীল। সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে, এমওপি বা পটাশ, রক ফসফেট, ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাস, অ্যামোনিয়া ইত্যাদির সিংহভাগই আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। সরকার অবশ্য বলছে, চলতি মরশুমে সারের প্রাথমিক মজুত আগের বছরের তুলনায় বেশি এবং সরবরাহ যথেষ্ট। দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তির মাধ্যমেও সরবরাহ সুরক্ষিত করার চেষ্টা চলছে। গত অর্থবর্ষের হিসাব থেকে স্পষ্ট, ইউরিয়া, ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেটের আমদানি ক্রমশ বেড়েছে। ফলে বর্তমানে দেশের কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে শুধু স্থানীয় আবহাওয়া কিংবা জমির চরিত্র জড়িয়ে নেই, তা হয়েছে আন্তর্জাতিক। বিশ্বের জাহাজ চলাচলের রুট, জ্বালানির দাম, খনিজ কাঁচামালের সরবরাহ এবং ভূরাজনীতি সব কিছু প্রায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে গিয়েছে কৃষকের রক্ত-ঘামের সঙ্গে। রয়েছে এল নিনোর বিপদও। আর তাতেই সরাসরি ঝুঁকির মুখে কৃষিকাজ।
গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের খাদ্যসংকট পার করে ভারতে বড়ো সাফল্য দেখিয়েছিল ‘সবুজ বিপ্লব’। কিন্তু আজও প্রায় ৮১ কোটি মানুষ সরকারি ‘ফ্রি’ রেশনের উপর নির্ভরশীল। ফলে খাদ্য-নিরাপত্তার সঙ্গে এখন কৃষি উৎপাদন ও সরকারি সংগ্রহের প্রশ্ন সরাসরি জড়িয়ে। যুদ্ধের কারণে সার বা জ্বালানির দাম বাড়লে তার চাপ কৃষকের ঘাড়ে গিয়ে পড়বে। কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হলে তার অভিঘাত বাজারে। আর বাজারে দাম বাড়লে সবচেয়ে আগে ধাক্কা লাগবে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের সংসারে। ‘ফ্রি’ রেশনও সেই ধাক্কা সামলাতে পারবে না। তাই বিদেশমন্ত্রীর এই সতর্কবার্তাকে নিছক আন্তর্জাতিক কূটনীতির বক্তব্য বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন হল, যুদ্ধের এই অভিঘাত এড়াতে ভারত কতটা প্রস্তুত? সারের সরবরাহ নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী? আমদানি নির্ভর কৃষি-উপকরণের বিকল্প উৎসের বন্দোবস্ত আছে তো? খাদ্যশস্যের বাফার স্টক কতটা নিরাপদ? ‘আত্মনির্ভরতা’র দাবির আসল পরীক্ষা তো যুদ্ধের সময়েই! হরমুজ প্রণালী থেকে দিল্লিতে সতর্কবার্তা এসে গিয়েছে। সেখান থেকে কৃষকের জমি, পাইকারি-খুচরো বাজার এবং আম আদমির রান্নাঘর কিন্তু খুব কাছে।